দুর্নীতির তদন্তে নেমে জীবন ও চাকরি খোয়ানোর হুমকি পাওয়ার পরও চাকরিচ্যুত দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা মো. শরীফ উদ্দিন আমৃত্যু দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন বলে জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে তিনি তার চাকরিচ্যুতির বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করবেন বলেও জানান।
গতকাল শনিবার রাতে টেলিফোনে চাকরি থেকে অপসারিত দুর্নীতি দমন কমিশনের উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি। জীবনে কখনো অন্যায় বা দুর্নীতির সঙ্গে আপসও করিনি। এমনকি কারও কাছে মাথা নত করিনি। চাকরিজীবনে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব পেয়েছি। কিন্তু ঘৃণাভরে ওই সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি।’ ন্যায়বিচার পেতে তিনি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
শরীফ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মজলুম। আমি জুলুমের শিকার। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে কোনো অন্যায় করিনি। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। পটুয়াখালীতেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করেছি। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যতগুলো বড় মামলা নিয়ে কাজ করেছি, যেখানে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ ছিল, সেখানেই আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। অনর্থক বা কারোর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে অন্যায়ভাবে কোনো ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি দ্রুত। গ্রেপ্তার করেছি।’ তিনি বলেন, ‘জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত করতে হয়েছে আমাকে। আর তাতেই ওই সব প্রভাবশালী আমার বিরুদ্ধে অনেকটা যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আমি তো ছোট মানুষ। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সনীতি গ্রহণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করেছি। অথচ এই কাজ করতে গিয়ে আমাকে চাকরি হারাতে হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে।’
গত বুধবার দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন আব্দুল্লাহ স্বাক্ষরিত এক আদেশে উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দীনকে আকস্মিক চাকরিচ্যুত করা হয়। আদেশে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধিতে ৫৪(২) প্রদত্ত ক্ষমতাবলে শরীফ উদ্দিনকে (উপসহকারী পরিচালক) চাকরি থেকে অপসারণ করা হলো। তিনি বিধি মোতাবেক ৯০ দিনের বেতন এবং প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
চাকরিচ্যুতির ১৬ দিন আগে শরীফ চট্টগ্রামের খুলশী থানায় জীবননাশ ও চাকরি খাওয়ার হুমকির অভিযোগ করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন।
শরীফকে চাকরিচ্যুত করার পরদিন বৃহস্পতিবার বিভিন্ন মহল থেকে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রতিবাদে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একই দাবিতে তারা দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনও করেন। দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শরীফকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুদকের কর্মচারী (চাকরি) বিধিমালা-২০০৮-এর বিতর্কিত ৫৪(২) ধারা বাতিল করারও দাবি জানান তারা।
এক প্রশ্নের জবাবে শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘দুদক (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৫৪ (২)-এ প্রদত্ত ক্ষমতায় অপসারণ অসাংবিধানিক; যা সংবিধানের ১৩৫ আর্টিকেলকে কাভার করে না। আমি সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমি সেই অধিকার ফিরে পেতে চাই। এখন আমি নিয়মিত প্রভাবশালীদের হুমকিতে আছি। এমনকি গুম হওয়ার আশঙ্কাও করছি। তবে আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস আছে। আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রপ্রতি, প্রধানমন্ত্রী ও দুদক চেয়ারম্যান আমার ওপর ন্যায়বিচার করবেন।’
শরীফকে চাকরিচ্যুত করার পেছনে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ দাবি, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি দেখানো ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শরীফ বলেন, ‘এখন আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে তার একটাও যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে, তাহলে সব ধরনের শাস্তি মাথা পেতে নেব।’ অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই চাকরি থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘দুদকে আমার বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ দিয়েছে, তারা সবাই আসামি। যাদের গ্রেপ্তার করেছি। আসামিরা বাঁচার জন্য আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেবেই, সেই জন্য সত্যতা যাচাই না করেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে? আমাকে আটকাতে পারলে তো আসামিদেরই লাভ। কেননা তখন আর তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট হবে না। দুর্নীতিবাজরা আশকারা পাবে।’
শরীফ আরও বলেন, ‘আমাকে চাকরিচ্যুত করার দুই থেকে তিন মিনিটের মাথায় আমার আইডি কার্ড অনেকটা জোর করে নেওয়া হয়েছে। এমনভাবে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে মনে হয়েছে আমি কোনো দাগি আসামি। এমনকি আমার কাছে অফিশিয়াল কিছু নেই এই শর্তে হলফনামা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের নির্দেশ মানতে গিয়ে নিজের জীবনকে জীবনই মনে করিনি। সংসারকে পর্যন্ত সময় দিইনি। চাকরি যাওয়ার বিষয়টি আমাকে অনেক পীড়া দিচ্ছে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে বলা হয়েছে আমি নাকি ১০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছি। এটিও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। আমার সহায়-সম্পদ কী আছে, তা সবাই জানে। আবারও বলছি, আমি যদি দুর্নীতি করতাম তাহলে বড় বড় রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযানে যেতাম না। তাদের সঙ্গে আপস করেই চলতাম। তারা অনেক চেষ্টা করেছিল আমাকে বশে নিতে। কিন্তু পারেনি। সেটি না পেরে আমার চাকরিটা খেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমি এখনো আশাবাদী, ন্যায়বিচার পাব।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদকের যেকোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতেই পারে। কিন্তু শরীফ উদ্দিনের বেলায় কোনো ধরনের তদন্ত করা হয়নি। তার বিষয়ে তদন্ত করা উচিত ছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দুদক কর্মচারী বিধিমালার যে ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে, তার কার্যকারিতার বিষয় নিয়েও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, এই বিধিমালায় ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ না দর্শানোর কোনো কর্মচারীকে নব্বই দিনের নোটিস প্রদান করে অথবা নব্বই দিনের বেতন পরিশোধ করেই তাকে চাকরি হইতে অপসারণ করতে পারবে। অন্যদিকে সংবিধানের ১৩৫(২) নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা আছে, অনুরূপ পদে (প্রজাতন্ত্রের অসামরিক পদে) নিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে তার সম্পর্কে প্রস্তাবিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনতি করা যাবে না।
