যুদ্ধের প্রস্তুতির ঘোষণা ইউক্রেনের বিদ্রোহীদের

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৪০ এএম

ইউক্রেন ঘিরে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র উত্তেজনার মধ্যে পূর্ব ইউক্রেনের বিদ্রোহীরা যুদ্ধের জন্য পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছে এএফপি। সংঘাতের হুমকির মুখে নারী ও শিশুদের রাশিয়ার দক্ষিণে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার একদিন পর তারা এ ঘোষণা দেয়। গতকাল শনিবার স্বঘোষিত দনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিকের (ডিপিআর) প্রধান ডেনিস পুশিলিন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, তিনি সামরিক প্রস্তুতির একটি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেছেন এবং যারাই ‘হাতে অস্ত্র নিতে সক্ষম’ তাদের সামরিক দপ্তরে ডাকা হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর আরেক বিদ্রোহী নেতা লিওনিড পাসেচনিকও লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের ক্ষেত্রে একই রকম একটি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন।

এর আগে শুক্রবার বিদ্রোহী নেতারা ইউক্রেনীয় বাহিনীর আসন্ন হামলার আশঙ্কার কথা বলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে রাশিয়ায় প্রায় ৭ লাখ লোককে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। তবে কিয়েভ বিদ্রোহীদের এলাকায় হামলার পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে। প্রসঙ্গত, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এক ঘোষণায় বলেছেন, ইউক্রেনের  পূর্বাঞ্চল থেকে আসা মানুষদের যেন রাশিয়ার মাটিতে জায়গা দেওয়া হয়। শনিবার সকাল পর্যন্ত দনেৎস্ক থেকে ৭ হাজারের মতো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় জরুরি মন্ত্রণালয়।

শনিবার দনেৎস্কের উত্তরে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। প্রথমে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে বিদ্রোহীদের গোলা ছোড়ার কথা বলা হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, একটি গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে বিস্ফোরণের কারণ জানা যায়নি। এদিকে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বিদ্রোহীদের ছোড়া গোলার আঘাতে তাদের এক সৈনিক নিহত হয়েছেন। তবে ওই সৈনিকের পরিচয় ও কোন স্থানে তিনি নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ইউক্রেন।

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে নিজেদের দূতাবাস সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাজ্য। ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লেভিভে আপাতত অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হবে দেশটির দূতাবাস। দূতাবাসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ইতিমধ্যে এই পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। সব দূতাবাসকর্মীকে কিয়েভ ছেড়ে লেভিভে যাওয়ার নির্দেশও দিয়েছে ব্রিটেনের সরকার। গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘যে কোনো সময় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে রাশিয়া। এই পরিস্থিতিতে কর্মীদের নিরাপত্তা ও ইউক্রেনের সঙ্গে কূটনৈতিক সংযোগ অক্ষুণœ রাখতেই দূতাবাস স্থানান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ একই কারণে ইউক্রেনে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশে ফিরে আসারও আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে যেহেতু দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক আছে, তাই এখনই এ ব্যাপারে নাগরিকদের কোনো সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর মধ্যে শনিবার জার্মানির মিউনিখে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, কমলা হ্যারিসের বৈঠকের বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে ওয়াশিংটন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কমলা হ্যারিস রাশিয়াকে সতর্ক করে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণও দেবেন। রাশিয়ার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগ দেওয়ার কার্যক্রম আরও অগ্রসর হবে এবং ইউক্রেন আক্রমণ করলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে এমন হুঁশিয়ারিও আসতে পারে কমলা হ্যারিসের কাছ থেকে।

পুতিন হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিশ্চিত বাইডেন : ইউক্রেনে হামলার বিষয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সেই হামলার অজুহাত সৃষ্টির জন্যই রাশিয়া সেনা প্রত্যাহারের মতো ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে বলেও ধারণা তার। গত শুক্রবার কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর প্রতিনিধিনিদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউজে উপস্থিত সাংবাদিকদের বাইডেন বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমি নিশ্চিত যে, তিনি (পুতিন) হামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। আমাদের এটা বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক কারণ রয়েছে এবং (এ ব্যাপারে) আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

রয়টার্সকে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে হামলা করেই বসে; সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও সমন্বিতভাবে দেশটির ওপর বহুমুখী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন শুক্রবারের বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। এছাড়া পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোকে শক্তিশালী করার ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে।

বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়া যদি চায়, তাহলে এখনো কূটনৈতিকভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার সংকটের সমাধান সম্ভব; কিন্তু মস্কো যদি সত্যিই হামলা করে বসে, সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে।

ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সংকট মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোকে ঘিরেই। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গরাজ্য ও রাশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইউক্রেন কয়েক বছর আগে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করার পর থেকেই সংকট শুরু হয় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। সম্প্রতি ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্যপদ না দিলেও ‘সহযোগী দেশ’ হিসেবে মনোনীত করার পর আরও বেড়েছে এই উত্তেজনা।

পরমাণুবাহী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ : রাশিয়া কয়েক দিনের মধ্যে ইউক্রেনে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবির মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছে রাশিয়া।

এএফপি বলছে, গতকাল রাশিয়ার একটি টেলিভিশন চ্যানেলে বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ক্রেমলিনের একটি কক্ষে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো বসে আছেন। তাদের সামনেই একাধিক স্ক্রিনে হাইপারসনিক, ক্রুজ ও পারমাণবিক বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের ভিডিও দেখানো হয়।

ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের সব কটিই লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বাইরেও টিইউ-৯৫ বোমারু বিমান ও সাবমেরিন নিয়ে মহড়া চালানো হয়েছে।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, রুশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় সব শাখায় এমন মহড়া চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার কৌশলগত রকেট ফোর্স থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলীয় ও কৃষ্ণসাগরে মোতায়েন করা সামরিক বহরও। এই বহরে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত