বইমেলায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বাড়ছে। প্রকাশও হচ্ছে নতুন গবেষণাগ্রন্থ। বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালের মেলায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ১০৪টি বই প্রকাশ হয়েছিল। এর আগের বছর ৯১টি। ২০১৭ সালে ৯৭টি, ২০১৬ সালে ১০১টি, ২০১৫ সালে ৫৩টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের মেলায় গত রবিবার পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই প্রকাশ হয়েছে ৭৩টি।
প্রকাশকরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন পা-ুলিপির সংকট রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণাধর্মী পা-ুলিপির জন্য হাতেগোনা কয়েকজন গবেষকের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হয়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি মানসম্পন্ন বই প্রকাশ হয়েছে। প্রতি বছরই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ হচ্ছে, যেখানে উঠে আসছে বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যার নানা তথ্য।
এবারের মেলায় কথাপ্রকাশ এনেছে ‘মুক্তিসংগ্রামে আওয়ামী লীগের দালিলিক ইতিহাস’, ড. মোহাম্মদ হান্নানের ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর : শত ঘটনার শত কাহিনী’। কথাপ্রকাশ প্যাভিলিয়নের ব্যবস্থাপক ইউনুস আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তরুণদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই খুঁজতে আসেন। আমাদের প্যাভিলিয়নে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কয়েকটি বই রয়েছে, সেগুলো ভালো বিক্রিও হচ্ছে।’
মেলায় সুবর্ণ প্রকাশনীর স্টলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক ইতিহাস নিয়ে রচিত বই। যেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জসহ দেশের অনেক জেলার বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লেখা বই রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক জয়দুল হোসেন বলেন, ‘এ ধরনের কাজ অনেক সময় নিয়ে করতে হয়। পাশাপাশি আর্থিক বিনিয়োগেরও প্রয়োজন হয়। মূলত মতাদর্শিক তাগিদ থেকেই এই গবেষণার কাজ করে যাচ্ছি। আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা তেমন নেই।’
তাম্রলিপি প্রকাশনী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে বিভিন্ন জেলার মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস নিয়ে ধারাবাহিক বই। এছাড়া জুঁই প্রকাশন এনেছে সেলিনা হোসেনের মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প, আনোয়ারা সৈয়দ হকের মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প, আগামী এনেছে ননী গোপাল সরকারের ‘১৯৭১ শরণার্থী জীবনের স্মৃতি’।
তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে মানসম্পন্ন বই প্রকাশের বিষয়টিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশিষ্টজনদের। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ তো মহাকাব্য। সঠিক গবেষণার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে হবে। এজন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে আরও সতর্ক থাকা উচিত। এই প্রজন্মের তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার আগ্রহ বেড়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের বিক্রিও বেড়েছে বলে জেনেছি, এটা ইতিবাচক দিক।’
শিশু-কিশোর চিত্রপ্রদর্শনী : ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উদযাপন উপলক্ষে গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় বাংলা একাডেমির ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবনের ভাস্কর নভেরা প্রদর্শনী কক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক শিশু-কিশোর চিত্রপ্রদর্শনী, ২০২২ উদ্বোধন করা হয়। প্রদর্শনীতে প্রধানত ২০০৮-২০ সাল পর্যন্ত অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রাবলি স্থান পায়। উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। ৭-১৭ মার্চ পর্যন্ত বইমেলা চলাকালে প্রদর্শনী খোলা থাকবে।
গতকাল সোমবার ছিল বইমেলার ২১তম দিন। মেলা চলে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন নতুন বই এসেছে ৬৭টি।
মূলমঞ্চ : বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্মরণে হয় ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বহুমাত্রিক পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মো. নজরুল ইসলাম খান ও মনজুরুল আহসান বুলবুল। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।
আজ বইমেলার আয়োজন : আজ মঙ্গলবার বইমেলার ২২তম দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে হবে ‘সংগীত ও কবিতায় একুশের চেতনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সাইম রানা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ফেরদৌস হোসেন ভূঁইয়া, এ এফ এম হায়াতুল্লাহ ও মুস্তাফিজ শফি। সভাপতিত্ব করবেন নিরঞ্জন অধিকারী। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
