মৃত্যুদন্ডের আসামি ২১ বছর পর গ্রেপ্তার

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২২, ০৩:০৭ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা মেরে হত্যাচেষ্টা মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ হওয়া পলাতক এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তার নাম মো. আজিজুল হক রানা ওরফে শাহনেওয়াজ ওরফে রুমান।

২১ বছর ধরে পলাতক থাকার পর গত মঙ্গলবার রাজধানীর খিলক্ষেত থানা এলাকা থেকে আজিজুল হককে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিটিটিসির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং টিম) মো. তৌহিদুল ইসলাম। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছে থাকা জিহাদি বই, মোবাইল ফোন, পেনড্রাইভ ও কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক জব্দ করা হয়। আজিজুল নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গিগোষ্ঠী হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) সঙ্গে সম্পৃক্ত।

২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে বোমা পুঁতে রাখা হয়। এর মধ্যে ৪০ কেজি ওজনের একটি বোমা শেখ লুৎফর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজ মাঠ সভামঞ্চের পাশে মাটির নিচে এবং ৭৬ কেজি ওজনের আরেকটি হেলিপ্যাডের পাশে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়।

অন্য মামলায় ফাঁসি হওয়া হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানের সঙ্গে আজিজুলও বোমা পুঁতে রাখার দায়িত্বে ছিল। সমাবেশের আগেই বোমা দুটি উদ্ধারের পর আজিজুল হক কোটালীপাড়া থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসে। এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানায় প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা, হত্যার ষড়যন্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে একটি মামলায় ১৪ জনকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দিয়েছিল আদালত। এ মামলার পলাতক আসামিদের একজন এই আজিজুল হক রানা।

ওই মামলায় এখনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি পলাতক। তারা হলো লোকমান, ইউসুফ, এনামুল ও মোসাহেদ।

পুলিশের দাবি, ২১ বছর বিভিন্ন ছদ্মপেশার আড়ালে নিজেকে আত্মগোপন রাখার চেষ্টা করেছে আজিজুল হক। কখনো টেইলারিং, মুদি দোকানদার, বই বিক্রেতা, আবার কখনো ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেছে। গ্রেপ্তারের আগে আত্মগোপনে থেকেই গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তার আজিজুল ১৯৮৭ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে জামিয়া আনোয়ারিয়া মাদ্রাসায় নূরানী বিভাগে ভর্তি হয়। ওই মাদ্রাসার ওস্তাদ ও হরকাতুল জিহাদের সক্রিয় সদস্য মুফতি হান্নানের অনুসারী মাওলানা আমিরুল ইসলামের সংস্পর্শে আসে। আমিরুল ইসলাম তাকে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। ওই মাদ্রাসায় মুফতি হান্নান, আবদুর রউফ, আবদুস সালামসহ হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ জঙ্গিদের যাতায়াত ছিল এবং সেখানে জঙ্গিগোষ্ঠীটির গোপন বৈঠক হতো।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসি প্রধান বলেন, আজিজুল হক সংগঠনে যোগদানের পর অন্য ছাত্রসহ প্রশিক্ষণ ও তালিম নেওয়ার জন্য হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি ইজহারের চট্টগ্রামের লালখান মাদ্রাসায় যায় এবং তালিম নেয়। তালিম শেষে সেখানে সে বোমা তৈরি, আত্মরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়। মুফতি হান্নান সংগঠনের অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য সাহসী জিহাদি বিশ্বস্ত কয়েকজন লোক সংগ্রহ করার জন্য আমিরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন। আজিজুলকে নির্বাচন করে আমিরুল ইসলাম তাকে একটি চিঠি লিখে দিয়ে গোপালগঞ্জ বিসিক এলাকায় সোনার বাংলা সাবান ও মোমবাতি তৈরির কারখানায় পাঠান। মুফতি হান্নানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আজিজুল তাকে আমিরুল ইসলামের দেওয়া চিঠিটি দেয়। মুফতি হান্নান তাকে সংগঠনের নিয়মকানুন সম্পর্কে বুঝিয়ে দেয় এবং আজিজুল হকের নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম ‘শাহনেওয়াজ’ রাখে।

সিটিটিসি প্রধান আরও বলেন, আজিজুল হক নতুন নাম শাহনেওয়াজ পরিচয়ে আনুমানিক ১৫ দিন মোমবাতি প্যাকিংয়ের কাজ করে। পরে বিশ্বস্ততা অর্জন করলে কারখানার পেছনে একটি কক্ষে গোপন বৈঠকে উপস্থিত থাকার অনুমতি পায়। কারখানায় মোমবাতি ও সাবান তৈরির আড়ালে বোমা তৈরির কাজ করত। বোমা তৈরির কাজে আজিজুল হকসহ মো. ইউসুফ ওরফে মোসহাব, মেহেদী হাসান ওরফে আ. ওয়াদুদ, ওয়াসিম আক্তার ওরফে তারেক হোসেন, মো. মহিবুল ওরফে মফিজুর রহমান, শেখ মো. এনামুল হক, আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস প্রমুখ জড়িত ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত