কর আদায় নিয়ে সংকটে রয়েছে সরকার। দেশের একটি বড় অংশই আয়কর দেওয়ার সক্ষমতা থাকার পরও তারা কর দিতে চান না। এর ফলে কর-জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদনের) অনুপাতে বিশ্বে তলানিতে রয়েছে বাংলাদেশ। সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হচ্ছে। তবে কর দেওয়া নিয়ে আয়করদাতারাও হতাশ। বিশে^র বিভিন্ন দেশে আয়করের বিনিময়ে নাগরিকরা সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সুবিধা পেলেও বাংলাদেশের আয়করদাতারা কিছুই পান না। বরং আয়কর দিতে গিয়ে অনেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বিশ্বাসের সংকটে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই সামর্থ্য থাকার পরও আয়কর দিতে আগ্রহ দেখান না।
কেন কর দেবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। করের অর্থ যে স্বচ্ছতার সঙ্গে দেশের উন্নয়নকাজে ব্যয় হবে, তা নিয়েও আস্থার অভাব রয়েছে। করদাতারা তার দেওয়া করের রিটার্ন দেখতে চান। তার করের টাকায় তিনি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কী সুবিধা পাচ্ছেন তা দেখতে চান।
দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা জুবায়ের আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাকরিকালে আমি নিয়মিত কর দিয়েছি। আয়কর দিতে গিয়ে অনেক সময়ই হয়রানি হতে হয়েছে। যদিও আয়করের বিনিময়ে কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘এক বছরের বেশি সময় আমি বেকার রয়েছি। আমি যে এত বছর কর দিলাম তার বিনিময়ে কী পাব?’
বিশে^র বিভিন্ন দেশের করব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সামাজিক বীমা কর্মসূচিতে কতটা অর্থ দেওয়া হয়, সেই সঙ্গে বয়স এবং বাড়ির মালিক কি নাএমন নানা বিষয়ে নির্দিষ্ট শর্তের ওপর ভিত্তি করে দেশ অনুসারে আয়করের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন দেশ করদাতাদের তাদের আয়ের স্তর, বৈবাহিক অবস্থা ও নির্ভরশীলদের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তর রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে আয়কর দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো সুবিধা রাখা হয়নি।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু আয়কর দিতে অনীহার কারণে মাত্র দেড় শতাংশেরও কম মানুষ আয়কর দিচ্ছে। দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের আর্থিক সামর্থ্য বেড়েছে। এ হিসেবে বর্তমানে আয়করদাতার সংখ্যা অন্তত ৮ থেকে ১০ গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র : জনসংখ্যার অনুপাতে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি আয়কর দেন ভুটানের নাগরিকরা। ভুটানের জনসংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার, যার মধ্যে ২০১৯ সালে ৮৮ হাজার করদাতা রিটার্ন দিয়েছেন। দেশটির মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশের বেশি প্রত্যক্ষ করের আওতায় রয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নেপাল, যার জনসংখ্যা ২ কোটি ৮০ লাখ। দেশটির জনসংখ্যার ১১ শতাংশ প্রত্যক্ষ করের আওতায় আছেন। শ্রীলঙ্কার অবস্থায়ও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। এ দ্বীপ দেশটির ২ কোটি ১৬ লাখ জনসংখ্যার ৭ শতাংশ মানুষ কর দেন।
এ অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি ভারতে ১ কোটি ৪৬ লাখ মানুষ আয়কর দেন। ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে এই সংখ্যা দেড় শতাংশ। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের অবস্থা অনেকটাই বাংলাদেশের মতো। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি হলেও কর দেন মাত্র ২৫ লাখ মানুষ। সম্প্রতি দেশটির কর কর্তৃপক্ষ বেতনভোগী পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করে প্রত্যেককে চিঠি পাঠাচ্ছে, যেখানে ন্যাশনাল ট্যাক্স নম্বর নিবন্ধন ও অ্যাকটিভ ট্যাক্সপেয়ারস তালিকায় (এটিএল) যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিস্থিতি : দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ কর না দেওয়ায় মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়ছে। আর অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা চাপানো হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। অপ্রত্যক্ষ করের ফলে মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী কর দিচ্ছে না। ফলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সমান হারে কর দিচ্ছে, যেটি কর নীতিমালায় ন্যায়নীতির বিরোধী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে বেশিরভাগ মানুষ আয়করের বাইরে থাকলেও প্রতিবছর বাজেট বাড়ছে, সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কর ১ লাখ ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে আয়কর থেকে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা আসবে। এর বাইরে পরোক্ষ কর যেমন আমদানি, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আবগারি শুল্ক ইত্যাদি থেকে ২ লাখ ২৪ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত (জুলাই-ডিসেম্বর) ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ওই সময় পর্যন্ত আয়কর বাবদ আদায় হয়েছে ৩৯ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি।
করোনাভাইরাস মহামারী ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানো হয়েছে এবারের বাজেটে। পুরুষ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া সর্বনিম্ন করহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
উন্নত দেশে করহার ও সুবিধা : পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তুলনামূলক কম সম্পদশালী দেশগুলোতে আয়কর হারের পরিমাণ কম। যেমন ইউরোপের বসনিয়া ও হার্জেগোবিনা, বুলগেরিয়া, কসোভো, মেসিডোনিয়া, মন্টেনিগ্রো, রোমানিয়া, সার্বিয়ায় আয়কর হারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। এরপরও রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার কর-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৮ ও ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ। রাশিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন, মলদোভা, হাঙ্গেরির আয়করের হার ১২-১৮ শতাংশ। বিপরীতে ইউরোপের ধনী দেশ যেমন জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে আয়করের হার ৪০ থেকে ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত। তবে ধনী দেশগুলো উচ্চ হারে আয়করের বিনিময়ে সবার জন্য ন্যূনতম আয় এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে তারা। এসব দেশের রাজস্বের বড় অংশই আসে সামাজিক নিরাপত্তায় রাখা জনগণের অবদান থেকে।
২০১৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর রাজস্বের বড় অংশই এসেছে নিট সামাজিক অবদানগুলো থেকে। এ সময় ইইউর মোট জিডিপির ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে সামাজিক অবদান থেকে। একই সময়ে উৎপাদন ও আমদানি থেকে কর এসেছে মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আয়কর ও সম্পদকর থেকে এসেছে মোট জিডিপির ১৩ শতাংশ।
ভিয়েতনামের কর্মীদের জন্য সামাজিক বীমা (এসআই), স্বাস্থ্য বীমা ও বেকারত্ব বীমা বাধ্যতামূলক। এসব বীমার খরচ (অবদান) বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্টের আয়ের ওপর পিআইটি (পারসোনাল ইনকাম ট্যাক্স) ধার্য করা হয়। ভিয়েতনামি এসআই স্কিম অসুস্থতা, মাতৃত্ব, পেশাগত রোগ ও দুর্ঘটনা, অবসরগ্রহণ এবং মৃত্যুর জন্য বীমা দাবি মেটায়। ভিয়েতনামিদের জন্য ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর ধার্য করা আছে। পরিবারের নির্ভরশীলদের জন্য কর হ্রাসের বিধান রয়েছে ভিয়েতনামে। আয়ারল্যান্ডের একজন করদাতা তার বার্ষিক পেনশন অবদানের জন্য বয়স বিবেচনায় ১৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারেন। ডেনমার্ক উচ্চকরের দেশ হলেও বাড়ি বিক্রি থেকে মূলধনী মুনাফা সেখানে করমুক্ত। সেখানকার বেশিরভাগ করদাতা ব্যক্তিগত ভাতা ও কর্মসংস্থান ভাতা পেয়ে থাকেন।
উন্নত দেশগুলো তার নাগরিকদের বিভিন্ন স্তরের সুবিধা দেয়। আয়, বয়স ও স্বাস্থ্যের অবস্থার মতো ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক বীমা কর্মসূচিতে কোনো ব্যক্তি যে পরিমাণ অর্থ দেয় তার বিপরীতে বিভিন্ন সুবিধা পায়। বিশে^র বিভিন্ন দেশে বিবাহিত দম্পতিরাও কর হ্রাসের সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিবাহিতদের ওপর ১২ দশমিক ২ শতাংশ কর ধার্য করে যুক্তরাষ্ট্র, যা এই বিভাগে বিশে^ ২৫তম সর্বোচ্চ করের হার। দুই সন্তানসহ বিবাহিত একক উপার্জনকারী দম্পতিদের ওপর সর্বনিম্ন ব্যক্তিগত আয়কর হার চেক প্রজাতন্ত্রে ১.৮ শতাংশ, কানাডায় ২.৪ শতাংশ ও এস্তোনিয়ায় ২.৯ শতাংশ। আয়কর ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা একত্রীকরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় বেকারত্ব ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়।
বিশে^ কর-জিডিপির অনুপাত : উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় কর-জিডিপির গড় অনুপাত ৩৬ শতাংশের মতো। উদীয়মান এশীয় দেশগুলোর অনুপাতও গড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত সাড়ে ১৮ শতাংশ। এমনকি সাব-সাহারা খ্যাত আফ্রিকার দেশগুলোর কর-জিডিপির গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২১ অর্থবছরে ভারতের কর-জিডিপির অনুপাত ছিল ১০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২০ সালে নেপালের কর-জিডিপির অনুপাত ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে পাকিস্তানের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ^ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।
সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়। কিন্তু সে বছর করোনা মহামারীতে দেশের কর-জিডিপির অনুপাত দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। অবশ্য অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২৫ সালে দেশের কর-জিডিপির অনুপাত ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।
বৈশ্বিক কর প্রতিযোগিতা সূচক ২০২০ অনুযায়ী, সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে এস্তোনিয়া। দেশটির কোনো কোম্পানি যদি তার মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করে তাহলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে কোনো করপোরেট কর দিতে হয় না। যদি মুনাফা লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করে তাহলে ২০ শতাংশ হারে করপোরেট কর দিতে হয়। আর কোনো কোম্পানি নিয়মিত লভ্যাংশ দিলে এই হার নেমে আসে ১৪ শতাংশে। এমনকি স্থানীয় কোম্পানিগুলোর বিদেশে অর্জিত মুনাফার ওপর শতভাগ কর ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
এস্তোনিয়ার করব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ওইসিডিভুক্ত যেকোনো দেশের তুলনায় এস্তোনিয়ায় ঝামেলামুক্ত ও সবচেয়ে কম সময়ে কর দেওয়া যায়। করপোরেট আয়করের কমপ্লায়েন্স পূরণ করতে এস্তোনিয়ায় মাত্র ৫ ঘণ্টা সময় লাগে, যেখানে ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতে গড়ে ৪২ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ করদাতা সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেন। এই পদ্ধতিতে একজন করদাতা রিটার্ন জমার পর সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তি রসিদ দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্রতিবছর মোট জমা করা রিটার্নের ৫ থেকে ১০ শতাংশ রিটার্ন নিরীক্ষা করা হয়। এতে প্রতিবছর এক লাখ থেকে দুই লাখ করদাতার কর নথি নিরীক্ষার আওতায় আনা হয়। এসব করদাতার কর নথির হিসাবনিকাশের পক্ষে প্রামাণ্য দলিলাদি নিয়ে কর কার্যালয়ে দৌড়াতে হয়।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে আয়করদাতাদের স্বাস্থ্যসেবাসহ কিছু বাড়তি সুরক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের মতো গরিব দেশে আয়করদাতাদের সেসব ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আয়করদাতারা সবাই সামর্থ্যবান। তাদের আলাদা কোনো সুরক্ষার দরকার নেই। আয়করদাতারা চান সম্মান। তারা চান কর দেওয়া নিয়ে যেন তারা কোনো হয়রানির শিকার না হন।’
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে শীর্ষে থাকা ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এক নম্বরে আছে। এই সময়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে ধনাঢ্য ব্যক্তির সংখ্যা বেড়েছে। যে হারে ধনীর সংখ্যা বাড়ছে সে হারে আয়করদাতা বাড়েনি। আয়করের মধ্যে ৬০ শতাংশই আসে করপোরেট কর থেকে। অথচ বাংলাদেশে রাজস্ব আয়ের মূল অংশটি আসে ভ্যাটসহ বিভিন্ন অপ্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে, যার ফলে করের বোঝা বাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরেই।
২০১০-১১ অর্থবছরে ১৪ লাখ করদাতা কর দিয়েছেন, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৬ লাখে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু গত ১০ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বেশ অনেকটাই বেড়েছে। রাজস্ব বোর্ডের সবশেষ হিসাবমতে, দেশে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। অর্থাৎ টিআইএনধারীর প্রায় ৬২ শতাংশ রিটার্ন জমা দেন না।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, যারা রিটার্ন জমা দেন তাদের প্রায় ১০ শতাংশ শূন্য রিটার্ন জমা দেন, অর্থাৎ তারা কোনো কর দেন না। এ হিসাবে নিয়মিত করদাতার সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৪ লাখ হতে পারে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘নাগরিকরা কেন কর দেবেন? এর জবাব হচ্ছে রাষ্ট্র তাকে যে সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা এবং অধিকার দিয়ে থাকবে তার বিনিময়ে নাগরিকরা কর দেবেন। অনেক দেশেই করদাতা নাগরিকরা সম্মানিত হিসেবে গণ্য হন। তারা বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। কর আহরণ করার ভিত্তিতে রাষ্ট্রও নাগরিকদের সুবিধা ও সম্মান দিতে পারে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে বলতে গিয়ে আমি আমাদের দেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের একটি কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, দেশের চার লাখ পয়েন্ট থেকে কর আদায় করা হয় কিন্তু তার বিপরীতে সরকার পায় মাত্র চব্বিশ হাজার পয়েন্ট থেকে। এ থেকে বোঝা যায় সরকার কতটা বঞ্চিত হচ্ছে। এখন এই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সরকার চাইলেই এই কর আদায়ের বিষয়টি আরও স্বচ্ছ করতে পারে।’
