ইউক্রেনে দুই শহরে রাশিয়ার অস্ত্রবিরতি

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ০৫:৫৪ এএম

ইউক্রেনের সমুদ্র-তীরবর্তী শহর মারিওপোল ও ভোলনোভখার বেসামরিক লোকজনকে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করলেও রুশ সৈন্যরা তা পুরোপুরি মানছে না। মারিওপোলে এখনো তারা গোলাবর্ষণ করছে বলে গতকাল শনিবার অভিযোগ করেছেন শহরটির ডেপুটি মেয়র সেরহি ওরলভ। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় মারিওপোলের সিটি কাউন্সিল বলেছে, জাপোরিজিয়া অঞ্চলে লড়াই চলছে। অথচ কথা ছিল, মারিওপোল থেকে মানবিক করিডর ব্যবহার করে বেসামরিক লোকজনকে এই শহরে সরিয়ে নেওয়া হবে।

লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার পথ বরাবর ‘অস্থায়ী অস্ত্রবিরতি’ নিশ্চিত করতে রাশিয়ান পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মেয়র সেরহি ওরলভ বিবিসিকে বলেছেন, ‘রাশিয়ানরা আমাদের লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ এবং গোলাবারুদ নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। এটি একেবারে পাগলামি। মারিওপোলে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার পথজুড়েও যুদ্ধবিরতি দেখা যাচ্ছে না। আমাদের বেসামরিক লোকজন চলে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু গোলাগুলির মুখে তারা পালাতে পারছে না।’ মারিওপোলের একজন বাসিন্দা যিনি এই নগরীর কেন্দ্রে বসবাস করেন তিনি বিবিসিকে বলেছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শহরে এখনো গোলাগুলির শব্দ অব্যাহত রয়েছে। ৪৪ বছর বয়সী প্রকৌশলী আলেকজান্ডার বলেন, এই মুহূর্তে আমি মারিওপোলের সড়কে রয়েছি। আমি প্রতি তিন থেকে পাঁচ মিনিট অন্তর গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সবুজ করিডরটি একেবারে অর্থহীন। আমি এমন লোকজনের গাড়ি দেখতে পাচ্ছি, যারা পালানোর চেষ্টা করেছিল এবং তারা বর্তমানে শহরে ফিরে আসছে।’ বেসামরিক লোকদের সরতে মানবিক করিডর খুলেছে মস্কো। জানা গেছে, এ করিডর মাত্র পাঁচ ঘণ্টা খোলা থাকবে। মারিওপোল নগর কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে এই করিডর দিয়ে লোকজন সরানো। রাশিয়ার আরআইএ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বেসামরিক লোকজন মারিওপোল ত্যাগ করতে পারবে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার মধ্যে।

ন্যাটোতে নাখোশ ইউক্রেন এবার মস্কোর সঙ্গে তৃতীয় দফা বৈঠকে বসতে চাচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের একজন উপদেষ্টা গত শুক্রবার এসব কথা জানান। চলতি সপ্তাহেই বৈঠকের কথা বলেন তিনি। ইউক্রেনের পক্ষে গত দুই বৈঠকে অংশ নেওয়া ওই কর্মকর্তা বলেন, মস্কোর সামরিক আগ্রাসনের কারণে শুরু হওয়া লড়াই বন্ধে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৃতীয় দফা বৈঠকে বসার পরিকল্পনা করছে ইউক্রেন। কিয়েভ চলতি সপ্তাহেই রাশিয়ার সঙ্গে এই বৈঠকে বসতে চাচ্ছে বলেও জানান তিনি। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলিয়াক বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। কাল বা পরশু বৈঠক হতে পারে। তৃতীয় দফা বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ক্রেমলিন থেকে উত্তরের অপেক্ষায় আছে কিয়েভ।’

এদিকে লিথুয়ানিয়ায় সেনা মোতায়েন করছে জার্মানি। লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, লিথুয়ানিয়ায় বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মোতায়েন করবে জার্মানি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ট্যাঙ্কে সজ্জিত একটি সেনা ব্যাটালিয়ন পাঠাবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরভিডাস আনুসাসকাস বলেছেন, নেদারল্যান্ডস থেকেও আরও অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে। চলতি মাসে লিথুয়ানিয়ায় যে সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র এবং নেদারল্যান্ডসের এই সৈন্য সেই মহড়ার অংশ হিসেবে মোতায়েন করা হচ্ছে না। আনুসাসকাস বলেছেন, এখন পর্যন্ত লিথুয়ানিয়ায় ন্যাটো জোটের প্রায় ৩ হাজার সৈন্য রয়েছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত দেশটিতে বিদেশি সৈন্যসংখ্যা ৪ হাজারে পৌঁছাবে।

চলমান সংকটের মধ্যেই জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফের সঙ্গে ইউক্রেন ইস্যুতে আলোচনা করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। শনিবার টেলিফোনে দুই দেশের শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে আলাপ হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে এএফপি। রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, ওলাফের সঙ্গে ফোনালাপে ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযানে দেশটির রাজধানী কিয়েভ বা অন্য কোনো শহরের বেসামরিক এলাকায় রুশ বাহিনীর বোমাবর্ষণের সংবাদকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উল্লেখ করেছেন পুতিন। তিনি বলেছেন, রুশ সেনারা কিয়েভ বা অন্য কোনো শহরে বোমাবর্ষণ করেনি। এছাড়া বেলারুশে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে বৈঠক শুরু হয়েছে, সেটি ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলেও জার্মান চ্যান্সেলরকে জানিয়েছেন পুতিন। তবে এক্ষেত্রে কিয়েভকে অবশ্যই মস্কোর শর্তসমূহ পূরণের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। টেলিফোনে ওলাফকে পুতিন বলেন, কিয়েভ বরাবর মস্কোর শর্ত মূলত চারটি। এগুলো হলো একটি নিরপেক্ষ ও পরমাণু অস্ত্রমুক্ত দেশ হিসেবে ইউক্রেনের অবস্থান স্পষ্ট করা, দেশটি থেকে নাৎসিবাদ নির্মূল, ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় দুই ভূখণ্ড দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

প্রসঙ্গত, কয়েক বছর আগে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করে ইউক্রেন এবং তারপর থেকে এই ব্যাপারটিকে ঘিরে দ্বন্দ্ব শুরু হয় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। এর মধ্যে ন্যাটো ইউক্রেনকে পূর্ণ সদস্যপদ না দিলেও ‘সহযোগী দেশ’ হিসেবে মনোনীত করায় দ্বন্দ্বের তীব্রতা আরও বাড়ে। ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন প্রত্যাহারে ইউক্রেনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে গত দুই মাস রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে প্রায় দুই লাখ সেনা মোতায়েন রেখেছিল মস্কো। কিন্তু এই কৌশল কোনো কাজে আসেনি। উপরন্তু এই দু’মাসের প্রায় প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অভিযোগ করে গেছে; যেকোনো সময় ইউক্রেনে হামলা চালাতে পারে রুশ বাহিনী। অবশেষে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দুই ভূখণ্ড  দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় রাশিয়া; এবং তার দু’দিন পর ২৪ তারিখ ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।

গত ৯ দিনের রুশ অভিযানে ইউক্রেন থেকে পালিয়ে পাশের রাষ্ট্র পোল্যান্ড ও রুমানিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ লাখ ইউক্রেনীয়। এছাড়া শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে আছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত