নিষেধাজ্ঞার সময়ে রুশদের জীবনযাত্রা

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ১১:২২ পিএম

রাশিয়ার হামলার কারণে ভয়াবহ সময় পার করছে ইউক্রেনের মানুষ। ভালো নেই হামলাকারী রাশিয়ার সাধারণ মানুষও। পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এরই মধ্যে রুশদের অর্থনৈতিক সংকটে ফেলেছে। যুদ্ধসৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট থেকে কি বের হতে পারবেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন? ধরে রাখতে পারবেন জনপ্রিয়তা? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

সংকটের শুরু

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২৪ ফেব্রুয়ারি তার সামরিক বাহিনীকে প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে হামলার নির্দেশ দেন। তার এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ পশ্চিমা বিশ্ব কয়েক দিন পর রাশিয়ার ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ইউক্রেনের সাধারণ জনগণের ওপর হামলা বন্ধের দাবি জানালেও সেসবে কর্ণপাত করেননি যুদ্ধবাজ পুতিন। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করে ক্ষান্ত হননি, এখন পুরো দেশটিই নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চান তিনি। রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে প্রায় ১৫ লাখ সেনা রয়েছে, যা ইউক্রেনের তুলনায় পাঁচ গুণ। এ ছাড়া রাশিয়ার হাতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র। প্রতিরক্ষা বাজেটে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে রুশ সরকার। অসীম শক্তিধর এই পরাশক্তির হামলায় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন। তবে শুধু দেশটিকেই যে যুদ্ধের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তা নয়। যুদ্ধ শুরুর পরপরই এর ফল ভুগতে হচ্ছে খোদ রাশিয়ার জনগণকেও।

অপ্রত্যাশিত নিষেধাজ্ঞা

ইউক্রেনে হামলার কারণে রাশিয়ার ওপর যে এত দ্রুত ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে, তা ভাবেননি দেশটির রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদরা। রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এবারের নিষেধাজ্ঞাগুলোকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখছেন সার্গেই আলেকসাশেঙ্কো, সার্গেই গুরিয়েভসহ দেশটির শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষেধাজ্ঞা দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে। ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনের উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করে, সে সময়ও পশ্চিমা বিশ্ব মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। রাশিয়ার জিডিপির প্রবৃদ্ধি ওই বছর এক শতাংশ কমে যায়। শুধু এটি ছাড়া সে সময় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতিতে তেমন কোনো গুরুতর প্রভাবই ফেলতে পারেনি। তবে এবার বিষয়টি ভিন্ন। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পরই রাশিয়ার জনগণকে এটিএম বুথ থেকে অর্থ তোলার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে পশ্চিমাদের আওতায় থাকা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ স্থানান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপ ছিল অপ্রত্যাশিত। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যম সুইফট থেকে রাশিয়ার বেশির ভাগ ব্যাংককে বাদ দেওয়া হয়। প্রতিদিন ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয় সুইফটের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এসব কঠোর নিষেধাজ্ঞার অর্থ, রাশিয়ার লোকজন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি ব্যাংকে যে অর্থ রয়েছে, তা তারা তুলতে পারবেন না। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটির জনগণকে বারবার আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করছে এই বলে, অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ব্যবস্থা করবে জাতীয় ব্যাংক। আর রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ড দেশটির ভেতরে কাজ করবে। রুবলকে বাঁচাতে ২৮ ফেব্রুয়ারি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন দেশের বাইরে অর্থ না পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের তাদের আয়ের ৮০ শতাংশ অবশ্যই রুবলে রূপান্তর করতে বলা হয়। এদিকে দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদের হার ৯.৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করে। এই উদ্যোগ রুবলের দর স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে সুদের এই হার ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচকে আরও বাড়িয়ে তুলবে, যা ভয়াবহ মন্দার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

যুদ্ধের প্রভাব

ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার খবর শুনে এটিএম বুথে ছুটে যান রুশ জনগণ। জাতীয় মুদ্রা রুবলের দরের আরও পতন হতে পারে এই আশঙ্কায় রুবলের পরিবর্তে অন্যান্য বিদেশি মুদ্রা সংরক্ষণের প্রবণতা বেড়ে যায়। রুবলের দর বাড়াতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব চেষ্টাই করছে। রুবলের দরপতন রাশিয়ার আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশটির মূল্যস্ফীতি (৮.৭ শতাংশ) ইউক্রেনে হামলা চালানোর আগে থেকেই বেশি ছিল। গত বছর বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে প্রধান কয়েকটি খাদ্যের ওপর রপ্তানি শুল্ক আরোপ করে রাশিয়া সরকার। গত বছরের জুলাই মাসের এক জরিপে বলা হয়, ৭৫ শতাংশ রুশ তাদের আয়ের অর্ধেক বা তারও বেশি খাদ্যের পেছনে ব্যয় করছেন। আগে থেকে সংকটে থাকা রাশিয়ার মানুষ যুদ্ধের কারণে আরও গভীর সংকটে পড়েছেন। ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের মূল্য আরও বেড়ে গেছে। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে রাশিয়ার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

অবশ্য আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে রাশিয়াকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। দেশটির নির্দিষ্ট যেসব ব্যাংক তেল ও গ্যাস রপ্তানির লেনদেন করে, তাদের ওই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয় যাতে ইউরোপের জ্বালানি ভোক্তাদের চাহিদার ঘাটতি না হয়। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে শুধু এই দুদেশেই নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক তেলের মূল্য এখন ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি। ২০১৪ সালের পর এমনটা দেখা যায়নি। রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আমদানি ব্যাহত হওয়ায় গমসহ অন্যান্য খাদ্যশস্যের মূল্যও বাড়তির দিকে। এই দুদেশ বিশ্বের খাদ্যশস্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রপ্তানি করে। তেল ও গ্যাসের বর্তমান উচ্চমূল্যে রাশিয়ার রপ্তানিকারকরা লাভবান হলেও দেশটির সাধারণ ভোক্তার পাশাপাশি সারা বিশ্বের ভোক্তাদের আগামী কয়েক মাস জ্বালানি ও খাদ্যের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

স্টকের পতন ঠেকাতে শেয়ারবাজার ৫ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় রাশিয়া সরকার। গত সপ্তাহে রুশ নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেন, শেয়ারবাজারে পতন ঠেকাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে দেশীয় স্টককে সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারও আটকে রাখা হয়। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব রাশিয়ার শেয়ারবাজারের পাশাপাশি লন্ডনের শেয়ারবাজারেও পড়ে। সেখানে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমসহ বড় বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দর পড়ে যায় অবিশ্বাস্য গতিতে। ইউরোপের অনেক দেশ গ্যাজপ্রমের সঙ্গে চুক্তি স্থগিতের কথা ভাবছে। ব্রিটিশ তেল ও গ্যাস কোম্পানি শেল এরই মধ্যে গ্যাজপ্রমের সঙ্গে চুক্তি স্থগিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাজ্যের আরেক তেল ও গ্যাস কোম্পানি বিপি রাশিয়ার অন্য একটি কোম্পানি থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কথা জানায়। রাশিয়ায় আগামী কয়েক মাস নতুন করে বাইরের পুঁজি ঢুকবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির অর্থনীতিবিদরা।

রাশিয়ার অর্থনীতি প্রকৃত অর্থেই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, যুদ্ধ চলাকালে চীন রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেবে। তবে রাশিয়ার ওপর একের পর এক পশ্চিমাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় চীন কতটা মস্কোর পাশে দাঁড়াবে, দেশটির অর্থনীতি গতিশীল রাখতে আদৌ ভূমিকা রাখবে কি না সেই সংশয় দেখা দিয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করে রাশিয়া। এটি রাশিয়ার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। যুদ্ধ চলাকালে নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব দিতে রাশিয়া সরকার ইউরোপকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, না কি ইউরোপ নিজে থেকেই রাশিয়াকে আরও কোণঠাসা করতে গ্যাস নেওয়া বন্ধ করে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ইউরোপ রাশিয়ার কাছ থেকে গ্যাস নেওয়া বন্ধ করলে সে ক্ষেত্রে বিকল্প সরবরাহ আসবে কোন দেশ থেকে, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছে পরিষ্কার কোনো উত্তর নেই। আবার ইউরোপের কাছে জ্বালানি বিক্রি না করলে যুদ্ধের যাবতীয় খরচই বা রাশিয়া কোথা থেকে জোগান দেবে, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। তেল ও গ্যাস বিক্রি করে রাশিয়া প্রতি বছর যে অর্থ উপার্জন করে, তা দেশটির রাজস্ব ব্যয়ের বড় জোগানদাতা। তাই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব হিসেবে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা রাশিয়ার জন্য আত্মঘাতী হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক অভিযানের সময় দেখা গেছে, সামরিক আগ্রাসনে দিনে গড়ে প্রতি সেনার জন্য প্রায় এক হাজার ডলার খরচ হয়। ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাদের যত বেশি দিন অবস্থান করতে হবে, দেশটির সামরিক ব্যয় তত বাড়বে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ জোগান দিতে স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়ার জনগণের দুর্দশা আরও বাড়বে বৈ কমবে না।

হুমকিতে প্রযুক্তি, ওষুধ

দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় মাইক্রোচিপের সর্বশেষ জেনারেশন তৈরি করা রাশিয়ার পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণে প্রযুক্তির মৌলিক উপাদানের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল রাশিয়া। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি দেশগুলো রাশিয়ায় প্রযুক্তি রপ্তানি করতে পারছে না। বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ মাইক্রোচিপ তৈরি করে তাইওয়ান। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞায় সংহতি জানায় দেশটি। একই সঙ্গে রাশিয়ায় কোনো ধরনের প্রযুক্তি সরবরাহ করবে না বলেও জানায় তাইওয়ান সরকার। এর অর্থ হচ্ছে, আগামীতে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অটোমোবাইলসহ নানা ধরনের পণ্যসামগ্রী রাশিয়ার দোকানে পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া রাশিয়া প্রায় ৬৬ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করে। এই আমদানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে কি না, তা পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চোরাইপথে পণ্য আমদানি করে নিষেধাজ্ঞা এড়ানো যায়, যদিও এই পন্থায় ঝুঁকি থাকে, দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যায় না। তা ছাড়া চোরাইপথে লেনদেনকারীদের ধরতেও সিদ্ধহস্ত যুক্তরাষ্ট্র।

কী বলছেন রুশরা

নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে নগদ অর্থের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বা অর্থ পেতে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে এসব আশঙ্কায় গত সপ্তাহে এক এটিএম বুথ থেকে আরেক এটিএম বুথে ছোটেন রুশরা। গত সপ্তাহে সাপ্তাহিক ছুটি শেষে সোমবার সঞ্চয় ভাঙতে ব্যাংকে ভিড় করেন রুশরা। এ ছাড়া ডলার কেনার জন্যও দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ায় অনেকে। এক ব্যাংকের সামনে লাইনে দাঁড়ানো ৩২ বছর বয়সী আলেক্সেই প্রেসনিয়াকভ বলেন, ‘শুনেছি, ব্যাংকের কাছে ডলার রয়েছে। তাই আমি এখানে এসেছি। গতকাল ডলারের দাম ছিল ৮০ রুবল। আর আজ সেটি ১০০ অথবা ১৫০।’ কয়েক মিনিটের মধ্যে ওই ব্যাংক থেকে জানানো হয়, তাদের ডলার শেষ হয়ে গেছে। ওই দিন প্রেসনিয়াকভের মতো আরও অনেক রুশ হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন। নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে রাশিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংকে সেবা দেওয়া বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পেমেন্ট পরিষেবা ভিসা ও মাস্টারকার্ড। ওই ব্যাংকগুলো থেকে ইস্যু করা ভিসা বা মাস্টারকার্ড দিয়ে অন্য দেশে লেনদেন করা যাচ্ছে না। রাশিয়ার মাঝারি আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন স্বত্বাধিকারী জানান, ইউক্রেনে আগ্রাসন ও তার পরে আন্তর্জাতিক মহলে রাশিয়াকে একঘরে করে দেওয়ার কারণে রাতারাতি তাদের ব্যবসা লোকসান গুনছে। বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের এক স্বত্বাধিকারী বলেন, ‘চলমান সংকট আগে কখনো দেখিনি আমি। মনে হচ্ছে, এমন এক বিমানে চড়ে বসেছি, যাতে কোনো ইঞ্জিন নেই বা বিমানটিতে আগুন লেগেছে। আমার প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন মানুষ কাজ করে। তাদের আমাকে জানাতে হয়েছে, স্ত্রী, দুই সন্তানসহ আর্মেনিয়া চলে যেতে হচ্ছে আমাকে।’ ওই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান পেপসি, ফক্সওয়াগনের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে। চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে বিশাল অঙ্কের মুনাফা কামায় তার প্রতিষ্ঠানটি, যা ছিল রেকর্ড। তবে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক ওইসব ব্র্যান্ড রাশিয়ার বাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। খাদ্য, পানীয় ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আরেক রুশ ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভবিষ্যৎ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেছে। পুতিন কী করতে চাইছেন বা আগামীতে কী করবেন, এ নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। শুধু আমার কেন, ব্যবসা সম্প্রদায়ের কারোরই নেই। সবাই বেশ বিষণœ। করোনা মহামারীসৃষ্ট সংকট থেকে মাত্র বের হতে শুরু করেছি আমরা। এরই মধ্যে যুদ্ধ এসে পড়ল। ব্যবসা-বাণিজ্যে করোনার ভয়াবহ প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়েছি আমরা কিন্তু এখন টানেলের শেষে কোনো আলো দেখছি না আমি। শান্তি অর্জিত হলেও বা কী হবে? ক্ষতি যা হওয়ার, তা তো হয়েছেই। কীভাবে আমরা ক্ষতি পুষিয়ে নেব?’

যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিকভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রাশিয়ার মানুষদের। ইউক্রেনে হামলার সমর্থন যারা করেন, তারা তা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার দায় অতীতে পশ্চিমা বিশ্বের ওপর চাপান পুতিন। তবে এবার সেই একই অজুহাত দিলে যে চিড়া ভিজবে না, তা বলাই বাহুল্য। করোনাভাইরাস মহামারী গত দুই বছর বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রুশরাও। মহামারী থেকে সবে মুক্ত হওয়া শুরু করেছে মানুষ। এমন অবস্থায় যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির পক্ষে নেই রাশিয়ার বেশির ভাগ মানুষ। যুদ্ধের উন্মাদনা আর জাতীয়তাবাদ আর যাই হোক, ক্ষুধার যন্ত্রণা মেটাতে পারে না। যুদ্ধের আগে দেশে পুতিনের জনপ্রিয়তা ব্যাপক বাড়লেও পশ্চিমাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনৈতিক সংকটে পড়া রুশরা তার প্রতি সমর্থন জারি রাখবেন কি না তা সময়ই বলে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত