যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’কে কেন ইউক্রেনে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) সেই প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি জাহাজটির নাবিকদের সময়মতো উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের মেরিন ক্যাডেটরা। তারা বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধ এলাকায় জাহাজ পাঠানো না হলে এমন বিষাদময় পরিস্থিতির অবতারণা হতো না।
তবে বিএসসি কর্মকর্তারা বলছেন, জাহাজ ভাড়া করা পক্ষের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা ‘এডিশনাল ওয়ার প্রিমিয়াম’ দিতে সম্মত হলে যুদ্ধ এলাকায় জাহাজ পাঠাতে বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর দুদিন আগে থেকে অলভিয়া সমুদ্রবন্দরে আটকা পড়ে পণ্য বোঝাইয়ের উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়া বিএসসির জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি। জাহাজটিতে ছিলেন ২৯ জন বাংলাদেশি নাবিক। গত বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২৫ মিনিটে রকেট হামলার শিকার হয় জাহাজটি। এতে মারা যান জাহাজটির থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের মেরিন ক্যাডেটরা শোক প্রকাশ করেছেন।
বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের ২৯ জনের মধ্যে ১৫ জন ক্রু ছাড়া বাকি ১৪ প্রকৌশলী ও অফিসারই হচ্ছেন বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে বের হওয়া ক্যাডেট। সহকর্মীদের এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ চট্টগ্রামের মেরিন ক্যাডেটরা। বিশেষ করে যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে ইউক্রেনে জাহাজ পাঠানো এবং নাবিকদের নিরাপদে উদ্ধার করতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না হওয়াকে ভালোভাবে দেখছেন না তারা।
একাধিক মাস্টার ও ক্যাডেট এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইউক্রেনের বন্দরে জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে বিএসসির সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। তাদের কাছে হয়তো মানুষের জীবনের চেয়ে ভাড়া বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
গতকাল রাতে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক ড. পীযূষ দত্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাহাজের ২৮ নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। বিএসসির পক্ষ থেকে নাবিকদের উদ্ধারের বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। এছাড়া পোল্যান্ড ও রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে বিএসসি থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তারাও চেষ্টা করছে।
বাংলার সমৃদ্ধিকে ইউক্রেনে পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চার্টারারের (ভাড়া নেওয়া পক্ষ) সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি রয়েছে তার অপশন অনুযায়ী চার্টারার এডিশনাল ওয়ার প্রিমিয়াম দিতে সম্মত থাকলে আমরা ওয়ার জোনে জাহাজ পাঠাতে বাধা দিতে পারি না।’
তবে বিএসসির এই কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মো. এনাম চৌধুরী। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘অর্থের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এক্সট্রা প্রিমিয়ামের জন্য এভাবে আমাদের নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত ছিল না। বিএসসি চাইলে চার্টারারের প্রস্তাব উপেক্ষা করতে পারত।’
জাহাজের ক্যাপ্টেন ওমর ফারুক তুহিনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে তার কথা হয়েছে জানিয়ে এনাম চৌধুরী বলেন, ‘হামলায় জাহাজের নেভিগেশন সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই এ জাহাজ নিয়ে আর সমুদ্রপথে বের হওয়া সম্ভব নয়। জাহাজের মেইন পাওয়ার জেনারেটরও (বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল যন্ত্র) কাজ করছে না।’
বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ৪৯তম ব্যাচের ক্যাডেট নুরুল আবচার সবুজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে বাংলার সমৃদ্ধির নাবিকদের জীবন বাঁচানোর আর্তনাদ এবং পুরো মেরিন কমিউনিটি বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পরও বিএসসির পক্ষ থেকে এসব নাবিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে কার্যকর ব্যবস্থা না করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর মধ্যে রকেট হামলার শিকার হলো জাহাজটি।’
২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের বহরে যুক্ত হয় সমুদ্রগামী জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি। ডেনিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা কর্পের সিঙ্গাপুর অফিস জাহাজটি ভাড়া নিয়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন করছে। জাহাজটি গত ২৬ জানুয়ারি ভারতের মুম্বাই বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে তুরস্কের ইরেগলি বন্দরে যায়। সেখান থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পণ্য বোঝাইয়ের জন্য ইউক্রেনের ‘অলভিয়া’ বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। ২২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি বন্দরে নোঙর করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর বিমান হামলা শুরু করলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিএসসির পক্ষ থেকে জাহাজটিকে কোনো পণ্য না নিয়ে বন্দর ছেড়ে আসার জন্য পরামর্শ দেওয়া হলেও জাহাজ বের করার জন্য কোনো পাইলট না পাওয়ায় সেখানে আটকা পড়ে।
