ইউক্রেনের জনগণের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধ

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ১২:৪৩ এএম

ইউক্রেনে হামলার পর দেশটির জনগণ যে সর্বশক্তি দিয়ে লড়বে- তা আশা করেননি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কিয়েভের পতন হলেও কি ইউক্রেনীয়দের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন তিনি? নাকি রাশিয়াকেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইরাক-আফগানিস্তান-ভিয়েতনামের পরিণতি মেনে নিতে হবে? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়ে যুদ্ধের ডাক দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলা শুরু করেন তিনি। দেশটির সামরিক-বেসামরিক স্থাপনায় ছোড়া হয় ক্ষেপণাস্ত্র। শিশুসহ নিহত হয় দুই হাজারের বেশি ইউক্রেনীয়। ধ্বংস হয় হাসপাতাল, কিন্ডারগার্টেন, বাড়িঘর, টার্মিনালসহ শত শত স্থাপনা। জীবন বাঁচাতে পরিবার নিয়ে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরিসহ প্রতিবেশী অন্যান্য দেশে ছোটেন লাখ লাখ ইউক্রেনীয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর দেশ ছাড়া ইউক্রেনীয়দের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। ইউক্রেনের লাখখানেক মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে দেশটির বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নেন। আগ্রাসন শুরুর ২/৩ দিনের মধ্যে রুশ বাহিনী ইউক্রেন দখল করে ফেলতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ ইউক্রেনের জনগণের পাশে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়নি যুক্তরাষ্ট্র ও সামরিক জোট ন্যাটোর সেনাবাহিনী। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের অধিকারী রাশিয়ার সামনে ইউক্রেনের বাহিনী স্বভাবতই একা বেশিদিন টিকতে পারবে না।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি ও অস্ত্র সরবরাহের মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাষ্য, ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেধে যেত। এটি পরিহার করার জন্য রাশিয়ার ওপর একের পর এক অর্থনৈতিকসহ অন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইউক্রেনে অর্থসহায়তা ও অস্ত্র পাঠানো জারি থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ইউক্রেনে তাদের সেনাবাহিনী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় না পাঠালেও অবশ্য বসে নেই ইউক্রেনীয়রা। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ডাকে সাড়া দিয়ে শহরে শহরে দুর্গ গড়ে তোলেন ইউক্রেনের মানুষ। রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের জবাবে সামান্য মলোটভ ককটেল বা পেট্রলবোমা নিয়ে তারা লড়াই করছেন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তির সঙ্গে। এমনকি দেশ ছেড়ে যারা পাশের দেশে চলে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকে ফিরে আসেন রুশ সেনাবাহিনীকে তাড়ানোর জন্য। মাতৃভূমিকে দখলদারদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইউক্রেনীয়দের এই দেশপ্রেম অভিভূত করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ গোটা বিশ্বের মানুষকে। আত্মমর্যাদা সমুন্নত থাকলে অসীম শক্তিধর শত্রুর বিরুদ্ধেও যে লড়াই করা যায়, তা আরও একবার শেখালেন ইউক্রেনীয়রা।

জনযুদ্ধের শুরু

২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও ইউক্রেনের উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। সেই ঘটনা ভোলেননি ইউক্রেনের মানুষ। তাই এবার যখন রাশিয়া সামরিক অভিযান শুরু করে, সেই একই দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একজোট হন তারা। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। রুশ হামলা শুরুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র জেলেনস্কিকে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বললে তাতে রাজি হননি তিনি। দেশের জনগণের সঙ্গে মিলে রাশিয়াকে প্রতিহত করার অঙ্গীকার করেন জেলেনস্কি। দেশে ও দেশের বাইরে থাকা ইউক্রেনীয়দের দেশের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রাশিয়া যেকোনো মুহূর্তে হামলা করতে পারে, এটি জানত ইউক্রেন সরকার। তাই বোমা কীভাবে বানাতে হয়, অস্ত্র কীভাবে চালাতে হয়, সেসব গত কয়েক মাস ধরে বেসামরিক নাগরিকদের শেখানো শুরু করে তারা, যা রাশিয়ার অভিযানের পর বেড়ে যায়। কৌশলের অংশ হিসেবে রুশ দখলদারদের বিভ্রান্ত ও দিশেহারা করতে রাস্তাঘাট, গ্রাম ও শহর থেকে নাগরিকদের স্ট্রিট সাইন সরিয়ে ফেলতেও বলে ইউক্রেন সরকার। 

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের সময় রাশিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন একদল ইউক্রেনীয় স্বেচ্ছাসেবক। সেই সময় তারা সফল হননি। আট বছর পর রাশিয়ার ফের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এখন যারা ইউক্রেনের শহরে শহরে লড়াইয়ে নেমেছেন, তাদের বড় অংশই সেই স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যরা।      

ক্রিমিয়া হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের সহযোগী পরিচালক অ্যান্ড্রু ডি’আনিয়েরি বলেন, ‘ইউক্রেন ধনী দেশ নয়। সামরিক বাহিনীর সফলতার জন্য বেসামরিক নাগরিকদের সহায়তার দরকার। দেশটির সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ইউক্রেনীয় সেনাদের রাতে দেখতে পারার মতো চশমাসহ আরও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র দরকার। ইউক্রেনীয়দের আট বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ আজ ঘটেছে, যা সত্যিই অসাধারণ!’  

রাশিয়াকে মোকাবিলা করার ইউক্রেনের প্রস্তুতি ও তৎপরতা বেশ লক্ষণীয়। সশস্ত্র সেনাবাহিনী ও আঞ্চলিক প্রতিরোধ বাহিনী (টিডিএফ) এই দুই বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করছেন অনেক ইউক্রেনীয়। টিডিএফ হলো সংগঠিত বেসামরিক বাহিনী যাদের দায়িত্ব শহরের নিরাপত্তার জন্য লড়াই করা। এটি ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর একটি অংশ। এ ছাড়া থার্মাল ইমেজার, বর্ম, ফার্স্ট এইড কিটসহ দরকারি অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে যোদ্ধাদের সরবরাহ করছে ফিনিক্স উইংস, কাম ব্যাক এলাইভের মতো আরও বেশ কয়েকটি সুশীল সমাজ সংগঠন।          

ইউক্রেনের সাবেক অর্থমন্ত্রী তিমোফি মিলোভানোভ বলেন, ‘আট বছরে দেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের নেতৃত্বে ত্রুটি ছিল, সেনাবাহিনী সুসংগঠিত ছিল না। এখন আমাদের পেশাদার সামরিক বাহিনী রয়েছে। এই বাহিনীর সদস্যদের অনেকে ২০১৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যুক্ত ছিলেন। সে সময় যেসব স্বেচ্ছাসেবক ফ্রন্ট লাইনে ছিলেন, এখন তারাই কমান্ডার হয়ে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।’

লড়াকু টিডিএফ

শহররক্ষার পাশাপাশি যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতের দায়িত্ব পালন করে আঞ্চলিক প্রতিরোধ বাহিনী (টিডিএফ)। এ ছাড়া অভিযানে সামরিক বাহিনীকে সহায়তা, প্রধান অবকাঠামো স্থাপনা পাহারা দেওয়া ও শত্রুপক্ষের অপতৎপরতা নস্যাৎ করতেও সহযোগিতা করে টিডিএফ। মূলত সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ বেসামরিক নাগরিক নিয়ে টিডিএফ গঠন করা হয়। এই বাহিনীতে সব বয়স ও পেশার নারী-পুরুষ যোগ দিতে পারেন। চাকরিজীবী নারী-পুরুষরা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। ইউক্রেনের একসময়ের টেলিভিশন উপস্থাপক ও বর্তমানে দেশটির রিসারভিস্টস কাউন্সিলের প্রধান আন্তন গোলোবরদকোসহ অন্য নেতারা টিডিএফকে আরও দক্ষ করে গড়ে তোলেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে বেসামরিক নাগরিকদেরও প্রশিক্ষণ দেন তারা। গত দুই মাসে টিডিএফের প্রায় ১১ হাজার নতুন সদস্য পার্টটাইমের ভিত্তিতে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

চোরাগোপ্তা হামলা

দখলদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধের শুরু থেকে শত্রুপক্ষের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালান ইউক্রেনীয়রা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই ধরনের হামলা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরে বানানো মলোটভ ককটেল বা পেট্রলবোমা দিয়ে তারা অতর্কিতে রুশ বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। গত সপ্তাহে ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদ টুইটারে এই বোমা বানানো শেখায় নাগরিকদের। কাচের বোতল, দাহ্য পদার্থ ও এক টুকরো কাপড় দিয়ে মলোটভ ককটেল বানানো হয়। ওই টুইটবার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের প্রতিবেশী আমাদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। আমরাও না হয় তাদের ককটেল উপহার দিই! রুশ দখলদারদের আমরা ধ্বংস করবই।’ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হান্না মালিয়ারও ফেইসবুকে ঘরে অগ্নিসংযোগকারী ডিভাইস তৈরিতে জনগণকে উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, ‘সবারই রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।’ ‘মলোটভ ককটেল কীভাবে বানাতে হয়’ এই লিখে ইউক্রেনীয়দের গুগলে সার্চ দেওয়ার হার প্রতিরোধ পর্বের শুরুতেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পরপরই রাজধানী কিয়েভে প্রায় ১৮ হাজার মেশিনগান জনগণের হাতে তুলে দেয় ইউক্রেন সরকার। ২৪ ফেব্রুয়ারি (এই দিন ভোরে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করেন পুতিন) একদিনেই ৭০ হাজার একে-৪৭ রাইফেল ইউক্রেনজুড়ে নাগরিকদের দেওয়া হয়। একে-৪৭ পাওয়া ইউক্রেনীয় নারী ওলেনা সোকোলান বলেন, ‘২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ বাহিনীর বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সিদ্ধান্ত নিই, দেশকে রক্ষা করতে হবে। দেশের ভেতরে ঢুকে পড়া দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমি প্রস্তুত। আমি একজন স্বাস্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক নারী। দেশের জন্য যুদ্ধ করা আমার দায়িত্ব।’ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সুশীল সমাজের ভূমিকা আশাজাগানিয়া। দেশকে শত্রুমুক্ত করার মিশনের অংশ তারাও। ইউক্রেনের সামরিক সহায়তার বড় অংশ দেয় পশ্চিমা বিশ্ব। তাদের পাশাপাশি দেশটির সুশীল সমাজ সংগঠন যুদ্ধ শুরুর পর সেনাবাহিনীকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করে। ইউক্রেনের সাবেক অর্থমন্ত্রী তিমোফি মিলোভানোভ বলেন, ‘দাতব্য এসব সংগঠন দেশের চলমান দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ আগ্রাসন ঠেকাতে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক দল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। এই ইকোসিস্টেম ক্রিমিয়া দখলের পর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।’                    

হারারির ভাষ্য

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুদ্ধ বন্ধের সেøাগান ওঠে। চুপ নেই খোদ রাশিয়ার জনগণও। যুদ্ধবিরোধী মানুষের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ইউক্রেনের জনগণের লড়াইয়ের প্রতি সংহতি জানান জেরুজালেমে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও ‘স্যাপিয়েন্স : এ ব্রিফ হিস্টোরি অব হিউম্যানকাইন্ড’ বইয়ের লেখক ইউভ্যাল নোয়া হারারি। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এক ঐতিহাসিক পরাজয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পুতিন হয়তো জয়ী হবেন কিন্তু আদতে তিনি এরই মধ্যে হেরে গেছেন। রুশ সাম্রাজ্য পুনর্নির্মাণের যে স্বপ্ন পুতিন দেখেন, তা মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো হয়েছে। তার বক্তব্য, ইউক্রেন আসলে কোনো রাষ্ট্র নয়, ইউক্রেনীয়রা কোনো জাতি নয়। কিয়েভ, খারকিভ ও লিভ শহরের মানুষ রাশিয়ার শাসনে আসার জন্য মরিয়া। পুতিনের এসব বক্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। ইউক্রেন রাষ্ট্রের ইতিহাস হাজার বছরের। আর কিয়েভ যখন ওই অঞ্চলের প্রধান মহানগর হয়, তখন গ্রামের পর্যায়েও ছিল না মস্কো। অথচ ইউক্রেনের ইতিহাস নিয়ে রাশিয়ার স্বৈরশাসকের মিথ্যাচার থামছেই না।’

পুতিনের ইউক্রেনে আগ্রাসনের পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ হারারি বলেন, ‘পুতিন বেশ কয়েকটি বিষয়ে শুরু থেকে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি জানতেন, ইউক্রেনকে সহায়তা করতে সেনা পাঠাবে না ন্যাটো। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর ইউরোপীয়দের নির্ভরশীলতা জার্মানির মতো দেশকে মস্কোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপে দ্বিধায় ফেলবে। এসব কারণে ইউক্রেনে দ্রুত ও চরম পর্যায়ের হামলা চালিয়ে দেশটির সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে পুতুল সরকার বসানোর পরিকল্পনা করেন পুতিন। পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তারও পরিকল্পনা করেন তিনি। তবে ইউক্রেনে হামলার হিসাব কষার সময় গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়ে অবগত ছিলেন না পুতিন। সেই বিষয়টি ইরাকে মার্কিন ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনী ঠেকে শেখে। আগ্রাসন চালানোর পর মার্কিন ও সোভিয়েত শাসকরা বুঝতে পারেন, দেশ দখল করা সহজ কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। পুতিন জানতেন, ইউক্রেন দখলের ক্ষমতা তার রয়েছে। তবে মস্কোর চাপিয়ে দেওয়া পুতুল সরকারকে কি ইউক্রেনীয়রা মেনে নেবে? এই প্রশ্নে জুয়া খেলায় নামেন পুতিন। মস্কো সমর্থিত সরকারকে যাতে ইউক্রেনীয়রা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়, এ জন্য হামলার অজুহাত হিসেবে বারবার তিনি বলতে থাকেন, ইউক্রেন কাল্পনিক রাষ্ট্র, ইউক্রেনীয় জাতি বলে কিছু নেই। ২০১৪ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনে নতি স্বীকার করে ক্রিমিয়ার মানুষ। তাহলে ২০২২ সাল কেন ভিন্ন হবে?’

ইউক্রেনের লড়াকু জনগণ সম্পর্কে হারারি বলেন, ‘দিন যত গড়াচ্ছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, জুয়ায় হেরেছেন পুতিন। সর্বশক্তি দিয়ে দখলদার বাহিনীকে প্রতিহত করছেন ইউক্রেনীয়রা। তাদের প্রতিরোধ পুরো বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছে। যুদ্ধে তারাই জয়ী। আগামী দিনগুলো ইউক্রেনীয়দের জন্য অন্ধকারের। রুশরা পুরো ইউক্রেনই দখল করতে পারে। তবে যুদ্ধে জিততে হলে তাদের ইউক্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ইউক্রেনীয়রা নিয়ন্ত্রিত হতে চাইলেই কেবল তা সম্ভব, অন্যথায় নয়। একটি রুশ ট্যাঙ্ক ধ্বংস বা একজন রুশ সেনা মারার পর উল্লাস করছেন ইউক্রেনীয়রা। এসব ঘটনা তাদের মনোবল বাড়াচ্ছে। আর একজন ইউক্রেনীয়র মৃত্যু তাদের দখলদারদের প্রতি ঘৃণা বাড়াচ্ছে। আবেগের মধ্যে সবচেয়ে কুৎসিত হলো ঘৃণা। তবে নিপীড়ত মানুষের কাছে ঘৃণা গুপ্তধন। হৃদয়ের গভীরে থাকা এই আবেগ দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চলতে পারে। রুশ সাম্রাজ্য পুনর্নির্মাণ করতে চাইলে পুতিনের দরকার রক্তপাতহীন জয়। রক্ত যত ঝড়বে, তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। রুশ সাম্রাজ্যের ডেথ সার্টিফিকেটে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের নাম নয়, পুতিনের নাম লেখা থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে মূলত রাষ্ট্র নির্মিত হয়। ইউক্রেনের খাতায় প্রতিদিন নতুন নতুন কাহিনী যুক্ত হচ্ছে। এসব কাহিনী ইউক্রেনীয়রা শুধু যে সামনের অন্ধকার সময়ে বলবে, তা নয়; দশকের পর দশক ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের লড়াইয়ের কথা জানবে মানুষ। এই যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের কথায় রাজধানী ছেড়ে পালাতে রাজি না হয়ে উল্টো দেশটিকে বললেন, তার গোলাবারুদ দরকার, পলায়ন নয়; কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেনের দ্বীপ স্নেক আইল্যান্ডে রুশ যুদ্ধজাহাজকে দেশটির যে সেনারা বললেন, ‘আমাদের দ্বীপ থেকে দূর হয়ে যাও’, রাস্তায় শুয়ে যেসব বেসামরিক ইউক্রেনীয় নাগরিক রুশ ট্যাঙ্ক থামানোর চেষ্টা করলেন তাদের কাহিনী দিয়েই রাষ্ট্র নির্মিত ও সুসংসত হয়। ট্যাঙ্ক-ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে প্রতিরোধের কাহিনী মানুষ মনে রাখে বেশি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত