এপ্রিলেই টিকা দেওয়া শেষ করতে চায় সরকার

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:১১ এএম

এ বছরের এপ্রিলের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৭০ শতাংশ মানুষকে করোনার দুই ডোজ বা সম্পূর্ণ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে এ মাসেই শেষ করতে চায় টিকার প্রথম ডোজ। এ জন্য ২৬ ফেব্রুয়ারি একদিনের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সেদিন সারা দেশে এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এরপর মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে টিকার দ্বিতীয় ডোজ শেষ করা হবে। তবে এ মাসের মধ্যে যাদের প্রথম ডোজ শেষ হবে না, তারা আগামী মাসেও টিকা নিতে পারবেন। অব্যাহত থাকবে টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া।

পাশাপাশি টিকা থেকে বাদ পড়া চার শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে আগামী সপ্তাহ থেকে ঢাকার বাইরেও টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সময় জেলার প্রধান শহরগুলোতে এই শ্রেণির মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামে টিকা পাঠিয়েছে অধিদপ্তর। সেখানে যেকোনো দিন টিকা দেওয়ার কাজ শুরু হবে। ক্রমান্বয়ে অন্য শহরগুলোতেও টিকা পাঠানো হবে। এই চার শ্রেণির মধ্যে সারা দেশে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের টিকাদান ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বাকি তিন শ্রেণি হলো স্কুলে যায় না এমন ১২-১৭ বছরের শিশু-কিশোর-কিশোরী, ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং হোটেল, দোকানপাটের শ্রমিক-কর্মচারী, হকারসহ অতিদরিদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

সরকারের করোনা টিকা বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটি টিকার এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। কমিটি এই পরিকল্পনা সফলের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এ জন্য মানুষকে এ মাসের মধ্যেই টিকার প্রথম ডোজ শেষ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

১ দিনে ১ কোটি টিকা : ২৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার এক দিনে এক কোটি মানুষকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে গতকাল অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম এক ভিডিও বার্তায় বলেন, এরপর আর টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হবে না। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্বিতীয় ডোজ এবং বুস্টার ডোজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।

মহাপরিচালক বলেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি আমরা দেশব্যাপী করোনার ভ্যাকসিনের একটা ক্যাম্পেইন করতে যাচ্ছি। সেখানে আমরা লক্ষ্যমাত্রা রেখেছি সর্বোচ্চ সংখ্যক টিকা দেওয়ার। এ ক্ষেত্রে আমরা সবাইকে আহ্বান করি, আপনারা সবাই এই ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়ে টিকা নিন। এর মাধ্যমে আমাদের প্রথম ডোজ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করা হবে। পরে আমরা বুস্টার ডোজ এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকব। কাজেই আর বিলম্ব না করে আপনারা সবাই টিকা নিয়ে নিন।

এ ব্যাপারে টিকা বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিস্তারিত পরিকল্পনা হচ্ছে, আমাদের প্রথম ডোজের টিকা এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা এটাকে দ্রুত শেষ করে ফেলতে চাই। তাই এখন যে টিকা চলছে, সেটা চলবে। পাশাপাশি ২৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনে কমপক্ষে ১ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছি। সারা দেশে অতিরিক্ত টিকাদান কেন্দ্র করব। সে ক্ষেত্রে লোকজনের সুবিধার জন্য খোলা মাঠে বুথ করব। নির্দিষ্ট কেন্দ্রগুলো থাকবেই। অতিরিক্ত কেন্দ্র আরও বাড়ানো হবে। সেদিন জেলা-উপজেলা সব জায়গায় টিকা দেওয়া হবে।

পরিকল্পনার আরও কিছু তথ্য তুলে ধরে করোনা টিকার টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক বলেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি জেলা-উপজেলা-পৌরসভা-সিটি করপোরেশনে আগের মতোই সব জায়গায় টিকা দেওয়া হবে। নিবন্ধন থাকলেও চলবে, না থাকলেও অসুবিধা নেই। কেন্দ্রে নাম-ঠিকানা লিখে রেখে পরে নিবন্ধন করা হবে। সেদিন টিকা শেষে তাদের টিকা কার্ড দেওয়া হবে, যাতে তারা দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিতে পারে। এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আশা করছি ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ডোজ দেওয়া শেষ হবে। কেউ যদি বাদ পড়ে, পরে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কীভাবে টিকা দেওয়া যায়।

এই কর্মকর্তা জানান, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত টিকাদান চলবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে তিনটা করে কেন্দ্র হবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ও সিটি করপোরেশনে কেন্দ্র বাড়ানো হবে। দেওয়া হবে চীনের সিনোভ্যাক ও সিনোফার্ম টিকা। 

১১ দিনে দিতে হবে ৮৩ লাখের বেশি : সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৭ জন। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, মোট জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। তাদের মধ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম ডোজ পেয়েছেন ১০ কোটি ৯ লাখ ১১ হাজার ২১ জন, যা লক্ষ্যমাত্রার জনগোষ্ঠীর ৮৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সে হিসাবে এ মাসের মধ্যেই সবার প্রথম ডোজ শেষ করতে হলে বাকি ১১ দিনে (২৬ ফেব্রুয়ারি বাদে) টিকা দিতে হবে ৮৩ লাখ ১০ হাজার ৯৩৩ জনকে, অর্থাৎ অবশিষ্ট ১৪ শতাংশ মানুষকে।

হিসাব করে দেখা গেছে, এই মাসের মধ্যে টিকার প্রথম ডোজ শেষ করতে হলে সরকারকে বাকি ১১ দিনে দৈনিক গড়ে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৯ জনকে টিকার প্রথম ডোজ দিতে হবে। অথচ এখন দৈনিক দেওয়া হচ্ছে গড়ে আড়াই লাখ করে টিকা। এই গতিতে টিকা দেওয়া অব্যাহত থাকলে ফেব্রুয়ারি শেষে অর্ধকোটির বেশি, অর্থাৎ ৫৫ লাখ ৬০ হাজার ৯৩৩ জন টিকার প্রথম ডোজের বাইরে থাকবে।  

দ্বিতীয় ডোজ বাকি ৪০ শতাংশ : সরকার আগামী এপ্রিলের মধ্যে দেশে করোনার টিকাদান কর্মসূচি শেষ করতে চায়। সে জন্য মার্চ ও এপ্রিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্বিতীয় ডোজ টিকা শেষ করার পরিকল্পনা করেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ৭ কোটি ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭২১ জন, যা লক্ষ্যমাত্রার জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশ। সে হিসেবে আগামী এপ্রিলের মধ্যে অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বা ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ২৩৩ জনকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হবে।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, প্রথম ডোজ দিলে দ্বিতীয় ডোজ সবাই এমনিতেই নিতে আসে। এখন দ্বিতীয় ডোজ চলছে। ইতিমধ্যেই প্রথম ডোজ ১০ কোটি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ ৭ কোটি দিয়েছি। প্রথম ডোজ যোগ হচ্ছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ডোজও চলছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি যদি ১ কোটি প্রথম ডোজ দিতে পারি, তাহলে ২৬ মার্চের মধ্যে এদের দ্বিতীয় ডোজও দিয়ে দেব। এ ক্ষেত্রে যেটা সুবিধা হবে, মার্চের মধ্যেই আমরা মূল টিকা দিয়ে দিতে পারব। কারও যদি টিকা বাকি থাকে, নিতে অসুবিধা হচ্ছে, অসুস্থ হয়ে গেছে, তারা এপ্রিলে নিয়ে নিতে পারবে। সে জন্য এপ্রিলের মধ্যেই যাতে ৭০ শতাংশ মানুষের সম্পূর্ণ টিকা শেষ করতে পারি, সে পরিকল্পনা মাথায় রেখেই আমরা ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ ক্যাম্পেইনটা করছি।

ঢাকার বাইরে শুরু হচ্ছে বাদ পড়াদের টিকা : এ ব্যাপারে ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, বাদ পড়া শ্রেণির মানুষের টিকা মোটামুটি চলছে। এদের একটা অসুবিধা হচ্ছে, তাদের তো কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট জায়গাও নেই যে সেখানে গিয়ে তাদের সবাইকে টিকা দিতে পারব। সে জন্য আমরা যখন যেখানে যাচ্ছি, যতজনকে পাচ্ছি, তাদের টিকা দিয়ে যাচ্ছি।

এই কর্মকর্তা বলেন, বাদ পড়া শ্রেণির টিকাদান কর্মসূচি ঢাকার বাইরেও সম্প্রসারণ করব। এ জন্য সব জায়গাতেই প্রস্তুতি নিতে বলেছি; বিশেষ করে বড় শহর যেখানে, সেখানে দেওয়া হবে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে টিকা পৌঁছে দিয়েছি। তারা যে কোনো দিন শুরু করবে। মোটামুটি পর্যায়ক্রমে এই শ্রেণির মানুষকে টিকার আওতায় আনা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় ভাসমান মানুষ ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে কওমি মাদ্রাসার ৬ হাজার ৯০৮ জন শিক্ষার্থী ও ২৬ হাজার ৮০৬ জন ভাসমান মানুষকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া এ পর্যন্ত দেশের উপজেলা পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে মোট ১ কোটি ৮১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৭৫ জন প্রথম ডোজ ও ১ কোটি ৭ লাখ ৯২ হাজার ৫১৫ জন দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত