একে একে নিভে যাচ্ছে উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনের আলোকিত সব তারকা। কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকর ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের পর এবার না ফেরার দেশে চলে গেলেন ভারতীয় গায়ক, সুরকার ও সংগীত পরিচালক বাপ্পি লাহিড়ী। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে ভারতের মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।
এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি অসীমের পথে যাত্রা করেন লতা মঙ্গেশকর। এর ১০ দিনের ব্যবধানে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চলে যান আরেক কিংবদন্তি শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। একই দিনে কয়েক ঘণ্টা পর মধ্যরাতের একটু আগে ওপারে পাড়ি জমান বলিউডে ‘ডিস্কো কিং’ হিসেবে পরিচিত বাপ্পি লাহিড়ী।
বাপ্পি লাহিড়ীর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে টুইট করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লিখেছেন, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাপ্পি লাহিড়ীর গান মনে রাখবে। প্রাণবন্ত এ শিল্পীর না থাকা অনুভব করবে সবাই।’
ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের শিল্পী ও কলাকুশলীরাও জনপ্রিয় সুরস্রষ্টা বাপ্পি লাহিড়ীর মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের তারকারাও তাদের প্রিয় ‘বাপিদা’র মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমার টুইট করে লিখেছেন, ‘বাপ্পিদা, আমিসহ লাখো মানুষের নাচের কারণ ছিল তোমার কণ্ঠ। সংগীতের মাধ্যমে যে সুখ তুমি এনে দিয়েছিলে, সেজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’
এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়, মঙ্গলবার রাতে মুম্বাইয়ের ক্রিটিকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যু হয় আশি ও নব্বইয়ের দশকে ডিস্কো গানকে জনপ্রিয় করা বাপ্পি। হাসপাতালটির পরিচালক ডা. দীপক নামযোশী বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেন, ‘এক মাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন লাহিড়ী, যাকে সোমবার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। তবে মঙ্গলবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বাসায় ডাক্তার ডাকা হয়। পরে তাকে ফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা ছিল। মধ্যরাতের কিছু আগে অবস্ট্রাকটিভ সিøপ অ্যাপনিয়ায় (ওএসএ) তার মৃত্যু হয়।’
আনন্দবাজার লিখেছে, গত বছর এপ্রিল মাসে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন বাপ্পি লাহিড়ী। ওই সময় মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন এই শিল্পী।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে বাপ্পি লাহিড়ীর আবির্ভাব। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নান্নাহ শিকারি’ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। পরে আশি ও নব্বই দশকে তখনকার বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তার ক্যারিয়ার তুঙ্গে পৌঁছায়। একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়েছেন ভারতীয় সংগীতের এ ‘ডিস্কো কিং’। হিন্দিতে ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘ডান্স ডান্স’, ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘চলতে চলতে’, ‘শরাবি’, ‘সত্যমেব জয়তে’, ‘কমান্ডো’, ‘শোলা অউর শবনম’ সিনেমায় তিনি সংগীত পরিচালনা করেছেন। ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ সিনেমায় বাপ্পি লাহিড়ীর গান ‘আই অ্যাম আ ডিস্কো ডান্সার’ বলিউডকে নতুন ধরনের মুক্ত নাচের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ১৯৮২ সালের ওই সিনেমায় তার গানে নেচে তারকাখ্যাতি পান মিঠুন চক্রবর্তী।
কলকাতায় ‘অমর সঙ্গী’, ‘আশা ও ভালোবাসা’, ‘আমার তুমি’, ‘অমর প্রেম’ সিনেমার গানেও সুর দিয়েছেন; গেয়েছেন একাধিক গান। ২০২০ সালে ‘বাগি-৩’ সিনেমার জন্য গাওয়া ‘ভানকাস’ তার শেষ গান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে’ গানটির সুরকার ছিলেন বাপ্পি লাহিড়ী। গানটি লিখেছেন গীতিকার শ্যামল গুপ্ত, যিনি সদ্য প্রয়াত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী।
১৯৫২ সালের ২৭ নভেম্বর জলপাইগুড়িতে বাপ্পি লাহিড়ীর জন্ম। আসল নাম অলোকেশ লাহিড়ী। বাবা অপরেশ লাহিড়ী ও মা বাঁশরী লাহিড়ী দুজনই ছিলেন গানের জগতের মানুষ। ভারতীয় চলচ্চিত্রের আরেক প্রবাদপ্রতিম গায়ক, অভিনেতা কিশোর কুমার ছিলেন তার মামা।
বাপ্পি লাহিড়ী তার পোশাকের সঙ্গে বাহারি সব সোনার গহনা পরতে ভালোবাসতেন; বলতেন, ‘আমার ভগবানের নাম সোনা!’ আলঙ্কারিক জাঁকাল সাজ তাকে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল। সবসময় চকচকে সোনার চেইন ও ব্রেসলেট পরতেন। অনেকের জন্য তিনি ছিলেন স্টাইল আইকন। মখমলের জ্যাকেট আর চকচকে জরিদার ঢিলেঢালা পোশাক ছিল তার ট্রেডমার্ক স্টাইল।
ভারতের ৬৩তম ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড জেতেন বাপ্পি লাহিড়ী। গানের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও নেমেছিলেন। ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরে লোকসভা আসনে বিজেপির হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে হেরে যান।
