যুদ্ধাপরাধ ক্রেমলিনের ভুল নয় কৌশল

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:৩০ পিএম

২০১৪ সালে ইউক্রেনীয় শহর দোনেৎস্কের একমাত্র সমকালীন শিল্পকলা কেন্দ্র ইজোলাতসিয়া মস্কো-সমর্থিত বিদ্রোহীরা দখল করে নেয়। এটিকে একটি গোপন আটক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়। প্রায় তিন বছর এই স্থাপনাটিতে কাটানো ইউক্রেনীয় সাংবাদিক স্তানিস্লাভ আসেয়েভের স্মৃতিকথা সম্প্রতি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে। এটি পড়তে গেলে বেদনায় ভারাক্রান্ত হতে হয়। স্তানিস্লাভ আসেইয়েভ ইউক্রেনীয়দের ওপর রুশপন্থিদের চালানো নির্যাতন, ধর্ষণ এবং বিভিন্ন অবমাননাকর আচরণের বর্ণনা করেছেন। ‘তারা আমার সামনে যে কোনো স্বীকারোক্তি দিলে আমি স্বাক্ষর করতাম। একসময় আমি শুধু চেয়েছিলাম আমাকে যেন গুলি করা হয়এতই গভীর ছিল আমার হতাশা’, লিখেছেন আসেইয়েভ।

ক্রেমলিনের জন্য যুদ্ধাপরাধ কোনো ভুল নয়, বরং একটি কৌশল। এটি হাতেগোনা সোচ্চার ব্যক্তিকে পাকড়াও করে নৃশংস আচরণের মাধ্যমে একটি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয় ও তা ধরে রাখে। এটি নিষ্ক্রিয় সংখ্যাগরিষ্ঠকে নীরব থাকার বার্তা দেয়। যে কেউ সতর্কতা উচ্চারণ করলেসাধারণত অধিকার কর্মীতাদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য বা আটক করা হয়। ক্রেমলিনের পকেটস্থ যে কোনো স্থান যেমন ট্রান্সনিস্ট্রিয়া, সাউথ ওসেটিয়া বা ক্রিমিয়ার কোনো মানবাধিকার সংগঠন খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন যারা পদ্ধতিগত নিপীড়নের শিকার হয়নি। একটিও পাবেন না।

আমাদের সংগঠন সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিজ ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে ইউক্রেনের অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে পর্যবেক্ষণের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ আমাদের মনিটর এবং তাদের সঙ্গে কথোপকথনকারীদের জন্য ঝুঁকির মাত্রা ছিল খুব বেশি। আমরা সেখানে কার্যক্রম স্থগিত করার আগে আমাদের সহকর্মীরা জানিয়েছিলেন, নিজেদের ‘মুক্তিদাতা’ দাবি করা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ছিল তাদের কমান্ডার ইগর স্ট্রেলকভের মতোই চরিত্র। ১৯৯০ এর দশকে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া ও চেচনিয়ায় রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় অংশ নিয়েছিলেন স্ট্রেলকভ। তারপরও অবশ্য আমরা দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কের স্ব-ঘোষিত ‘গণপ্রজাতন্ত্রের’ অন্ধকূপে অত্যাচার, ধর্ষণ, অঙ্গহানি এবং মিথ্যা স্বীকারোক্তির শিকার লোকদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। আমরা বেআইনি আটক কেন্দ্রে গ্রেপ্তার ও নির্যাতিত বেসামরিক নাগরিকদের করুণ পরিণতির দিকেও লক্ষ রেখে চলেছি।

ইউক্রেনীয় ন্যায়পালের মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদী-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আটক আছে আনুমানিক ৩০০ রাজনৈতিক বন্দি। এই ‘ধূসর অঞ্চলে’ আটক থাকা লোকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনি ব্যবস্থার সুযোগ নেই। ইউক্রেন সরকারের বক্তব্য, এমনকি আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটিকেও দনবাস কারাগারে পচতে থাকা বন্দিদের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি।

স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্ব এখন ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সামরিক প্রস্তুতির দিকেই তাকিয়ে আছে। প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার সেনা দিয়ে দেশটিকে ঘিরে রেখেছে রাশিয়া। কিন্তু এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের একটি বিশাল অংশ এক লৌহ যবনিকার মাধ্যমে দেশের বাকিটা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিনের পোষ্য সশস্ত্র গোষ্ঠী এ অঞ্চলটি পরিচালনা করে।

ইউক্রেনের সীমান্তে এখন যা ঘটছে তার সঙ্গে ‘ভূ-রাজনীতির’ সম্পর্ক নেই। এটি হচ্ছে গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এবং একটি কর্র্তৃত্ববাদী মডেলের সম্প্রসারণ ঠেকানোর বিষয়। ঘটনাক্রমে ইউক্রেন এই যুদ্ধের অগ্রভাগে রয়েছে এবং তাদের সাহায্য প্রয়োজন। পূর্ব ইউক্রেনের দনবাসে আমরা রাশিয়ার আগ্রাসনের ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করেছি। স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিষেবার অবনতি হচ্ছে, শিশুদের স্কুলে প্রপাগাণ্ডা গেলানো হচ্ছে, বাবা-মা কারাগারে পচে মরছেন আর সাধারণ জনগণকে জর্জরিত করে তুলছে এক স্থায়ী আইনহীনতা।

‘আনুগত্য’ যা-ই হোক, মস্কো এই অঞ্চলগুলোর অধিবাসীদের কারও ভালোমন্দ নিয়েই চিন্তিত না। তার আগ্রাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বিভাজনের বীজ বোনা, ইউক্রেনীয় সরকারকে বিভ্রান্ত করা এবং এক পর্যায়ে ‘লাইনে না আসা’ পর্যন্ত তার সম্পদ শোষণ করা। কিয়েভকে ইদানীং খুব অদ্ভুত লাগে। আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপনের ভান করে যাচ্ছি। লোকজন কাজকর্ম করতে যায়। কেনাকাটা করে। সিনেমা বা জিমেও যায়। সন্ধ্যায় বাড়িতে আসার পর বিশ্রাম নিয়ে রাতের খাবারের জন্য বসে। খেতে বসে বাচ্চাদের বুঝিয়ে দেয় পরদিনই রাশিয়ার বোমাবৃষ্টি শুরু হলে কী করতে হবে। সুশীল সমাজও তৎপর হয়ে উঠেছে। সবাইকে শহর ছাড়তে হলে বা ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে কী করতে হবে সে সম্পর্কে তথ্য প্রচার শুরু করেছে তারা। ইউক্রেনীয়রা মানিয়ে নিতে পারে। তবে তাদের সাহায্যের প্রয়োজন। রাশিয়া আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ-এর উচিত হবে অবিলম্বে তাদের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। রাশিয়ার আর্থিক খাত, ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা, জ্বালানি এবং পণ্য বাণিজ্যকে লক্ষ করে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে।

ক্রেমলিন সংলাপকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত পুতিন শুধুমাত্র শক্তির ভাষাই বোঝেন। তাই ইউক্রেনের ইউরোপীয় অংশীদারদের অবশ্যই রুশ সামরিক হুমকি মোকাবিলা করার প্রস্তুতি এবং হামলার জন্য রাশিয়াকে যে মূল্য দিতে হবে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে। ক্রেমলিনের সামরিক হুমকির অন্যতম লক্ষ্য ইউক্রেন সরকারকে অস্থিতিশীল করা। এ কারণেই ইউক্রেনের অর্থনীতিকে সহায়তা দেওয়া অপরিহার্য, ইতিমধ্যেই যা রাশিয়ার আগ্রাসনের হুমকিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউক্রেনের নিজেদের সংস্কার কর্মসূচি নিয়েও সাহায্য দরকার। ২০১৪ সালের ‘ময়দান বিপ্লব’ লুটেরা প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে উৎখাত করার পর দেশটি আইনের শাসনভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক শাসনের দিকে রূপান্তর শুরু করেছিল। পুতিন এই প্রচেষ্টাকে লাইনচ্যুত করতে ইউক্রেন আক্রমণ করার পাঁয়তারা করছেন। তিনি আসলে ন্যাটোর সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নিতে পারবে এবং অভিজাতদের দায়বদ্ধ করতে পারবে এমন একটি জনগোষ্ঠী দিয়ে বেষ্টিত থাকা তার চরম না-পছন্দ। এই কারণে ইউক্রেনীয় সরকার এবং যে সংস্থাগুলো এই সংস্কার কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে তাদের পর্যাপ্ত সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনে একটি ভালোভাবে কার্যকর গণতন্ত্র পুতিনের শাসনকে হুমকির মুখে ফেলবে। কারণ ইউক্রেনের সমৃদ্ধি রুশ জনগণকে তাদের নিজেদের জন্য একই বস্তু খুঁজতে উৎসাহিত করবে। এ কারণেই গত ডিসেম্বরে রাশিয়ার মানবাধিকার সংগঠন ‘মেমোরিয়াল’ বন্ধ করে দেওয়ার সময় কীভাবে আমরা সাহায্য করতে পারিএ প্রশ্নের জবাবে তারা আমাদের বলেছিল: সফল হও।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের ভাগ্য দৃশ্যত একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে তাদের গতিপথ ভিন্ন। বিশ্বের উচিত হবে না রাশিয়ার গণতন্ত্রীকরণের জন্য অপেক্ষায় থেকে ইউক্রেনকে ত্যাগ করা। ইউক্রেন ইতিমধ্যেই সঠিক পথে রয়েছে। একটি সফল ও সমৃদ্ধ গণতন্ত্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় আমাদের এখন প্রয়োজন সবার সহায়তা। 

আল জাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

লেখক ইউক্রেনের মানবাধিকার সংগঠন সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিজ-এর চেয়ারপারসন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত