পরিচর্যা খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি চাকরির সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। আজ মঙ্গলবার বিশ্ব নারী দিবস সামনে রেখে গতকাল সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।
এতে বলা হয়েছে, পরিচর্যা খাতের পরিষেবা ও নীতিগুলোর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা লাখ লাখ কর্মীকে পর্যাপ্ত সুরক্ষার পরিবর্তে পারিবারিক দায়িত্বে আবদ্ধ রাখছে। তবে বিনিয়োগের মাধ্যমে এ খাতের চাহিদা পূরণ করা গেলে যে কর্মস্থান হবে, তাতে পরিচর্যা খাতে ধারাবাহিকতা আসবে। দারিদ্র্য দূরের মাধ্যমে লিঙ্গসমতায় উৎসাহিত ও শিশু-বয়স্কদের যত্নে সহায়তা করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রজনন বয়সের প্রতি ১০ নারীর মধ্যে তিনজনের (প্রায় ৬৫ কোটি) অপর্যাপ্ত মাতৃত্ব সুরক্ষা রয়েছে, যা আইএলওর মাতৃত্ব সুরক্ষা কনভেনশন-২০০০-এর মূল প্রয়োজনগুলো পূরণ করে না। এ কনভেনশনে নারীর জন্য সামাজিক বীমা বা সরকারি তহবিলের অর্থায়নে ন্যূনতম ১৪ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির সঙ্গে দুই-তৃতীয়াংশ বেতন বাধ্যতামূলক রয়েছে।
আইএলও বলছে, সমীক্ষায় দেখা গেছে মাতৃত্বকালীন ছুটি বা মাতৃত্ব সুরক্ষা সর্বজনীন মানব ও শ্রম অধিকার হলেও ১৮৫টি দেশের মধ্যে ৮২টি তা পূরণ করেনি। এসব নীতি সংস্কারের গতি ত্বরান্বিত না হলে দেশগুলোতে ন্যূনতম মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকার অর্জনে আরও ৪৬ বছর লেগে যাবে, যা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে বিঘ্ন ঘটাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপের আওতাধীন দেশগুলোতে প্রাথমিক প্রজনন বয়সী ১২০ কোটির বেশি পুরুষের পিতৃত্বকালীন ছুটির অধিকার নেই। যদিও এটি মা-বাবা উভয়ের কাজ এবং পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করে। যেসব দেশে এ সুযোগ রয়েছে, সেখানেও পিতৃত্বকালীন ছুটি মাত্র ৯ দিন, যা লিঙ্গভিত্তিক ছুটির ব্যবধান স্পষ্ট করে।
‘দ্য কেয়ার অ্যাট ওয়ার্ক : ইনভেস্টিং ইন কেয়ার রিভ অ্যান্ড সার্ভিস ফর এ মোর জেন্ডার ইক্যুয়াল ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জরিপের আওতায় আসা দেশগুলোর মধ্যে মাত্র ৪০টিতে গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নারীরা আইএলও মান অনুসারে সুরক্ষা পান। ৫৩টি দেশ প্রসবপূর্ব চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেতন না কেটে ছুটি পান। তবে অনেক দেশেই খণ্ডকালীন ছুটি, চাকরি, আয়ের নিরাপত্তা ও স্তন্যদানের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে।
আয়ু বৃদ্ধি ও করোনা মহামারীর প্রভাবে বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি সেবা-পরিষেবার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে অনেক দেশের আবাসিক পরিচর্যা কেন্দ্র, কমিউনিটি ডে কেয়ার সার্ভিস ও ইন-হোম কেয়ারের মতো পরিষেবা প্রয়োজন থাকলেও তা গ্রহণের সামর্থ্য জনগোষ্ঠীর নেই।
আইএলও বলছে, সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করেই পরিচর্যানীতির একটি রূপান্তরমূলক প্যাকেজে ‘শক্তিশালী বিনিয়োগের ক্ষেত্র’ পাওয়া গেছে, যা উন্নত এবং লিঙ্গ সমতাভিত্তিক কাজের বিশ্ব গড়ে তুলতে যুগান্তকারী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লিঙ্গ সমতাভিত্তিক ছুটি, সর্বজনীন শিশুর যত্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সেবা পরিষেবাগুলোতে বিনিয়োগ ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩০ কোটি চাকরি তৈরি করতে পারে। এ সময়ের মধ্যে এ নীতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের (মোট বার্ষিক জিডিপির ৪.২ শতাংশের সমতুল্য) বার্ষিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
আইএলও কন্ডিশনস অব ওয়ার্ক অ্যান্ড ইক্যুয়ালিটি ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ম্যানুয়েলা তোমেই বলেন, ‘বিদ্যমান পরিচর্যানীতি ও পরিষেবা পুনর্বিবেচনা করে এমন ধারাবাহিকতা তৈরি করতে হবে যা শিশুদের জন্য একটি ভালো সূচনা, নারীদের কর্মসংস্থান ও ব্যক্তিকে দারিদ্র্য থেকে সুরক্ষা দেবে।’
আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পৌটিআইনেন বলেন, ‘বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য শ্রম আইনে সর্বোচ্চ দুই সন্তান পর্যন্ত পূর্ণ বেতনে চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি সরকার পিতৃত্বকালীন ছুটি চালুর জন্য কাজ করছে, যা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।’
আইএলও বাংলাদেশ সরকারকে দেশ-বিদেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে দক্ষ পরিচর্যাকারী প্রশিক্ষণে সহায়তা করছে। এ প্রশিক্ষণ এরই মধ্যে তরুণদের আকৃষ্ট করেছে। দেশটির জনসংখ্যাগত ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিচর্যা খাতে দক্ষ কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এজন্য আইএলও ঢাকার সঙ্গে নিম্নোক্ত উদ্যোগ নিয়েছে ২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমে আইএলও-বাংলাদেশ স্কিল কর্মসূচির আলোকে কেয়ার গিভিং কোর্স সংযুক্ত; ২০১৯-২১ সালে এ কোর্সের জন্য পাঠ্যক্রম, দক্ষতার মান, শেখার উপকরণ, মূল্যায়ন সরঞ্জাম ইত্যাদিসহ কোয়ালিফিকেশন্স প্যাকেজ তৈরি, কেয়ার গিভিং পেশার চাহিদা মেটাতে প্রশিক্ষক এবং মূল্যায়নকারীদের প্রশিক্ষণ; ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৯৪ শিক্ষার্থী বাংলাদেশ-সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কাপ্তাই, খুলনা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সিলেট টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি বাগেরহাটে এনটিভিকিউএফ লেভেল-২ কেয়ার গিভিং কোর্সে অন্তর্ভুক্ত, লেভেল-২ দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ সব বয়সের মানুষের জন্য উন্মুক্ত এবং স্থানীয় নিয়োগকর্তারা (হাসপাতাল) টিভিইটি ইনস্টিটিউটগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে, যার ফলে অন দ্য জব প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় এবং কোর্স শেষে কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হয়। এ ছাড়া কেয়ার গিভিং ট্রেড থেকে স্নাতকদের স্ব-কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
