ঐতিহাসিক সাতই মার্চের সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়েছে ফেলে আসা ২০২১ সালে। একইসঙ্গে আমরা পার হচ্ছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ মুজিববর্ষ। আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ উদযাপন চলবে। স্মরণ করা যেতে পারে, একাত্তরের অগ্নিঝরা উত্তাল মার্চে রাজধানী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিপিয়াসী বাঙালির বৃহত্তম জনসভার প্রচারপত্রে শুধু লেখা ছিল ‘আগামীকাল ৭ই মার্চ (রবিবার) বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে গণ-সমাবেশ/বক্তৃতা করিবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালে অতি সংক্ষিপ্ত এই প্রচারপত্রের মাহাত্ম্য বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। আসলে আর কিছু লেখার কোনো প্রয়োজনও ছিল না। পুরো দেশ তখন অধীর অপেক্ষায় ছিল তার মুখের কথা, তার সিদ্ধান্ত, তার ঘোষণা শোনার জন্যই। বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম আর মুক্তিসংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এতটাই একাত্ম হয়ে উঠেছিল। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামকে স্বাধিকারের সংগ্রামে, জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপান্তর করেছিলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতায় পরিণত হওয়ার পথ মসৃণ ছিল না। অধিকার সচেতন এক প্রতিবাদী কিশোর থেকে তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তুলে, কঠোর ত্যাগ-তিতিক্ষায় আত্মোৎসর্গ করেছিলেন তিনি। আটচল্লিশ-বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও কারাগারের পাঠ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই যে বছর বাংলার মানুষ তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে আপন করে নিয়েছিল, সেই বছরই বঙ্গবন্ধু এক বিশাল জনসভায় ‘পূর্ব বাংলার’ নামকরণ করেছিলেন ‘বাংলাদেশ’। এই দীর্ঘ যাত্রার মধ্য দিয়েই একাত্তরের সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ‘ইউনেসকো’। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে ৭ মার্চের ভাষণ। একাত্তরে বিশ^গণমাধ্যম যেমন বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ আখ্যা দিয়েছিল, তেমনি আজকের দুনিয়ার অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক-গবেষকই বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণকে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে অভিহিত করছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাতই মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণ দিয়েছিলেন ঢাকার রেসকোর্সের ময়দানে। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দিনে ১৬ ডিসেম্বর বিকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলও স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই রেসকোর্সের ময়দানেই। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি কারামুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে বঙ্গবন্ধু আবারও জনতার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, অশ্রুসিক্ত নয়নে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন এই রেসকোর্সের ময়দানেই। স্বাধীনতার আগে আরও দুই ঐতিহাসিক ঘটনাও ঘটেছে রেসকোর্সেই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত লাখো জনতার সংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল এই রেসকোর্সের ময়দানেই। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যরা প্রকাশ্য জনসভায় শপথ গ্রহণ করেছিলেন এই রেসকোর্সের ময়দানেই। রমনার এই ময়দানেই এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীনতা জাদুঘর ও স্বাধীনতা স্তম্ভ। এখানেই স্থাপিত হয়েছে শিখা চিরন্তন। এই ময়দান তাই বাংলাদেশের ময়দান, বঙ্গবন্ধুর ময়দান।
আজ ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ স্মরণ করা উচিত স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে বর্তমানের রাজনীতি ও রাষ্ট্রকে মিলিয়ে দেখার জন্য। ভুলে গেলে চলবে না, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং শোষণ-বঞ্চনার অবসান। তিনি যেভাবে বাঙালিকে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রামে সংগঠিত করেছিলেন আর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুর সেই চেতনা সেই নীতি ও আদর্শ স্বাধীন বাংলাদেশে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি সাতই মার্চের ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, সংখ্যায় সে যদি একজনও হয়, আমরা তার কথা মেনে নেব’। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক ন্যায্যতা আছে কি? মনে রাখা দরকার, কেবল মুখের কথাতেই নয়, নীতি আদর্শের সত্যিকার চর্চায় অবিচল আস্থা থাকলেই যে কেবল রাজনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বঙ্গবন্ধুর জীবন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জনগণের জন্য বৈষম্যমুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে না পারলে বঙ্গবন্ধু এবং সাতই মার্চের ভাষণ স্মরণ করা কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে। তাই আজকের দিনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
