জনস্বাস্থ্য, গবাদিপশু, উদ্ভিদ ও কৃষির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সিসা তৈরির কারখানা এখন দেশের জনপদগুলোর জন্য এক নতুন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতিহীন অবৈধ বিপুলসংখ্যক কারখানা গড়ে ওঠার খবর পাওয়া গেছে। ভয়াবহ বিষয় হলো এই কারখানার বেশির ভাগই গড়ে উঠেছে প্রত্যন্ত জনপদগুলোর লোকবসতি ও কৃষিজমিতে। ফলে পুরনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির এসব অবৈধ কারখানার মারাত্মক দূষণের কবলে পড়েছে সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা, যেমন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তেমনি অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে হাঁস, মুরগি, গরু ও ছাগল। আরেকদিকে পুড়ে যাচ্ছে নানা ধরনের গাছ ও লতাগুল্ম। কারখানার কাছাকাছি এলাকার ফসলের জমি হয়ে পড়ছে উর্বরাশক্তিহীন। বিভিন্ন জেলা-উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘আ.লীগ নেতার অবৈধ সিসা তৈরির কারখানা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে এমনই একটি সিসা তৈরির অবৈধ কারখানার দূষণের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই চার মাস আগে উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের নানিয়াটিকর গ্রামে কারখানাটি স্থাপন করেছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য আবদুল মালেক। সেখানে রাতের আঁধারে পোড়ানো ব্যাটারি থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থের বিষক্রিয়া বাতাসের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতিতে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় মানুষজনসহ গাছপালা ও পশুপাখি। গত দুই মাসে ওই গ্রামের ১৬টি গরু মারা গেছে এবং আরও কয়েকটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মালেকের হুমকির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী। চিরিরবন্দর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সারফরাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন, ব্যাটারি পোড়ানোর কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণেই গরুগুলোর মৃত্যু হয়েছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে দ্রুত ওই কারখানা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে স্থানীয় বাসিন্দারাও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়বেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দিনাজপুর সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে আত্রাই নদীর পাশে নানিয়াটিকর গ্রামে আম ও লিচুবাগানের ভেতর সিসা তৈরির কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে। কারখানাটির আশপাশের বহু আম, লিচু ও কাঁঠালগাছে পোড়া চিহ্ন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে কার্যক্রম শুরু হয়ে ভোররাত পর্যন্ত চলে কারখানার কার্যক্রম। সেখানে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরি করা হয়। এরপর সেই সিসা ট্রাকযোগে ঢাকার বিভিন্ন কারখানায় পাঠানো হয়। সম্প্রতি এ বিষয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আয়েশা সিদ্দিকা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, কারখানা পরিচালনাকারীরা খুব খারাপ কাজ করছেন, বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে কারখানাটি বন্ধ করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এদিকে, দিনাজপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এ কে এম ছামিউল আলম কুরশি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তাদের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই কারখানাটি বন্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। যদি তারা কারখানা বন্ধ না করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রশ্ন হলো, কারখানাটি সরিয়ে কোথায় নেওয়া হবে? এ ধরনের দূষণ ছড়ানো কারখানা স্থাপনের কারণে বড় অঙ্কের জরিমানাসহ পরিবেশ আইন অনুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না কেন?
খেয়াল করা দরকার, বিগত বছরগুলোতে সারা দেশে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বানানোর এমন বহু কারখানার দূষণের খবর নিয়ে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে দেশ রূপান্তরসহ শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে। এর মধ্যে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর বাসুদেবপুরে, নওগাঁর পতœীতলায়, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ত্রিমোহনে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এবং গফরগাঁওয়ের লংগাইর ইউনিয়নের পশ্চিম গোলাবাড়ীতে সিসা কারখানার দূষণে জনপদের বাসিন্দা, গবাদিপশুসহ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতির কথা নানা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শুধু যে জেলা-উপজেলার জনপদগুলোতেই সিসা তৈরি কারখানা হচ্ছে তা নয়। রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে আশুলিয়ার দুর্গাপুর ও শ্রীখণ্ডিয়ায়, ধামরাইয়ের কুল্লা ইউনিয়নের খাতরা এলাকায় এমন কারখানার দূষণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। তবুও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ মনোযোগ না দেওয়া সত্যিই দুঃখজনক। মনে রাখা দরকার, জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ব্যাটারির বর্জ্য পুড়িয়ে সিসা তৈরির দূষণে মানুষের রক্তকণিকা ও মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে মানসিক বিকৃতি, রক্তশূন্যতা ও মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভের শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, যে মাটিতে সিসা মিশবে সেখানে কোনো ফসল হবে না। এই পরিস্থিতিতে লোকালয় ও কৃষিজমির ধারে-কাছে সিসা তৈরির কারখানা বন্ধ করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
