গত বছর সরকার যখন ৬টি চিনিকল বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন কৃষি, কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থে আমরা তার প্রতিবাদ করেছিলাম। বলেছিলাম, সরকারি চিনিকলগুলো বন্ধ হলে দেশে চিনি পরিশোধন কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধির একচেটিয়া তা-ব শুরু হবে। চিনির দাম বেড়ে যাবে। যে চিনি এখন ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে তা বিক্রি হবে ১০০ টাকা কেজিতে। পরবর্তী সময়ে সয়াবিন তেলের মতো চিনির দাম বাড়তে বাড়তে ১৬০ টাকা হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ১৭ কোটি মানুষের মিষ্টি জাতীয় দ্রব্যের বাজার যখন মুষ্টিমেয় কয়েকটি ‘র-সুগার’ মিলমালিক নিয়ন্ত্রণ করবে, তখন চিনির বাজারে অস্থিরতা দূর হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির মিথ্যা অজুহাতে রিফাইনারি কোম্পানির মালিকরা ভোক্তাদের পকেট গড়ের মাঠে পরিণত করবে এটাই স্বাভাবিক।
আমরা বলেছিলাম ৬টি চিনিকল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে ওইসব মিল এলাকাসহ অন্যান্য মিল এলাকায় আখের আবাদ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। যে সামান্য আখ উৎপাাদিত হবে, তাতে অবৈধ পাওয়ার ক্রাশারের গুড় তৈরির চাহিদাই পূরণ হবে না। চিনিকলগুলো আখের সংকটে বন্ধ হয়ে যাবে। গরিবের মিষ্টি জাতীয় খাদ্য; গুড়ের দামও বেড়ে যাবে অস্বাভাবিকভাবে। বর্তমানে দেশের বিভন্ন স্থানে প্রতিকেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে। আর খেজুর নামের ভেজাল গুড় বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজি দরে।
গুড়ের দাম বেশি থাকার কারণে মিল এলাকার অবৈধ পাওয়ার ক্রাশার মালিকরা চিনিকলের চেয়ে মণপ্রতি ৫০ টাকা বেশি দামে উচ্চ গুণগত মানের চিনি আর টাটকা আখ কিনে গুড় তৈরি করে লাভবান হচ্ছেন। আর চিনিকলগুলো আখের অভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আগেই উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে জয়পুরহাটের মতো চিনিকলে ১৮ দিনের মধ্যে মাড়াই বন্ধ হয়ে গেছে। যে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলে মার্চের আগে কোনো দিন মাড়াই বন্ধ হয়নি, সেই চিনিকলটিও ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম প্রহরেই উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই চিনিকলটির চিনি আহরণ হারও ছিল এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। চিনি আহরণ হারের দিক দিয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে জিলবাংলা সুগার মিলস লিমিটেড। ওই চিনি কলের গড় চিনি আহরণ হারও ৭ অতিক্রম করতে পারেনি। ৯০ দশকে আমরা দেখেছি, চিনিকলের গড় রিকভারি ছিল আটের ওপর। তখন চিনি কলগুলো ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং আখ চাষের প্রতি কৃষকের আগ্রহ ছিল প্রচুর। বর্তমানে সরকারি মিলে প্রতিমণ আখের দাম ১৪০ টাকা। আর গুড় প্রস্তুতকারী পাওয়ার ক্রাশারের মালিকরা সেই আখ কিনছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা মণ দরে। গুড় ব্যবসায়ীদের কাছে আখ বিক্রি করে কৃষক প্রতিমণে ৫০ টাকা বেশি পেলে চিনিকলে কম দামে আখ সরবরাহ করবে কেন? তাই প্রতিটি মিলে এবার দাবি উঠেছিল আখের মূল্যবৃদ্ধির। খেয়াল করা দরকার উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ যত কম হবে, তত বেশি হবে প্রতি ইউনিট চিনির দাম এবং লোকসানের পাল্লাও হবে তত ভারী। চিনিকলগুলোকে ‘নো প্রফিট-নো লস’-এ চালাতে হলেও মিলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে মিল এলাকার আখ দিয়ে তা আর সম্ভব নয়। গত বছর ৯টি চিনিকলে আখ থেকে চিনি উৎপাদন হয়েছিল ৫০ হাজার মেট্রিক টন আর এবার হয়েছে মাত্র ২৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। ২৪ হাজার মেট্রিক টন চিনি দিয়ে সরকারের পক্ষে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কোনো ক্রমেই সম্ভব হবে না। তাই সরকারি আখভিত্তিক চিনিকলগুলো থেকে উৎপাদন ক্ষমতা মোতাবেক চিনি উৎপাদন করতে হলে আখের পাশাপাশি ‘র-সুগার’ থেকে সাদা চিনি তৈরি করতে হবে। এ কাজে আমাদের নদীবন্দর নিকটবর্তী মিলগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অন্যদিকে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এখনো চিনির কেজি ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়েছে এমন কোনো তথ্যও তো আমাদের কাছে নেই। সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পর চিনির নতুন দাম নির্ধারণ করে সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েসন। তখন জানানো হয়, প্রতিকেজি খোলা চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৭৪ আর প্যাকেটজাত চিনির ৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গত ৫ মাসে এ দামে দেশের কোথাও চিনি বিক্রি হয়নি। বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতিকেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে কমবেশি ৮০ টাকায় এবং প্যাকেটজাত ৮৫ থেকে ৯৫ টাকায়। সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী দেশের বিভিন্ন বাজারে প্রতিকেজি খোলা চিনি বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকায়। প্রতিবছর দেশে চিনির মোট চাহিদা ১৫ থেকে ১৭ লাখ টন। এর মধ্যে ৭০ থেকে ১ লাখ টন চিনি আসত রাষ্ট্রায়ত্ত চিনকল থেকে। গত বছর সরকারি মিলগুলোতে চিনি উৎপাদিত হয়েছিল ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর সরকারি মিলগুলোতে চিনি উৎপাদন হয়েছে ২৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া সরকার প্রতিবছর টিসিবির মাধ্যমেও বেশ কিছু পরিমাণ চিনি আমদানি করে। অর্থাৎ চাহিদার শতকরা ৪ থেকে ৫ শতাংশ চিনির জোগান আসে সরকারিভাবে। বাকি চিনির পুরোটাই সরবরাহ করে দেশের গুটিকয় কোম্পানি। এ খাতে নতুন উদ্যোক্তাও পাওয়া যাচ্ছে না। চিনি ডিলার অ্যাসোসিয়েসনের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, গুটিকয় মিল মালিকের হাতে চিনির বাজার আটকে গেছে। ফলে তারা খেয়ালখুশি মতো পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। নভেম্বরের পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কমতির দিকে। ফলে নতুন করে আর দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। বরং ট্যাক্স কমালে এ সুবিধা যাবে মিল মালিকদের পকেটে। কিন্তু ভোক্তার কোনো লাভ হবে না। কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থে দেশে চালু আখভিত্তিক ৯টি চিনিকলকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আজকের সরকারি চিনিকলগুলোকে গলাটিপে হত্যা করার জন্য করপোরেশনের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত কম দায়ী নয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. মিলগুলোতে আখ চাষে নিয়োজিত কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের শূন্য পদ সময় মতো পূরণ না করা। ২. সময় মতো আখ চাষের উপকরণ সরবরাহ না করা। ৩. সময় মতো আখের মূল্য পরিশোধ না করা। ৪. আখচাষিদের মতামত উপেক্ষা করে মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে আখের মূল্য প্রদান করা। ৫. উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছর আখের মূল্য বৃদ্ধি না করা। ৬. চিনিকলগুলোকে লাভজনক করার জন্য পণ্য বহুমুখীকরণ না করা। ৭. বহু বছরের পুরাতন ও জরাজীর্ণ চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন না করা। ৮. প্রকল্প গ্রহণে দূরদর্শিতার অভাব ইত্যাদি।
এই অবস্থায় চিনিকলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
১. মিলজোন এলাকায় আখের চাষ বৃদ্ধির জন্য প্রতিবছর উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আখের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
২. রোপা আখের মতো সরাসরি আগাম আখ চাষের ওপরও ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
৩. উচ্চ চিনি আহরণযুক্ত জাতসমূহের আবাদে চাষিকে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিতে হবে।
৪. পদ্ধতিগত মুড়ি আখ চাষের ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
৫. প্রতিটি কেন্দ্রে ময়লা-আবর্জনামুক্ত সতেজ, টাটাকা আখ ক্রয় এবং ক্রয়কৃত আখ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাড়াই নিশ্চিত করতে হবে।
৬. প্রতিদিন মাঠ থেকে জাতভিত্তিক ও শ্রেণিভিত্তিক আখের নমুনা সংগ্রহ করে চিনি রিকভারির হার নির্ণয় করতে হবে। একই কাজ করতে হবে কেন্দ্রগুলো থেকে সংগ্রহকৃত আখের নমুনার ক্ষেত্রে। এভাবে আহরণ কমার প্রকৃত কারণ নিরূপণ করে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. বাংলাদেশের চিনিকলগুলোতে চিনি আহরণ হার হ্রাসের প্রকৃত কারণ ও পরিত্রাণের পথ নিরূপণের পরামর্শের জন্য আমাদের প্রতিবেশী চিনি উৎপাদনকারী দেশগুলোর কৃষিবিদ, রসায়নবিদ ও প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গঠিত টিমকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
৮. প্রত্যেকটি চিনিকলের উপজাতগুলো থেকে বিশেষ করে চিটাগুড় থেকে অ্যালকোহল, জৈব জ¦ালানি, মিথানল উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রেসমার্ড থেকে জৈব সার ও ছোবড়া থেকে গোখাদ্য প্রস্তুত করার বিষয়টি চিন্তা করা যেতে পারে।
৯. নদীবন্দর নিকটবর্তী চিনিকলগুলোতে আখের পাশাপাশি র-সুগার থেকে রিফাইন সুগার উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১০. আখচাষিদের মধ্যে সময় মতো সার, বীজ, কীটনাশক ও নগদ ঋণ প্রদান এবং আখ সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে আখের মূল্য পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
১১. চিনি আহরণ হার বৃদ্ধির জন্য প্যানম্যান, রসায়নবিদ, কৃষিবিদ এবং প্রকৌশলীদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
লেখক কৃষিবিদ ও কলামনিস্ট
