জীবনানন্দমগ্ন এক আমেরিকান গবেষকের কথা

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ০৬:৫৩ এএম

বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র প্রভাববলয়ের বাইরের অন্যতম প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশের প্রয়াণের ছত্রিশ বছর পর তার জীবনীভিত্তিক যে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, সেটি নিছক জীবনীগ্রন্থ ছিল না, এমনকি রচিতও হয়নি বাংলা ভাষায়। বস্তুত কবির জীবন ও সাহিত্য উভয় বিষয় নিয়ে গবেষণাঋদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ বাংলাভাষায় নেই। অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট  শিরোনামে ইংরেজি ভাষায় রচিত মার্কিন গবেষক ও অধ্যাপক ক্লিন্টন বুথ সিলির সমৃদ্ধ এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এটি আমাদের জন্য কোনোভাবে সম্মান ও গৌরবের বিষয় নয়, বাংলার বিরলপ্রজ এই কবির ওপর একখানি প্রতিনিধিত্বশীল ও সুসমন্বিত গ্রন্থের জন্য আমাদের অপেক্ষা করে থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময়। সেটিও করেছেন একজন ভিনদেশি গবেষক। এমনকি নিবিড় গবেষণালব্ধ গ্রন্থটির একটি বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করারও কোনো উদ্যোগ উভয় বাংলার কোথাও নেওয়া হয়নি দীর্ঘদিন। তবে পরবর্তী সময়ে মূল ইংরেজি গ্রন্থটিকে কলকাতা থেকে মর্যাদাপূর্ণ আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত করে এই খামতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

জানা যায় বইটি আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার পর আনন্দ পাবলিশার্স এটির একটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশে আগ্রহ দেখিয়েছিল। বাদল বসু এবং উজ্জ্বল কুমার মজুমদারের সঙ্গে সংঘটিত আলাপের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্লিন্টন আশা প্রকাশ করেছিলেন যে সে বছরই কিংবা ২০০৭ সালের কলকাতা বইমেলায় বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হবে। ক্লিন্টনের একটি চিঠি থেকে বোঝা যায় ১৯৯৩ সাল থেকেই উভয় বাংলার একাধিক মহল তার কালজয়ী বইটি অনুবাদের আগ্রহ দেখালেও ২০১১ সালে অনন্য জীবনানন্দ  নামে ‘প্রথমা প্রকাশনী’র অনুবাদগ্রন্থটি প্রকাশের আগে পর্যন্ত সেটি ফলবতী হয়নি।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি আমেরিকান ‘পিস কর্পস’-এর সদস্য হিসেবে এদেশে আসার পরই বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষার সঙ্গে ক্লিন্টন সিলির প্রথম পরিচয় ঘটে। তার কর্মস্থল বরিশাল জেলা স্কুলে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন তিনি। তবে বরিশালে কয়েক বছর ছিলেন বলে একথা ভেবে নেওয়া ঠিক হবে না যে সেখানেই জীবনানন্দের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছিল। মূলত সিলির বরিশাল পর্বের এক দশক আগেই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন জীবনানন্দ। এমনকি জীবনানন্দের কোনো কর্মের সঙ্গেও বরিশালসূত্রে তার পরিচয় ঘটেনি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর এবং আইওয়াতে রাইটার্স ওয়ার্কশপের সতীর্থ কবি জ্যোতির্ময় দত্ত (বুদ্ধদেব বসুর জামাতা) সিলিকে ‘জীবনানন্দের শব্দ এবং রূপকল্পের বিস্ময়কর ভুবনের সাথে পরিচিত করান।’ অঙ্কুর সাহাকে ২০০৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (শারদীয় কবিসম্মেলন পত্রিকায় প্রকাশিত) ক্লিন্টন জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়ের কথা বলেন এভাবে:

জ্যোতি আমাকে জীবনানন্দের কবিতার সাথে পরিচিত করিয়েছিলেন। কোন কবিতাটি আমরা প্রথম পড়েছিলাম আমি মনে করতে পারছি না, বোধ হয় “আট বছর আগের একদিন” যেটিতে ছিল তাড়া করে ফেরা আত্মহত্যা, মানুষের রক্তের ভেতর খেলা করা “বিপন্ন বিস্ময়” এবং লাশকাটা ঘর। সেই শব্দগুচ্ছ, জানালা গলে আসা নিস্তব্ধতার চিত্রকল্প, সেই নিস্তব্ধতা উটের গ্রীবায় পরিণত হয়ে ঘাড় বাঁকা করে মাথা বাড়িয়ে দেয় জানালার ভেতর দিয়ে  কী এক চিত্রকল্প! তবে সেটা ছিল আরম্ভ মাত্র। কে এই লোক, কে লিখেছে কবিতার এই সব পঙ্ক্তি, এঁকেছে এই সব মানসিক চিত্রাবলী? জ্যোতি আমাকে তাঁর সম্পর্কে কিছু কিছু বলেছিলেন, তবে এ-ও বলেছিলেন যে আমার বাংলাপর্বের প্রথম দুবছর কাটানো শহর বরিশালের এই নির্জনতাকামী, মুখচোরা, লাজুক কবিটি সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়নি। তখনও মনে হতো এবং এখনও মনে হয়, তাঁকে এবং তাঁর কবিতা সম্পর্কে জানার প্রয়াসমূল্য আছে।  

বস্তুত সে সময় থেকেই বাংলার এই ‘নির্জনতম’ কবি তাকে বিমোহিত করেন। তার এই মুগ্ধতাই তাকে উদ্বুদ্ধ করে পিএইচডি গবেষণার বিষয় হিসেবে জীবনানন্দকে নির্বাচন করতে। ১৯৬৮ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতার ওপর মাস্টার্স সম্পন্ন করে গবেষণা শুরু করেন ক্লিন্টন। কলকাতা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও নানান প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ শেষে ১৯৭১ সালে তিনি শিকাগো ফিরে যান। তারপর দীর্ঘ পাঁচ বছরের পরিশ্রমের পর ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ডো ইন হিট : অ্যা ক্রিটিক্যাল বায়োগ্রাফি অব দ্য বেঙ্গলি পোয়েট জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯১৯৫৪)। উল্লেখ্য, ক্লিন্টন জীবনানন্দের বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় ব্যবহƒত ‘ঘাইহরিণী’ শব্দটির ইংরেজি করেছিলেন ‘ডো ইন হিট’। মূলত এই গবেষণালব্ধ ধারণা ও অভিজ্ঞানের ফসল হিসেবে রচিত হয় অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট গ্রন্থটি।

অনুবাদকর্ম যে শ্রমসাধ্য, সময়সাপেক্ষ এবং ক্লান্তিকর একটি কাজ, সেটি বিশ্বস্তভাবে যারা অনুবাদ করেন তাদের চেয়ে ভালোভাবে আর কেউ অনুভব করতে পারেন না। একজন অনুবাদ পাঠক যখন রেশমের মতো মসৃণ অনুবাদের ভেতর দিয়ে ভিনদেশি সাহিত্যের কোনো একটি সৃষ্টি উপভোগ করেন, তখন তার উপলব্ধাতীত থাকে ভাষান্তরের সময় মূল রচনার সঠিক বেদটি আয়ত্ত করার জন্য অনুবাদকের শ্রমঘন আয়াসের মাত্রাটুকু। ক্লিন্টন সিলি যখন মেঘনাদবধ কাব্য, কিংবা জীবনানন্দের কবিতাগুলো অনুবাদ করেন, উপলব্ধি করা যায় এই উভয় ধরনের অনুবাদকর্মের জন্য তাকে কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়েছে।

অনূদিত বইটির নামকরণ প্রসঙ্গে প্রথম থেকেই ক্লিন্টন তৎপর ছিলেন যাতে একটা যুৎসই শিরোনাম ঠিক করা হয় আর তাতে জীবনানন্দের অনন্যতা প্রতিফলিত হয়। এই অনুবাদককে লেখা এক দীর্ঘ চিঠিতে তিনি নামকরণ প্রসঙ্গে তার মনোভাব জানিয়ে রেখেছিলেন আগেভাগেই :

অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট এর বাংলা অনুবাদের শিরোনামের বিষয়টি আমার উল্লেখ করা দরকার। বইয়ের নাম ছাড়াও এটিকে আমি দুবার বইতে ব্যবহার করেছি এবং বইটির শেষ অধ্যায় শেষ হয়েছে এই তিনটি শব্দ দিয়ে। নামটি দিয়ে আমি দুটো বিষয় বোঝাতে চেয়েছি। প্রথমত, আমি চেয়েছি পাঠকরা ‘অ্যাপার্ট’ শব্দটা দিয়ে উপলব্ধি করুক যে এই অভিধায় চিহ্নিত কবি কিছুটা “অনন্য-সাধারণ”, সাধারণ নন, তিনি সাধারণদের চেয়ে ওপরে এবং তাদের থেকে দূরে, তিনি কবি হিসেবে পরিচিত শিল্পী শ্রেণির অন্যদের চেয়ে আলাদা এবং একই সঙ্গে শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয়ত, এটি দিয়ে নামটির অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং কাব্যিক অর্থ বহন করে, আমি বোঝাতে চাইছি যে এই বিশেষ কবি, জীবনানন্দ দাশ তার সমাজ থেকে স্বতন্ত্র এবং আলাদা। শব্দটি দিয়ে যারা তাকে সত্যিকারভাবে জানেন এবং যারা আমার বই পড়ার পর জানতে পারবেন তাদের এমন একজনের কথা বোঝানো হয়েছে যিনি লাজুক, সামাজিকভাবে বেমানান, কিছুটা নির্জনতাপ্রিয়, যিনি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে সাধারণ সামাজিক মেলামেশা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তার এই ‘অনন্যতা’ আংশিকভাবে প্রকৃতি এবং তার চারপাশের সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে এমন স্বতন্ত্র করে তুলেছে। এই ‘অনন্যতা’ তার স্বরূপের একটা প্রধান অংশ।

পরবর্তী সময়ে তিনি যে দুটি নাম প্রস্তাব করেছিলেন তার একটি ছিল ‘সাধারণ মানুষ, অসাধারণ কবি,’ যার সপক্ষে তিনি লেখেন, “আমি যে অর্থে আমার ইংরেজি বইতে ‘অ্যাপার্ট’ ব্যবহার করেছি, এখানে ‘অসাধারণ’ ব্যবহার করছি সে অর্থেই। জীবনানন্দ ছিলেন সাধারণ কবিদের চেয়ে আলাদা। তিনি একজন এক্সট্রাঅর্ডিনারি কবি।” এই নামকরণের মধ্য দিয়ে মানুষ জীবনানন্দকে কোনোভাবে খাটো করা হচ্ছে কি না সে ব্যাপারেও তার উদ্বেগ ছিল। আরেক চিঠিতে তিনি লেখেন, “আপনি আমাকে বলুন জীবনানন্দকে ‘সাধারণ মানুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা কোনোভাবে অশোভন হবে কি না, আমি অশোভন হতে চাই না নিশ্চয়ই। আমি শুধু বোঝাতে চাই যে তিনি কবিতা রচনার অনন্যসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন বহু বিবেচনায় একজন সাধারণ বাঙালি ভদ্রলোক।” ক্লিন্টনের এক্সট্রাঅর্ডিনারি তথা অনন্যসাধারণ বিশেষণ থেকে ‘অনন্য’ শব্দটি নিয়ে গ্রন্থটির নামকরণের প্রস্তাব করলে অনন্য জীবনানন্দ  নামটিই মূল লেখক ও প্রকাশকের নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভ করে চূড়ান্ত হয়ে যায়। 

জীবনানন্দের প্রতি এমন মমত্ব এবং তাকে বোঝার ও বোঝানোর এমন প্রয়াস যেকোনো জীবনানন্দপ্রেমী মানুষকেই বিস্মিত করবে। ক্লিন্টনের এই হৃদয়মথিত একাত্মতার কারণেই তিনি বইটি অনুবাদের সময় নজর রেখেছেন প্রত্যেকটি শব্দের ওপর। আক্ষরিক অর্থেই প্রতিটি শব্দের ওপর ছিল তার সতর্ক দৃষ্টি, যাতে একটি শব্দও অযথার্থভাবে অনূদিত না হয় কিংবা তার মূল বক্তব্যকে ভিন্নগামী না করে। বইটির অজস্র বাক্যের বিন্যাস নিয়ে তিনি মত প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন, অনুবাদের সময় ভুলক্রমে ছেড়ে যাওয়া বহু শব্দ তিনি তুলে দিয়েছেন সংশোধিত বাক্যের ভেতর। তার এই যত্ন ও নজরদারির প্রমাণ পাওয়া যায় তার সঙ্গে বিনিময় হওয়া একাধিক পত্রে। যেমন, হিন্দুদের গোত্রপ্রথা বোঝানোর জন্য ইংরেজিতে যে কাস্ট cast) শব্দটি ব্যবহৃত হয় তার বাংলা ‘গোত্র’, ‘বর্ণ’, ‘জাতি’ নাকি ‘জাত’ হবে এ-নিয়ে তার সঙ্গে এই অনুবাদকের পত্রবিতর্ক চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। অনুবাদে ‘গোত্র’ বা ‘বর্ণ’ ব্যবহার না করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি কলকাতা থেকে তিনজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মতামত জোগাড় করেন, এদের একজন ব্রাহ্মণ, একজন বৈদ্য এবং একজন ক্ষত্রিয়।

শেষাবধি ‘জাত’ শব্দটিকেই অনুবাদককে মেনে নিতে হয়েছিল এবং সেটিই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। আরও কিছু শব্দের বিষয়ে এই অনুবাদকের সঙ্গে তার মতবিরোধ ঘটেছে, তার কিছু তিনি মেনে নিয়েছেন, কিছু অনুবাদক। কিছু বাংলা শব্দ তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল বিধায় সেগুলোর যথার্থতা সম্পর্কে তিনি সন্দেহমুক্ত ছিলেন না। যেমন ‘ক্যাম্পে’ কবিতার আলোচনায় তিনি লিখেছেন  ‘She solicits for a destructive force,...’ যার বাংলা করা হয় ‘হরিণী একটা ধ্বংসাত্মক শক্তির পক্ষে ওকালতি করে , ...।’ ক্লিন্টন এই ‘ওকালতি’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি তুলে বসেন, তার ধারণায় ওকালতি কোর্ট-কাছারির সঙ্গে সম্পর্কিত একটা পেশা। তখন তাকে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কাব্যের মুক্তি’ প্রবন্ধ থেকে ‘তিনি যত পতিতের তরে ওকালতি করেছেন, তাদের প্রত্যেকের পদস্খলন ঘটেছিল, হয় অনিচ্ছায়, নয় দৈব দুর্বিপাকে’ বাক্যটি উদ্ধৃত করে দেখালে তিনি নির্বিবাদে সেটা মেনে নিয়েছিলেন। তার অপরিচিত আরও কয়েকটি শব্দ সম্পর্কে সংশয় ছিল তার, যেমন, ‘পারঙ্গমতা’, ‘পিতৃসুলভ’, ‘ব্যাখ্যাতীত’, ‘ইতিবাচক’ ইত্যাদি। এ শব্দগুলো সম্পর্কে তার ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়ার পর তিনি লেখেন, ‘... ‘ওকালতি’ ইত্যাদি সম্পর্কে আপনার তথ্যের জন্য ধন্যবাদ। অনুবাদ যে একটি সূক্ষ্ম কাজ, আপনার এই কথাটি সঠিক। আপনার কাজ যত দেখছি, ততই আমার প্রত্যয় হচ্ছে যে আপনি একজন আদর্শ অনুবাদক  সতর্ক,...।’  

বইয়ের প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে তার তুলনারহিত মনোযোগ এবং বিশ্বস্ততার প্রমাণ রেখেছেন তিনি তার পর্যবেক্ষণলব্ধ দীর্ঘ মন্তব্য সংবলিত চিঠিপত্রে। যেমন  বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে তিনি বরিশালকে রেললাইনবিহীন একমাত্র জেলা বলে উল্লেখ করেন। সেই তথ্যটি যে এখন আর প্রযোজ্য নয় সে সম্পর্কে একটা সংশোধনী টিকা সংযোজনের প্রস্তাব দিলে তিনি দীর্ঘ মন্তব্যে জানান, রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুরের পুকুরিয়া পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার রেললাইন চালু করার পরিকল্পনা আছে বাংলাদেশ রেলওয়ের, যাতে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু নির্মাণের পর ২০১৪ সাল নাগাদ বরিশালকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এরকম তথ্য আমাদের অনেকেরই জানা ছিল না, অথচ তিনি বরিশাল বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে এই তথ্যও জোগাড় করে ফেলেছেন। এ রকম বিভিন্ন বিষয়ে তার গভীর অনুসন্ধিৎসু মনোভাবের প্রকাশ দেখিয়েছেন তিনি।

ক্লিন্টনের সংগৃহীত তথ্যগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা কল্পনাও করতে পারি না ১৯৬৯-৭০ সালে জীবনানন্দের পৈতৃক আবাস বরিশাল এবং পরবর্তী সময়ের কর্মস্থল কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে কী অমানুষিক পরিশ্রম এবং নিদারুণ যতেœ তিনি জোগাড় করেছিলেন কবির জীবন সম্পর্কে বহু দুর্লভ তথ্য ও দলিল। ১৯৪৬ সালে জীবনানন্দের সবেতন ছুটি মঞ্জুর করার জন্য বিএম কলেজ কাউন্সিলের সভায় যে সিদ্ধান্ত হয়, বরিশাল গিয়ে সে সভার কার্যবিবরণী তিনি সংগ্রহ করেন প্রায় চব্বিশ বছর পর। কিংবা জীবনানন্দের বাড়িভাড়া এবং কথিত মামলা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার জন্য কলকাতার রেন্ট কন্ট্রোল অফিসের মতো জায়গায় গিয়ে ঘেঁটে দেখেন প্রায় ১৮ বছরের পুরনো দলিলপত্র। সেসব দিনে এখনকার মতো তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ ঘটেনি, উদ্ভব ঘটেনি যোগাযোগ প্রযুক্তির এতসব মাধ্যমের। এসব আয়াসসাধ্য কাজ একজন অভিসন্দর্ভ প্রস্তুতকারী বিদেশি গবেষকের নিষ্ঠাপ্রসূত নয় কেবল, এগুলোর পেছনে আছে আত্মমগ্ন নিভৃতচারী এক কবির প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও আগ্রহ। সেই নিষ্ঠা ও মমতার কারণেই একজন বিদেশি হয়েও তিনিই রচনা করেছিলেন জীবনানন্দের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক জীবনী, উভয়বাংলা থেকে যার সমতুল্য গ্রন্থ বোধকরি আর একটিও প্রকাশিত হয়নি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। ‘অনন্য জীবনানন্দ’ শিরোনামে ক্লিনটন বি সিলি রচিত ‘অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট’ গ্রন্থের অনুবাদক।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত