বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিবিমুখ আধুনিক শিক্ষার বিপরীতে কোনো কোনো সাধক সমগ্র জীবন দিয়েছেন ঐতিহ্য প্রেমে এবং তার বহু বিচিত্র বিষয়ের অন্বেষণ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণাকর্মে। তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি গবেষণা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণে নিবেদিতপ্রাণ ফোকলোর সাধক মোহাম্মদ সাইদুর ছিলেন অন্যতম। তার ফোকলোর সাধনা লোকায়ত সাধক কবি, শিল্পী, পালাকার, পুঁথিকার, বাদ্যযন্ত্রী, নকশী কাঁথাকার, মাটির পুতুল স্রষ্টা, কাঠের পুতুল কারিগর, শিকা শিল্পী, শোলা শিল্পী, কাগজ কাটা শিল্পীদের স্থানীয় ও জাতীয় মর্যাদার পথকে সুগম করেছিল, এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের লোকায়ত শিল্পের ভান্ডরকে পরিচিত করে তুলেছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রধানতম ভাষ্যকার, প্রচারক, সংরক্ষক, সংগঠক।
জনসংস্কৃতি সমীক্ষণধর্মী তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত জামদানী আজও একটি আকর গ্রন্থ হয়ে আছে। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো ঐতিহ্যবাহী জামদানীর বুনন শিল্পকে মানবসৃষ্ট পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে মোহাম্মদ সাইদুর প্রণীত জামদানী গ্রন্থটি। উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর নমিনেশন ফাইলে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জামদানী গ্রন্থটির কথা উল্লিখিত হয়েছে। বাংলা একাডেমির ফোকলোর সংগ্রহের ইতিহাসে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি পেশাগতভাবে বাংলা একাডেমির ফোকলোর সংগ্রহ করেন। নিজের সংগৃহীত ফোকলোর উপাদানকে তিনি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত লোকসাহিত্য/ফোকলোর সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করে গবেষক হিসেবে নিজের মননশীলতা ও উচ্চতার পরিচয় দিয়েছেন। তার সম্পাদিত বেড়াভাসান, মুহররম অনুষ্ঠান, পালাগান, লোকনাট্য, আনুষ্ঠানিক লোকগীতি বিষয়ক লোকসাহিত্য ও ফোকলোর সংকলন অসামান্য গবেষণাকর্ম হিসেবে উল্লেখ করা যায়। পরবর্তী কালের অধিকাংশ ফোকলোর গবেষক মোহাম্মদ সাইদুরকৃত জনসংস্কৃতিধর্মী গ্রন্থের আশ্রয় নিয়ে গবেষণা সম্পাদন করেছেন।
এই কীর্তিমান ফোকলোর সংগ্রাহক, গবেষক ও তাত্ত্বিক মোহাম্মদ সাইদুর ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ২৮ জানুয়ারি তারিখে কিশোরগঞ্জ জেলার বিন্নগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিকভাবে তিনি বাল্যকালেই পেয়েছিলেন ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রেরণা। তার পিতামহ ও পিতা দুজনেই ছিলেন ঐতিহ্যগতভাবে লোকায়ত গানের শিল্পী, রচয়িতা ও পুঁথি পাঠক। সেই সংস্কৃতিবোধ থেকে তিনি লোকায়ত জীবনের বিচিত্র সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ লোকগান, কিস্সা, লোকশিল্প, উৎসব-পার্বণ প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ ও সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আহূত কাগমারী সম্মেলনে তিনি কিশোরগঞ্জ থেকে জারিগানের দল নিয়ে যোগদান করেন। পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে লোকায়ত শিল্পকর্ম নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের লোকায়ত সংস্কৃতির জীবন্ত এক ভান্ডারি।
তিনি আজ থেকে ঠিক পনের বছর আগে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ তিরোধান করেন। কিন্তু বিস্মৃত হননি মোটেও। বরং তিনি তার জীবন-সাধনা ও কর্মের গুণে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন।
মোহাম্মদ সাইদুরের একক সংগ্রহে নিয়ে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমিতে একটি লোকশিল্প সংগ্রহের প্রদর্শনী হয় এবং এক সময় তার সংগৃহীত লোকশিল্পের ওপর ভিত্তি করেই বাংলা একাডেমিতে গড়ে উঠেছিল লোকঐতিহ্য জাদুঘর। শুধু তাই নয়, তিনি কিশোরগঞ্জের বিন্নগাঁওয়ে নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন একটি লোকশিল্প জাদুঘর, যা তিনি আমেরিকার বিখ্যাত লোকশিল্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেনরি গ্লাসিকে দিয়ে উদ্বোধন করিয়েছিলেন।
২০০৭ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ সাইদুরের মৃত্যুর পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তার কিশোরগঞ্জের বাড়িতে তার নামে একটি লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে, অদ্যাবধি সেই মোহাম্মদ সাইদুর লোকশিল্প জাদুঘরের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রত্যক্ষ করা যায়নি। কথা ছিল মোহাম্মদ সাইদুরের নামে প্রতিষ্ঠিত লোকশিল্প জাদুঘরে তার সংগৃহীত দুর্লভ সব লোকায়ত শিল্পকর্ম স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হবে, দেশি-বিদেশি গবেষকরা সেখানে গিয়ে বাংলাদেশের লোকশিল্প বিষয়ক গবেষণার অফুরন্ত সুযোগ পাবেন।
কিন্তু অদ্যাবধি মোহাম্মদ সাইদুর লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে তার সংগৃহীত দুর্লভ শিল্পভান্ডার নকশিকাঁথা, মাটির পুতুল, কাঠের শিল্পসামগ্রী, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে রচিত ও প্রকাশিত পুঁথিকাব্য প্রভৃতি। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় এসব অমূল্য সম্পদ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষকদের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্য মোহাম্মদ সাইদুর লোকশিল্প জাদুঘরের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো জরুরিভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, মোহাম্মদ সাইদুরের লোকশিল্প প্রেম ও সংগ্রহের গুণগ্রাহী ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী ও লোকশিল্প সংগ্রাহক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান প্রমুখ। তিনি ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘নকশিকাঁথা প্রদর্শনী’ করেন। এছাড়া, ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল আর্ট গ্যালারিতে ওপেন এয়ার প্রদর্শনীতে মোহাম্মদ সাইদুর সংগৃহীত লোকশিল্পের প্রদর্শনী হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে মোহাম্মদ সাইদুর তার ফোকলোর সংগ্রহ ও গবেষণার স্বীকৃত স্বরূপ বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ অর্জন করেন।
চন্দ্রকুমার দে-র পরম্পরা ধরে মোহাম্মদ সাইদুর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের গ্রামাঞ্চল থেকে ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’র কিস্সাপালা সংগ্রহ করেন। যা অদ্যাবধি হস্তলিখিত পা-নসলিপি আকারে বাংলা একাডেমির জাদুঘর ও মহাফেজখানা উপবিভাগে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে মোহাম্মদ সাইদুর সংগৃহীত ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’ কিস্সাপালাটি নাট্যরূপ দিয়ে ভারতের কিংবদন্তি নাট্যনির্দেশক ও অভিনয়শিল্পী বিভাস চক্রবর্তী কলকাতার ‘অন্য থিয়েটার’-এর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ করেন, যা সারা ভারতবর্ষে আলোড়ন সৃষ্টি করে। নাটকটির শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষে কলকাতার ‘অন্য থিয়েটার’ মোহাম্মদ সাইদুরকে সংবর্ধনা প্রদান করে।
আন্তর্জাতিক পরিম-লে মোহাম্মদ সাইদুরের ফোকলোর সংগ্রহ প্রশংসিত হয়েছে। সেই সূত্রে তিনি ২০০১ খ্রিস্টাব্দে জাপানের ফুকুওয়াকা আর্ট গ্যালারি থেকে সংবর্ধিত হন। পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ফোকলোর গবেষক ও তাত্ত্বিক বাংলাদেশে ফোকলোর গবেষণার কাজে মোহাম্মদ সাইদুরের সহায়তা গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড. লাউরি হংকো, ড. হেনরি গ্লাসি, প. জহরলাল হান্ডু প্রমুখ। এদের বিভিন্ন গ্রন্থে ও প্রবন্ধে মোহাম্মদ সাইদুরের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ রয়েছে। হেনরি গ্লাসির একটি উক্তির ভেতর দিয়ে ফোকলোর গবেষণায় মোহাম্মদ সাইদুরের অবদান সম্পর্কে ধারণা করা যায়। অধ্যাপক হেনরি গ্লাসি মোহাম্মদ সাইদুর সম্পর্কে ট্র্যাডিশনাল আর্ট অব ঢাকা গ্রন্থে লিখেছেন Muhammad Sayeedur Rahman, from Kishoregonj, North of Dhaka, is the Bangla Academy’s man in the field, its folklore collector. His close knowledge of the folklore of Bangladesh is unrivaled. মোহাম্মদ সাইদুর বাংলা একাডেমির কর্মজীবন শেষ করার পর মুক্তিযুদ্ধের স্মারক সংগ্রাহক হিসেবে যুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। আমৃত্যু তিনি সেই কাজে মগ্ন ছিলেন।
তাকে স্মরণ করতে গিয়ে আজ আমরা একথা বলতে পারি, জনসংস্কৃতিধর্মী ফোকলোর গবেষণায় মোহাম্মদ সাইদুর যে পথে হেঁটে ছিলেন সেই পথ আজ প্রায় শূন্য। তার মতো আত্মনিবেদিত ফোকলোর সংগ্রাহক ও গবেষক বাংলাদেশে এখনো সৃষ্ট হয়নি, ভবিষ্যতে সৃষ্ট হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখছি না। কিংবদন্তি ফোকলোর সংগ্রাহক ও গবেষক মোহাম্মদ সাইদুরের স্মৃতি অমøান থাক। তার পবিত্র আত্মার মঙ্গল কামনা করি।
লেখক গবেষক ও লেখক
