কিছুদিন আগের কথা। রাশিয়া তখনো ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করেনি কিন্তু তাদের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থা নিয়ে প্রচণ্ড উত্তেজনা চলছে। দেখলাম ফেইসবুকে একটি কার্টুন ভেসে বেড়াচ্ছে। দুজন মানুষ অস্ত্র নিয়ে পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া শুরু করেছে, আর তার পেছনে লুঙ্গি পরা একজন বসে আছে। অস্ত্রধারী দুজনকে রাশিয়া আর ইউক্রেন বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো পেছনে লুঙ্গি পরা মানুষটা কে? উত্তর এলো তিনি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, যিনি যুদ্ধ লেগে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন এবং পরিকল্পনা করছেন কখন, কীভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়াবেন।
এ দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় অসাধারণভাবে ব্যবসায়ীদের চিনে ফেলেছেন। তারা দুর্দান্তভাবে পূর্বানুমান করতে পারেন, ব্যবসায়ীরা কখন কী করবেন। ওই কার্টুনটির বক্তব্য ফলে গেল। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ লেগে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাইকারি ভোগ্যপণ্যের প্রধান বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গমের দাম বেড়ে যায়। এটা ঠিক, রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশ প্রচুর গম আমদানি করে। কিন্তু এই দুই দেশের কোনোটি থেকেই এখানে চিনি, মসুর ডাল বা ছোলা আমদানি করা হয় না, কিন্তু শুধু সেই দুই দেশের যুদ্ধের খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলোরও দাম বাড়িয়ে দিয়েছিলেন দেশের ব্যবসায়ীরা। আমদানি করার দেশে দাম বেড়ে গেলেও কি এভাবে তাৎক্ষণিকভাবে দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন ব্যবসায়ীরা?
দেশের সচেতন মানুষরা জানেন, কোনো একটি পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেলে ভারত ছাড়া দূরবর্তী দেশ থেকে সেটি আমদানি করে বাংলাদেশে বাজারজাত করতে দূরত্ব ভেদে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে। অর্থাৎ আজ যেই পণ্যের মূল্য বাড়ল সেই বর্ধিত মূল্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা দেড়/দুই মাস পর। কিন্তু দেখা যায় মুহূর্তেই দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। শুধু তা-ই না, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য কমলেও এ দেশে বেড়ে যাওয়া পণ্যের মূল্য খুব কম ক্ষেত্রেই কমে, আর কমলেও সেটা যতটা কমার কথা ছিল তার তুলনায় কমে অনেক কম।
এটা একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনা। কিন্তু বাংলাদেশের যেকোনো পরিস্থিতিতে যৌক্তিক, অযৌক্তিক নানা কারণে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্যমূল্য যতটা বাড়ার কথা বাস্তবে বাড়ে তার চেয়ে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি করা পণ্যের মূল্য বাড়ে তা না, দেশে উৎপাদিত পণ্যেরও মূল্য অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয় প্রতিনিয়ত। এই যেমন এই বছর ভরা শীতেও শীতকালীন শাকসবজির মূল্য খুব একটা কমেনি। সম্পূর্ণভাবে দেশে উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহজনিত ঘাটতি না থাকার পরও মূল্য কমছে না। দেখা যায় উৎপাদন স্থলে ১০-১২ টাকায় কেজিতে বিক্রি হওয়া কোনো সবজি ঢাকায় ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়।
এটা শুধু পণ্যমূল্যের ক্ষেত্রেই না, ঘটে অন্যান্য ক্ষেত্রেও। এই যেমন কিছুদিন আগেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর যে হারে ভাড়া বাড়ার কথা ছিল ভাড়া বেড়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। এটা নিয়ে মাঠপর্যায়ে যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে সংঘাত তৈরি হলেও পেছনে ছিল শ্রমিক সংগঠন এবং মালিক সংগঠনের অতি গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় যে ভাড়া বাড়ার কথা ছিল ৫% সেটি সরকারিভাবে বাড়ানো হয় বাসের ক্ষেত্রে ২৭% আর লঞ্চের ক্ষেত্রে ৩৫%। এ তো গেল সরকারি বাড়ানোর কথা; বেসরকারিভাবে এই ভাড়া ৫০%-ও বেড়েছে বহু ক্ষেত্রে।
সামনে রমজান মাস আসছে। রমজানে যেহেতু এমনিতেই ভোগ্যপণ্যের বিক্রি বেড়ে যায়, তাতেই ব্যবসায়ীদের মুনাফা অনেক বাড়ে। তাই মুসলিম অধ্যুষিত অনেক দেশে এ সময় ভোগ্যপণ্যের মূল্য বাড়া দূরেই থাকুক কমিয়ে রাখেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু প্রতিবার নিয়ম করে এই মাসে জিনিসপত্রের দাম বাড়বেই। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না নিশ্চয়ই।
সংকট আছে গ্যাস নিয়েও। আবাসিক গৃহে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ, যাদের আছে সেখানেও অনেক সময়ই পর্যাপ্ত চাপ না থাকার কারণে রান্না করা যায় না। দেশের স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান স্তিমিত। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ার এক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো চুক্তিতেই যেতে পারেনি সরকার, গ্যাসপ্রাপ্তি তো বহু দূরের কথা। এসব করা হচ্ছে জনগণকে আরেক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের (তরলীকৃত গ্যাস) হাতে তুলে দিতে। এখানেও বরাবরের মতোই সরকার জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মূল্য নির্ধারণ করে। এই গ্যাস ব্যবহারকারীরা জানেন সেই দামেও গ্যাস পাওয়া যায় না, বোতলজাতকারী অতি বড় ব্যবসায়ীরা তাদের গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করে একেবারে ইচ্ছেমতো।
এ দেশের সবকিছুর দাম যে বাড়ে, তা না, কখনো কখনো কিছু জিনিসের দাম ভীষণভাবে কমে যায়। ভরা মৌসুমে কৃষকের হাতে যখন অনেক ধান থাকে, তখন ধানের দাম পতন হয়। কোরবানির পর কোরবানি করা প্রাণীর চামড়ার দাম পতন হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চামড়ার দামের পতন না, এই জিনিসটি রীতিমতো মূল্যহীন হয়ে গেছে। এ দেশে যে জিনিসের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষ লাভবান হবে, দাম কমে সেটার। দেশে যেটার দাম কম থাকলে প্রায় সব মানুষের কল্যাণ হওয়ার কথা আর যেটার দাম কমলে প্রায় সব মানুষের ভালো হয় সেগুলো উল্টো হওয়ার পেছনে আমরা সব সময় দায়ী করি সিন্ডিকেটকে। একটা পণ্য যখন দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন করা হয় সেটার পরিবহনের সিন্ডিকেট আছে, কৃষিপণ্য হলে কৃষকদের কাছে পণ্য কেনার ফড়িয়াদের সিন্ডিকেট আছে, আছে পাইকার-আড়তদারদের সিন্ডিকেট সর্বোপরি ক্ষমতাসীন দল আর পুলিশের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। আমদানি করা পণ্য হলে তাতে থাকে আমদানিকারক এবং মিল-মালিকদের সিন্ডিকেট।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে জনগণের স্বার্থরক্ষা করা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয় আমাদের সমাজে। পত্রিকায় রিপোর্ট হয়, কলাম লেখা হয়, টিভিতে টকশো হয়। আলোচনা হয় কীভাবে এসব সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা যায়। অনেকেই আহ্বান জানান সরকারের কাছে তারা যেন সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দেয়। বছরের পর বছর আমাদের দাবি-আহ্বান চললেও ফল হয়নি কিছুই। আমি তো পাল্টা প্রশ্ন করি ফল হবে কেন? কেনইবা সরকার সিন্ডিকেট ভাঙবে?
নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ফল ব্যবসায়ীদের হাতে কতটা যায় সেটার একটা ছোট হিসাব দেখা যাক। বাংলাদেশ প্রতিদিন মানুষ মাথাপিছু কতটা চাল খায় সেটা নিয়ে গবেষণায় ভিন্নতা আছে। প্রাপ্ত যেসব তথ্য আছে তার মধ্যে আমরা যদি মাঝামাঝি একটা পরিমাণ ধরি তাহলে সেটা হলো ৪০০ গ্রাম। অর্থাৎ ১৭ কোটি মানুষের দেশে মানুষ প্রতিদিন ৬ কোটি ৮০ লাখ কেজি চাল খায়। প্রতি কেজি চালের দাম যদি এক টাকা করে বেড়ে যায় তাহলে প্রতিদিন বাজার থেকে ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাজার থেকে বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা চলে যায় ব্যবসায়ীদের পকেটে। চালের দাম যদি কৃষকের পর্যায় থেকে বেড়ে আমাদের কাছে আসত, তাহলে দেশের প্রান্তিক কিছু মানুষের উপকার হতো। কিন্তু বাংলাদেশে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করে ৩০টির মতো বৃহৎ অটোরাইস মিল। অর্থাৎ জনগণের পকেট থেকে যে বিশাল টাকা বেরিয়ে যায়, সেটার মালিক হয় হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ। এটাই হলো বর্তমানে চালের প্রধান সিন্ডিকেট। আমরাই যখন এটা জানি, অতি ক্ষমতাশালী গোয়েন্দা সংস্থা হাতে থাকা সরকার এসব না জানার তো কোনো কারণই নেই। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তো নেওয়া হয় না। করোনার পর বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে মানুষের অতি দীর্ঘ আইন দেখা যায় ওএমএসের দোকানের সামনে।
বাংলাদেশে একটি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর আছে। এখানে পণ্য উৎপাদন, আমদানি, বিপণন, বাজারজাতকরণ, বিক্রিÑ সবকিছু হবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে। কথা ছিল, সরকার উৎপাদক, ব্যবসায়ী (বৃহৎ থেকে ক্ষুদ্র) আর ক্রেতাদের মধ্যে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করবে, ঠিক করে দেবে ‘রুলস অব দ্য গেম’। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে না। কেউ কেউ বলেন, বাংলাদেশে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ বা ক্রনি ক্যাপিটালিজম জাঁকিয়ে বসেছে। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার তার কিছু বন্ধুকে নানা রকম অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দেয়, যারা জনগণের পকেট কাটে, করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন।
ক্রনি ক্যাপিটালিজমের ক্ষেত্রে সরকার আর লুণ্ঠনকারী, চোর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আবছা হলেও একটা পার্থক্যরেখা থাকে। কখনো কখনো কিছু দেশের ক্ষেত্রে এই বিভেদরেখা একেবারেই মুছে যায়, চোররাই বসে থাকে সরকারে। অর্থনীতির ভাষায় এটাকেই বলে ক্লিপ্টোক্র্যাসি। যেসব জায়গায় সিন্ডিকেট বানিয়ে জনগণকে নানাভাবে লুট করে সেগুলো সব আসলে সেই চোর সরকারেরই একটা বর্ধিত অংশ। জনগণের পকেট থেকে সরাসরি বেরিয়ে যায় বলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মানুষের সরাসরি গায়ে লাগে। কিন্তু এ দেশে নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জনগণের করের কিংবা জনগণের নামে নেওয়া ঋণের লাখো কোটি টাকা লুটপাট হয়। সিন্ডিকেট বানিয়ে মানুষের পকেট কেটে কিংবা প্রকল্প থেকে লুটপাট করা অকল্পনীয় রকম সম্পদের হিস্যা যে পায় অনেক রাঘববোয়াল, সেটা বলাই বাহুল্য। আর তাই এ দেশে সরকারই সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেট।
যে প্রশ্ন করেছিলাম আগে, সরকার কেন সিন্ডিকেটের কবল থেকে জনগণকে রক্ষা করবে, তার জবাব আশা করি পাওয়া গেছে। দেশের প্রধান সিন্ডিকেটটির কাছে তার সহযোগী উপসিন্ডিকেট থেকে মুক্তির আবেদন করার চেয়ে বড় বোকামি কি আর কিছু হতে পারে?
লেখক আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ
