তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি এমন কোনো ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশ্বব্যাপীই চলছে প্রযুক্তির বিপ্লব। স্কুলশিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষক পর্যন্ত সবার জীবন বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। দৃশ্যমান হচ্ছে সব স্তরে প্রযুক্তির ব্যবহার। আরও পরিপূর্ণ সফলতা পেতে হলে মাতৃভাষাকেও তথ্যপ্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্বে ইংরেজি ভাষা জানা মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু ইংরেজিকে প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ফলে এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। শুধু ভাষাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নয়, প্রযুক্তির মাধ্যমে মাতৃভাষায় যোগাযোগ মানুষের কাছে সহজ ও বোধগম্য হয় এবং তা সমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
এভাবেই মাতৃভাষার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে, সমৃদ্ধ হয় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপকতা। ভাষা গবেষকদের মতে বিশ্বে প্রায় ৭০০০ ভাষার প্রচলন থাকলেও প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে কোনো না কোনো ভাষা। এই মুহূর্তে বিশ্বের ৪৭৩টি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় আছে। ইংরেজি ভাষার তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব হওয়াকে অন্য অনেক ভাষার সংকটের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞরা। অবশ্য বিষয়টি সংকট নাকি সম্ভাবনা তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। ফরাসি ভাষাবিদ ক্লাউড হেজেজ বলেছেন, ‘ইংরেজি ভাষা যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তাতে আমরা যদি সতর্ক না হই এক সময় তা অধিকাংশ ভাষার মৃত্যু ঘটাবে।’
প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা কাজ করে যাচ্ছেন বিরামহীনভাবে। হরেক রকমের বাংলা অ্যাপস তৈরি করছে প্রতিনিয়ত। বেসিসের তথ্য মতে শুধু অ্যাপস নিয়ে কাজ করেছে প্রায় শ’খানেক আইটি প্রতিষ্ঠান। উল্লেখযোগ্য অ্যাপসের মধ্যে আছে ‘একুশ আমার’, ‘ই-তথ্য কোষ’, ‘বাংলা ব্লগস’, ‘বাংলা এসএমএস’, ‘বাংলা অভিধান’, ‘বাংলাদেশের সংবিধান’, বর্ণ শিক্ষার ‘হাতেখড়ি’, ‘জি-শ্লেট বাংলা’ ইত্যাদি। রয়েছে ধর্ম, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, বিনোদন, খবর ইত্যাদি বিষয়ে হাজার খানেক বাংলা অ্যাপস। বাংলা বানান ও ব্যাকরণ সঠিকভাবে লেখার জন্য তৈরি হয়েছে অ্যাপস ‘সঠিক’। এছাড়াও পাবলিক সেন্টিমেন্ট বিশ্লেষণের ‘জনমত’, বাংলা ওসিআর ‘বর্ণ’, বাংলা ফন্টের ইন্টার অপারেবিলিটি ইঞ্জিন, বাংলা মেশিন ট্রান্সলেটর উন্নয়ন, স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যারসহ আরও বেশ কয়েকটি জনগুরুত্ব সম্পন্ন সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে সফলভাবে। আরও আছে ‘পুঁথি’ এবং বাংলা ‘ওসিআর’ সফটওয়্যার।
ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ প্রসেসিং এবং মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে রোবটের বোধগম্য করার প্রক্রিয়া অনেকটা সফল হয়েছে। রোবটটি বাংলা শব্দ ডানে যান, বামে যান, থামুন, এবার চলুন এসব আদেশ কেবল বুঝতেই পারে তা নয়, হুকুম তামিল করতেও খুব একটা সময় নেয় না। আবার যারা বাকপ্রতিবন্ধী বা কথা বলতে অক্ষম তাদের জন্যও রোবটটিতে যোগ করা হয়েছে বিশেষ সংবেদনশীল ব্যবস্থা। এদিকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ডিজিটাল টকিং বুক বা ডেইজি’ নামের প্রযুক্তিনির্ভর ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যবই এবং ‘প্রযুক্তিতে দেখব দেশ’ ব্রেইল মুদ্রাক্ষরে লিখিত সফটওয়্যার বের করেছে ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন। গুগল প্লে স্টোরে ‘বাংলা অ্যাপস’ লিখে সার্চ করলেই মিলবে মায়ের ভাষার এসব নানা কাজের অ্যাপস, যেখানে আছে ১০ লাখেরও বেশি বাংলা শব্দ।
বর্তমানে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অনেক শাখাকেই নতুনভাবে পুনর্গঠন করছে। আর সেটি হচ্ছে প্রযুক্তির মাধ্যমে মেশিনকে শিখিয়ে (মেশিন লার্নিং) মানুষের পরিবর্তে মেশিনের মাধ্যমে কাজ করা। ‘ইমোশনাল ইঞ্জিন’ মানুষের মতোই আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, মানুষের মনের ভাব বুঝতে পারে, কণ্ঠস্বরও মানুষের মতোই এবং জাপানি ভাষায় সবকিছু প্রক্রিয়া করতে পারে এমন ক্ষমতাসম্পন্ন রোবট ‘পিপার’ আবিষ্কার করেছে জাপান। এভাবে ভাষাকে মেশিনের মাধ্যমে প্রসেস করে সফল হয়েছে অনেক দেশ। গবেষণায় প্রতীয়মান যে, যে ভাষাকে মেশিনের মাধ্যমে যত বেশি আয়ত্ত করা গেছে সেই ভাষা ততটাই বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। টাইপ না করে দূর থেকে কথা বলে যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা, রাস্তাঘাটের ব্যানার-সাইনবোর্ডের লেখা না পড়েই ডিজিটালে রূপান্তর করা ইত্যাদি মেশিন লার্নিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারই উদাহরণ। এভাবে মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে ইংরেজি, চায়নিজ, জার্মান, ফার্সি, আরবি, ফ্রেঞ্চ এবং স্প্যানিশ ভাষায় আজকাল সব কিছুই করা যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে। স্বাভাবিকভাবেই এসব ভাষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, ফলে ভাষার বিস্তার ঘটছে দুনিয়াব্যাপী।
বাংলাভাষাও পিছিয়ে নেই এই প্রতিযোগিতায়। ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্য হওয়ায় ২০১৩ সাল থেকে যান্ত্রিক ভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে আমাদের বাংলা বর্ণমালা। এর ফলে গুগল, টুইটার ইত্যাদি সার্চ ইঞ্জিনে যুক্ত হয়েছে বাংলা ভাষা। এখন অ্যান্ড্রয়েড থেকে শুরু করে উইন্ডোজ, আইওএস, ফায়ারফক্স ইত্যাদিতে বাংলা লেখা যায় অনায়াসে। ইউনিকোড এবং ইন্টারনেটের সুবাদে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ডেক্সটপ-সহ অধিকাংশ ডিভাইসে এসেছে বাংলা ভাষার ছোঁয়া। দেশের তরুণ প্রযুক্তিপ্রেমীদের প্রচেষ্টায় ইউনিকোডে তৈরি ‘অভ্র’র পাশাপাশি, সোলায়মান লিপি, শাপলা, দোয়েল, নিকষ এমনকি ইউনিবিজয় দিয়েও ইচ্ছামতো বাংলায় ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধান করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ‘বাংলা ফন্ট কনভার্টার’ দিয়ে যে কোনো ফন্টের লেখা সুবিধা মতো পরিবর্তন করা যায়। দেশে আমদানি করা প্রায় সব স্মার্টফোনেই ‘বাংলা’ বিল্টইন করা হয়েছে। সফটওয়্যার ছাড়াই ফেইসবুক ও লিংকডইনে বাংলা লেখার সুযোগ করে দিয়েছে ‘বাংলা ভাই’ অ্যাপস। বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ‘চা স্ক্রিপ্ট’ এবং কালজয়ী সব ক্লাসিক বই সংবলিত ‘বইপোকা’ অ্যাপটির মাধ্যমে সব স্মার্ট ডিভাইসে বাংলা বই পড়া যায়।
এদিকে ভাষার মাসে (২০২২) ডিজিটাল আর্কাইভ ‘বই চিত্র’ বাংলাভাষায় রচিত প্রথম অ্যাপ উন্মোচিত হয়েছে এবারের বইমেলায়। ডিজিটাল লাইব্রেরি ফরম্যাটে তৈরি অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস প্ল্যাটফর্মের এ অ্যাপটিতে টেক্সটের পাশাপাশি আছে অডিও বুক। থাকছে বাংলা চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল আর্কাইভও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ‘ছোট্ট রাসেল সোনা’ এবং ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখা ‘আমার বন্ধু রাশেদ’-এর অডিও বুকসহ অর্ধশত অডিও বইয়ের ভাণ্ডার নিয়ে যাত্রা শুরু করল অ্যাপটি। আইসিটি বিভাগের বাংলাভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে অপটিক্যাল ক্যারেকটার রিকগনাইজার (ওসিআর), টেক্সট টু স্পিসসহ ১৫টি টোল তৈরি করা হচ্ছে। সারা দেশে ৭১টি লাইব্রেরিকে ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে। একটি ন্যাশনাল ডিজিটাল লাইব্রেরি করা হচ্ছে যেখানে মানুষ লাখ লাখ বই স্ব-স্ব গ্রামে বসে সাবসক্রাইব করতে পারবেন। ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে মোবাইল ফোনে বাংলায় ‘ক্ষুদেবার্তা’ বা ‘এসএমএস’ চালু এবং সব ব্র্যান্ডের মোবাইল হ্যান্ডসেটে পূর্ণাঙ্গ বাংলা কিপ্যাড সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য দেশের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের অফিসের সেবা মানুষের কাছে সহজে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাংলায় ২৫ হাজার ওয়েবপোর্টাল সক্রিয় আছে।
এইভাবে অনলাইনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে। দেশের প্রায় ১২ কোটি মোবাইল ফোন, সাড়ে চার কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখন বাংলা ব্যবহার করতে পারছেন। আর বিশ্বের প্রায় ৩৫ কোটি লোক বর্তমানে বাংলায় কথা বলে। আরও কিছু সময় উপযোগী টুলস যেমন স্বয়ংক্রিয় চ্যাট অপশন, অনুবাদক, কথা থেকে লেখা, লেখা থেকে কথা, ওসিআর (স্বয়ংক্রিয় পাঠক) ইত্যাদি সংযুক্ত করার পাশাপাশি মাতৃভাষায় ভালো কনটেন্ট ও মোবাইল অ্যাপস তৈরি করা হলে তা শুধু মানুষকে জ্ঞানার্জন, তথ্য ও সেবা পাওয়া নিশ্চিত করবে না, মাতৃভাষাকেও বাঙালির মাঝে চিরঞ্জীব করতে সহায়তা করবে।
এ জন্য সরকার, গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও ভাষাবিদদের একযোগে কাজ করার এখনই সময়। আমাদের আধুনিক সমাজ ইদানীং বিদেশি ভাষার সংস্কৃতি, বিনোদন এবং সেসব ভাষা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এই স্রোত থেকে বের হয়ে আসতে হলে ভাষাকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি বোঝার উপযোগী করতে হবে। বাঙালি পরিশ্রমী ও হার না-মানা জাতি, বীরের জাতি। এসব পরিশ্রমী ও হার না-মানা অসংখ্য বীরের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভাষা যদি বিশ্বের ৬ষ্ঠ বৃহত্তম আসনের মর্যাদায় আসীন। তথ্যপ্রযুক্তির বিশে্ব এই বাংলা ভাষাকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে অগণিত প্রযুক্তিপ্রেমী বাঙালির ঐকান্তিক চেষ্টা প্রয়োজন হবে। বিশেষ উদ্যোগ লাগবে সরকারেরও। তবেই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বিশ্ববাসীর অন্যতম শক্তিশালী ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
