দেশের বয়স্ক নাগরিকদের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ব্যবস্থাটি চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিকরা এ সুবিধা পাবেন। এতে করে দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষ সরকারের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য পর্যালোচনা করে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ, যা ২০২১ সালে ১৬ কোটি ৯১ লাখে উন্নীত হবে বলে সে সময় প্রাক্কলন করা হয়।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ হচ্ছে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। এ হিসেবে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী জনসংখ্যা ৮ কোটি ৭৩ লাখের কিছু কমবেশি হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণের মানুষ সর্বজনীন পেনশন সুবিধার আওতায় আসবে, যা বাস্তবায়ন করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী এক বছরের মধ্যে পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হলেও পরবর্তী ১০ বছর পর সরকার পেনশন সুবিধা দেবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফি ডিভিডেন্ড) ভোগ করলেও আগামী তিন দশকে এ চিত্রে দ্রুত পরিবর্তন আসবে। কর্মক্ষম মানুষ বেশি থাকলে সেটাকে জনমিতিক সুবিধা হিসেবে ধরা হয়।
সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০৪৭ সালে বাংলাদেশ একটি বৃদ্ধ সমাজে রূপ নেবে। একটি সমাজে জনগোষ্ঠীর ১৪ শতাংশের বয়স যদি ৬৫ বা তার বেশি হয়, তাহলে সেই সমাজকে ‘বৃদ্ধ’ সমাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২০ সালে দেশের ৬০ ও এর বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ২০২৯ সালে ‘বয়স্ক সমাজ’ হওয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাবে। ‘বয়স্ক’ পর্যায় থেকে একটি জনগোষ্ঠীর ‘বৃদ্ধ’ পর্যায়ে রূপান্তরিত হতে মাত্র ১৮ বছর সময় লাগে। সে হিসেবে বাংলাদেশ ২০৪৭ সালে ‘বৃদ্ধ সমাজে’ রূপ নেবে। এই ১৮ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ যে গতিতে ‘বয়স্ক’ পর্যায় থেকে ‘বার্ধক্য’ পর্যায়ে পরিবর্তিত হবে, তা এশীয় উন্নত দেশ ও সমৃদ্ধ ইউরোপীয় দেশগুলোর গতির তুলনায় দ্রুত।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০৪০ সালে প্রতি ছয়জন কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে একজন প্রবীণ নির্ভরশীল ব্যক্তি থাকবে। আর ২০৬৫ সালে এ অনুপাত দাঁড়াবে, প্রতি তিনজনে একজন। এর ফলে ২০৪০ সালের পর দেশের সরকারকে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পেনশন সুবিধা বাবদ বিপুল পরিমাণের অর্থ ব্যয় করতে হবে।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে ৬০ ও এর বেশি বয়সী জনসংখ্যা হচ্ছে ১ কোটি ৪০ লাখ। এটি ২০৫০ সালে সাড়ে ৪ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষ সর্বজনীন পেনশন সুবিধার আওতায় এলেও সবাই পেনশনের মাসিক কিস্তি দিতে সমর্থ হবেন না। অবশ্য এই পেনশন স্কিমে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও নিম্ন আয়ের মানুষদের কিস্তি প্রদানে সরকার সহায়তা করতে পারে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সর্বজনীন পেনশন সুবিধার বাইরে থাকবেন। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু হলে এখানেও পরিবর্তন আনা হবে বলে জানা গেছে।
শ্রম অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি খাতে শ্রমশক্তি রয়েছে ৫ কোটি ৮৫ লাখ। এর বাইরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ২২ লাখ ৮৯ হাজার। বেসরকারি খাতের শ্রমশক্তির বড় অংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের, যাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই। কোনো পেনশন ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে বেসরকারি খাতে কর্মরত সবাই যদি গড়ে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের কিস্তি দেন, তাহলে প্রতি মাসে ৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা সরকারের পেনশন তহবিলে জমা হবে। ১০ বছরে ওই তহবিলে চাঁদা জমার পরিমাণ দাঁড়াবে ৭ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা প্রদান সাপেক্ষে কোনো ব্যক্তি মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।
২০২১ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের নেওয়া পুঞ্জীভূত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া নিট ঋণ ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা।
সেই হিসেবে পেনশন স্কিমে কাক্সিক্ষত হারে চাঁদা জমা হলে এবং প্রথম ১০ বছরে কোনো পেনশন না দিলে ওই ৭ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব। এই ঋণের বিপরীতে সরকারকে যে সুদব্যয় করতে হয় তা সাশ্রয় করাও সম্ভব।
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য বাজেটের বেশির ভাগ অর্থাৎ ৬৮ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধে। এ সুদব্যয় অনুন্নয়ন বাজেটের একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ, ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।
এই তহবিলে জমা হওয়া অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারের লাভজনক অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা হবে। এতে ১০ শতাংশ হারে পেনশন তহবিলে সুদ পরিশোধ করবে সরকার। এটি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক থেকে কারিগরি সহায়তা নেওয়া হবে। পেনশনভোগীদের স্মার্টকার্ড দেওয়া হবে এবং ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হতে পারে।
সরকারের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নরওয়ে, সুইডেনের মতো ভালো দেশগুলোতে অনেক আগে থেকেই এ ধরনের পেনশন স্কিম রয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কারণ আমাদের দেশের বেসরকারি খাতের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা তেমন কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ‘এই পেনশন স্কিমটার নিয়মকানুনগুলো খুবই সরল এবং সবার জন্য পালনীয় করে তৈরি করতে হবে। তা ছাড়া আমাদের দেশে বেসরকারি খাতের চাকরিতে অনেক অস্থিতিশীলতা রয়েছে। অনেকেই হয়তো মাঝপথে চাকরিহারা হয়ে যেতে পারেন, সময়মতো চাঁদা পরিশোধ করতে পারবেন না। কিন্তু তারপরও যেন এককালীন চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে স্কিমটি সচল করা যায় সে বিষয়ে সরকারকে অনেক নমনীয়ভাবে নীতিকাঠামো তৈরি করতে হবে।’
সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘দেশের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি-দুটি পলিসি পরিশোধের ব্যর্থতার কারণে অনেকের পলিসি বাতিল করে দেওয়া হয়। সময়মতো টাকা পাওয়া যায় না। এ ধরনের চর্চা যেন পেনশন স্কিমে না দেখা যায়।’
বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘সরকারি কর্মীদের পেনশন তোলার ক্ষেত্রে যে ধরনের হয়রানি দেখা যায়, তেমনটাও যাতে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে না ঘটে সেজন্য আগে থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তহবিল ব্যবস্থাপনায় দক্ষ এমন একটি গোষ্ঠীকে দিয়ে এই স্কিম পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে। কারা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য তা নির্বাচনেও যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।’
গত বুধবার ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রকে ভিত্তি ধরে দেশের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব নাগরিকের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করবে সরকার। প্রবাসীরাও এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। নিবন্ধিতরা ৬০ বছরের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পেনশন ভোগ করতে পারবেন। এজন্য আলাদা একটি কর্র্তৃপক্ষ গঠন করা হবে, যার সব কাঠামোগত ও সুবিধা সরকার বহন করবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এ সুবিধা নিতে পারবে। তাদের সরকার আরও বেশি সহযোগিতা করবে।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার একটি অনুমানভিত্তিক হিসাব দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যক্তি মাসিক চাঁদা ১ হাজার টাকা দিলে মুনাফা যদি ১০ শতাংশ ও আনুতোষিক ৮ শতাংশ ধরা হয়, তাহলে ১৮ বছর বয়সে যদি কেউ চাঁদা দেওয়া শুরু করে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত তা চালু রাখেন, তাহলে ওই ব্যক্তি অবসরের পর ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে ৬৪ হাজার ৭৭৬ টাকা পেনশন পাবেন। যদি ৩০ বছর বয়সে চাঁদা দেওয়া শুরু করে ৬০ বছর পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখেন, তাহলে অবসরের পর প্রতি মাসে তিনি ১৮ হাজার ৯০৮ টাকা পেনশন পাবেন। তবে চাঁদার পরিমাণ কম-বেশি হলে আনুপাতিক হারে পেনশনের পরিমাণও কম-বেশি হবে।
মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আমাদের বর্তমান গড় আয়ু ৭৩ বছর, যা ২০৫০ সালে ৮০ ও ২০৭৫ সালে ৮৫ বছর হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, আগামী তিন দশকে একজন কর্মজীবী ব্যক্তির অবসর গ্রহণের পরও গড়ে ২০ বছর আয়ু থাকবে।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতে পেনশন স্কিমটি খুব ভালোভাবেই বাস্তবায়ন যোগ্য। তবে এ জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকে। আইন প্রণয়ন ও কর্র্তৃপক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মতামত গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়ার দরকার আছে।’
পেনশন স্কিমের চাঁদা পরিশোধের যে বিষয়টি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন তার সঙ্গে একমত পোষণ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এই স্কিমে যে যেমন চাঁদা দেবে সে সেই হারে পেনশন পাবে। সে ক্ষেত্রে যার যেমন সামর্থ্য সে তেমন হারে চাঁদা দিয়ে পেনশনের আওতায় আসতে পারবে।’
জানা গেছে, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি পৃথক পেনশন হিসাব থাকবে। ফলে চাকরি পরিবর্তন করলেও পেনশন হিসাব অপরিবর্তিত থাকবে। এ পেনশন পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে কর্মী বা প্রতিষ্ঠানের চাঁদা জাতীয় পেনশন কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক নির্ধারিত হবে। মাসিক সর্বনিম্ন চাঁদার হার নির্ধারিত থাকবে। প্রবাসী কর্মীদের সুবিধার্থে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চাঁদা জমা দিতে পারবে। সুবিধাভোগী বছরে ন্যূনতম বার্ষিক জমা নিশ্চিত করবে। অন্যথায় তার হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত হবে এবং পরে বিলম্ব ফি দেওয়ার মাধ্যমে হিসাব সচল করা হবে।
নিবন্ধিত চাঁদা জমাকারী পেনশনে থাকাকালীন ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে মৃত্যুবরণ করলে জমাকারীর নমিনি অবশিষ্ট সময়কালের (মূল জমাকারীর বয়স ৭৫ বছর পর্যন্ত) জন্য মাসিক পেনশন প্রাপ্য হবেন। কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দেওয়া আগে নিবন্ধিত চাঁদা প্রদানকারী মৃত্যুবরণ করলে জমাকৃত অর্থ মুনাফাসহ তার নমিনিকে ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হতে পারে।
