দেশে প্রথম যান্ত্রিক হৃৎপিন্ড স্থাপন

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২২, ০১:১১ এএম

দেশে প্রথমবারের মতো এক রোগীর প্রায় অকার্যকর হৃৎপিন্ডে মেকানিক্যাল ডিভাইস সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছেন চিকিৎসকরা। প্রতিস্থাপনের পর ওই রোগীর হৃৎপিন্ডের কার্যকারিতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা হলো। অস্ত্রোপচার করা রোগী বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন।

গত বুধবার রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রধান কার্ডিয়াক সার্জন ও কার্ডিয়াক সেন্টারের পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের নেতৃত্বে এ অস্ত্রোপচার করা হয়। ৪২ বছর বয়সী এক নারীর হৃৎপিণ্ডে এ যান্ত্রিক হৃৎপিণ্ড বা লেফট ভেন্ট্রিকুলার অ্যাসিস্ট ডিভাইস (এলভিএডি) প্রতিস্থাপন করা হয়।

অস্ত্রোপচারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অস্ত্রোপচার দলের প্রধান ডা. জাহাঙ্গীর কবির জানান, ওই নারী দীর্ঘদিন হৃৎপিণ্ডের নানা জটিলতায় (শেষ পর্যায়ের বা তীব্র হার্ট ফেইলিওর) ভুগছিলেন এবং দেশ-বিদেশে নানা চিকিৎসার পরও তার হৃৎপিণ্ড প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ছিল। যাদের হার্ট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে তাদের জন্য এ চিকিৎসা। এ পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি যন্ত্র হার্টের নিচে বসানো হয়। সফল অস্ত্রোপচার হলে এই যন্ত্র হার্টকে পাম্প করতে সহায়তা করে। এ কারণে একে কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড বলা যাবে।

এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, এটি একটি চার্জেবল ডিভাইস। এই যন্ত্রটি হার্টের নিচে বসানো হয়। হৃদযন্ত্রে বসানো হলে যদি চার্জ শেষ হয় তবে অটো সিগন্যাল পাওয়া যায়। যন্ত্রটি বসানোর ফলে হার্টের লাল রক্তকণিকা সচল হয়। স্বাভাবিক কাজ করে হার্ট। ফলে শরীরের অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভালো থাকে।

অবশ্য এই চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল বলে জানিয়ে ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, যন্ত্রটির দাম ১ কোটি টাকা। এর সঙ্গে অস্ত্রোপচারের খরচ যোগ হবে। তবে সফল অস্ত্রোপচার হলে রোগী দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে। তাই এমন ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য সরকারের সব ধরনের সহযোগিতা দরকার।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের বর্তমান উৎকর্ষতায় উন্নত বিশ্বে এর একমাত্র চিকিৎসা আরেকটি সুস্থ হার্ট দিয়ে প্রায় অকার্যকর হার্টটি প্রতিস্থাপন। তবে যদি সুস্থ হার্ট না পাওয়া যায়, পেতে দেরি হয় অথবা হার্টের অবস্থার যদি দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে তবে মেকানিক্যাল হার্ট ইমপ্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। এতে রোগীর হার্ট কিছুটা বিশ্রাম পায় এবং পুরো শরীরের রক্ত চলাচল অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। ফলে শরীরে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন কিডনি, লিভার ইত্যাদি সেরে ওঠার সুযোগ পায়। তীব্র হার্ট ফেইলিওরে আক্রান্ত কিছু রোগী হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের উপযুক্ত না হলে তাদের জন্য একমাত্র বিকল্প এ মেকানিক্যাল ডিভাইস, যা স্থাপনের মাধ্যমে বাকি জীবন সুস্থভাবে অতিবাহিত করতে পারেন।

ডা. জাহাঙ্গীর কবির ও তার সহকর্মীরা প্রায় চার ঘণ্টার সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হার্টমেট-৩ নামের একটি মেকানিক্যাল হার্ট রোগীর হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয়ে স্থাপন করেন এবং তার পুরো হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন। চিকিৎসকরা আশা প্রকাশ করেন, এর মাধ্যমে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে আসবে এবং হার্ট ফেইলিওরের লক্ষণগুলোর উন্নতি ঘটবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশে হার্ট সার্জারির প্রথম সারির এ চিকিৎসক দল হাসপাতালের শুরু থেকে প্রায় ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষের হার্টের সফল অস্ত্রোপচার করেছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে দশ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এ জটিল রোগে আক্রান্ত। আর এশিয়াতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ১ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত