দেশের সাত সিটি করপোরেশনকে ‘সোলার স্ট্রিট লাইটিং ইন সিটি করপোরেশন’ প্রকল্পের আওতায় দেওয়া গাড়ি ফেরত পাচ্ছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের মেয়রদের কাছে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। এরপরও গাড়ি ফেরত না পাওয়ায় বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও চিঠি দিয়েছে। কিন্তু সে সাতটি গাড়ি আর ফেরত আসেনি।
ওই সাত সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গাড়িগুলো পিডিবি কিনলেও নিবন্ধন করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের মেয়রদের নামে। তাই তারা বারবার চিঠি পেয়েও এসব গাড়ি ফেরত দিতে পারছে না।
পিডিবি সূত্রে জানা যায়, সাত সিটি করপোরেশনে বিদ্যুৎ বিভাগের ‘সোলার স্ট্রিট লাইটিং ইন সিটি করপোরেশন’ প্রকল্প শেষ হয়েছে ২০১৮ সালে। এরপর থেকে গাড়ি ফেরত চেয়ে পিডিবি বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বারবার চিঠি দিয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব অরুণ কুমার ম-ল স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমদকে চিঠি দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ৭টি গাড়ি (৪টি জিপ ও ৩টি ডাবল কেবিন) সিটি করপোরেশনকে সাময়িকভাবে বরাদ্দ করা হয়। ‘সোলার স্ট্রিট লাইটিং ইন সিটি করপোরেশন’ প্রকল্প থেকে সাময়িকভাবে বরাদ্দ করা গাড়িগুলো এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি।
ওই চিঠিতে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের, ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন, ২২ আগস্ট রংপুর সিটি করপোরেশন, ২০ সেপ্টেম্বর রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রকল্প শেষ হয়। কাছাকাছি সময় শেষ হয় সিলেট সিটির কাজ।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘২০১৮-১৯ অর্থবছরে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট পরিদপ্তর তাদের নিরীক্ষাকালে গাড়ি ফেরত না দেওয়ায় অডিট আপত্তি দেওয়া হয়েছে। এ অডিট আপত্তি শেষ করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ ব্রডশিট জবাব পাঠালেও তা গ্রহণ না করে গাড়ি জমাদানের প্রমাণসহ দুই দফা নির্দেশনা দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। বরাদ্দপত্রের শর্ত নম্বর-গ অনুযায়ী এবং সরকারি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য বরাদ্দ করা গাড়িগুলো ৭টি সিটি করপোরেশন থেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন।’
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, শর্ত সাপেক্ষে ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘সোলার স্ট্রিট লাইটিং ইন সিটি করপোরেশন’ প্রকল্প থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম মোর্শেদকে মিৎসুবিশি ২০০ ডাবল কেবিন পিকআপটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। একইভাবে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানকে একই মডেলের গাড়ি দেয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। একই বছর বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ন কবিরকে মিৎসুবিশি পাজেরো স্পোর্টস জিপ বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রকল্প থেকে। একই ভাবে রংপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহফুজুল হক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে মিৎসুবিশি পাজেরো স্পোর্টস জিপ সাময়িক বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী ৭ সিটি করপোরেশনকে প্রকল্প থেকে দেওয়া গাড়িগুলো পিডিবিকে ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অনেক প্রকল্প আছে তো। এখন কোন প্রকল্পের যানবাহন ফেরত দেওয়া হয়নি; তা বিস্তারিত না জেনে বলতে পারছি না। পরে জেনে জানাতে পারব।’
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী প্রকল্প শেষ হওয়ার পর যানবাহন ফেরত দেওয়ার কথা। আমি নিজে ফেরত দিতেও চাই। এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীকে নির্দেশনাও দিয়েছি। কিন্তু মেয়র সাহেব দিতে চাচ্ছেন না। জানেন তো সিটি করপোরেশনের আইন অনুযায়ী মেয়রই সব।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল আলম গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এ ধরনের চিঠি মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছি। এরপর খোঁজখবর নিয়ে জানলাম; যে গাড়ি পিডিবি দিয়েছে তা মেয়রের নামে রেজিস্ট্রেশন করা। তাহলে আমরা তাদের কীভাবে ফেরত দেব। তাদের (পিডিবি) অডিট আপত্তিও দেখেছি। পরে আমি উদ্যোগও নিয়েছি। এখন যে সমস্যা দেখা যাচ্ছে তাতে তো গাড়ি ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই।’
শহিদুল আলম বলেন, ‘পিডিবির ভাষ্য অনুযায়ী প্রকল্পের পিডি যদি গাড়ি ব্যবহার করতেন তাহলে তা সাময়িকভাবে দেওয়ার কথা। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তারা গাড়ি পাবে। এখন আমাদের মেয়রের নামে রেজিস্ট্রিশন (নিবন্ধন) করা গাড়ি তারা নিয়ে কিভাবে চালাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘যদিও গাড়িগুলো পিডিবি কিনেছে। পরে তারা আমাদের দিয়েছি। এখন দেখার বিষয় কিভাবে এটা আমাদের নামে রেজিষ্ট্রিশন হলো। এসব সমস্যা তো আমাদের না। এটা পিডিবিকে সমাধান করতে হবে। না হয় যত চিঠি দিক গাড়ি তো ফেরত দিতো পারবো না।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ পিডিবির সচিব সাইফুল ইসলামকে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।
