আসামি ধরতে চিত্রশিল্পী!

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৪৫ এএম

চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন করতে আসামি শনাক্ত করাসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পুলিশকে; বিশেষ করে আসামি চিহ্নিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তদন্তকারী সংস্থাকে। এই সমস্যা দূর করতে পুলিশ বাহিনী তার সব ইউনিটে চিত্রশিল্পী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। মাস দুয়েক আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে চিত্রশিল্পী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তারা চাইছেন শতাধিক চিত্রশিল্পী নিয়োগ দিতে। 

পুলিশ সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) আদলে গড়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) জরুরিভিত্তিতে অন্তত ৪০ জন চিত্রশিল্পী নিয়োগ দিতে সংস্থাটিও আলাদাভাবে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ওই চিঠিতে সংস্থাটি বলেছে, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সমন্বয় করেই নিয়োগ দিলে ভালো হয়।

জানতে চাইলে পিবিআইর প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বনজ কুমার মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার সন্দেহভাজন আসামি চিহ্নিত করতে চিত্রশিল্পী প্রয়োজন হয়ে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘খুন, চুরি, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, প্রতারণা ও জালিয়াতির মতো সব ধরনের মামলার তদন্ত করে আসছে পিবিআই। আমরা সব ধরনের মামলাকে একই রকম গুরুত্ব দিয়ে থাকি।’

পিবিআই গঠনের পর আলোচিত একাধিক মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে সংস্থাটি। চিত্রশিল্পী না থাকায় স্কেচ দিয়ে সন্দেহভাজন আসামির ছবি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না তাদের। ফলে অনেক মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামিদের আইনের আওতায় আনতে হিমশিমও খেতে হচ্ছে। তারপরও পিবিআইর তদন্তে আস্থা বাড়ছে ভুক্তভোগীদের। অনেক মামলার বাদীই পিবিআইকে দিয়ে তদন্তের আবেদন জানাচ্ছেন।

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পিবিআই আদালতের নির্দেশে (সিআর) মোট ৮৭ হাজার ২৮২টি মামলা তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ৭৯ হাজার ৭৭৩টি মামলার অভিযোগ প্রমাণ করেছে ইউনিটটি। এসব মামলার ২৭ হাজার ৫৩০টিতে দেখা গেছে, এজাহারে যে অভিযোগ ছিল তা থানা পুলিশ বা অন্য ইউনিটের তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। একইভাবে থানায় দায়ের হওয়া (জিআর) ২০ হাজার ৭৯২টি মামলার মধ্যে পিবিআই তদন্ত করে ১৭ হাজার ৯৫টির অভিযোগ প্রমাণ করত পেরেছে। বাকি ৪ হাজার ৯৯০টি মামলা তদন্তে প্রমাণিত হয়নি বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের নভেম্বর মাসে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে পিবিআইর প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে চিত্রশিল্পীর বিষয়টি সামনে আনা হয়। একাধিক মামলার সন্দেহভাজন আসামির ছবি আঁকতে না পারার কারণে তদন্তকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে আইজিপিকে জানানো হয়। চিত্রশিল্পী নিয়োগের বিষয়ে একমত পোষণ করে আইজিপি পুলিশের যেসব ইউনিট মামলার তদন্ত করছে তাদের জন্য চিত্রশিল্পী নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের সব কটি ইউনিটে চিত্রশিল্পী নিয়োগের জন্য আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। শিল্পী নিয়োগ হলে তারা পুলিশে সিভিল ডিপার্টমেন্টে কাজ করবেন। আর প্রথমে পাবে পিবিআই। কারণ তারা এখন মামলার তদন্ত করছে সবচেয়ে বেশি। তারপর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ (সিআইডি) অন্য ইউনিট পাবে। পরের পর্যায়ে থানা পুলিশের জন্য চিত্রশিল্পী দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশে^র বিভিন্ন দেশে পুলিশের তদন্তকাজের জন্য চিত্রশিল্পী ব্যবহার করা হয়; বিশেষ করে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন আসামি চিহ্নিত করতে শিল্পীদের দিয়ে স্কেচ আঁকা হয়। বর্তমানে চারুকলা থেকে চিত্রশিল্পী ভাড়া করে পুলিশ সন্দেহভাজন আসামিদের ছবি স্কেচ করে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশে চিত্রশিল্পী কীভাবে নিয়োগ দেওয়া যায় তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিব আলোচনা করবেন। প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন তারা। দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ চিত্রশিল্পী পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সিআইডি ও ডিবির দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তকে বলেন, পিবিআইর মতো মাঝেমধ্যে মামলার সন্দেহভাজন আসামি শনাক্ত করতে স্কেচ তৈরি করতে তাদেরও চারুকলা থেকে চিত্রশিল্পী ভাড়ায় আনতে হয়। মাঝেমধ্যে জরুরি প্রয়োজন হয়ে পড়লে শিল্পী পাওয়া যায় না।

একই কথা বলেছেন জেলার কয়েকজন পুলিশ সুপার। তারা বলেন, সন্দেহভাজন আসামিদের শনাক্তের জন্য জরুরি ভিত্তিতে চিত্রশিল্পী নিয়োগ দিলে পুলিশ খুবই উপকৃত হবে।

পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত কয়েক হাত ঘুরে মামলা আসে পিবিআইতে। এ কারণে অপরাধীদের শনাক্ত করতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও অনেক সময় কাজ আসে না। এ কারণে পেশাদার সোর্সের পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করতে চিত্রশিল্পী নিয়োগের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত