স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ মুজিববর্ষ উদযাপন করা হয় গত বছর। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও সংগ্রামের কেন্দ্রে ছিল শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণ। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাঙালি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও স্বদেশ নির্মাণে অগ্রযাত্রা থমকে গিয়েছিল পঁচাত্তরের আগস্টে তার নির্মম হত্যাকান্ডের কারণে। কিন্তু বাংলাদেশ আবারও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সেকালের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র তকমা কাটিয়ে বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির দেশ। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা দুনিয়াব্যাপীই প্রশংসিত। তবে, এ কথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, প্রভূত উন্নয়ন সত্ত্বেও দেশের সব মানুষ সমভাবে এই উন্নতির সুফল পাচ্ছে না। দেশে এখনো ভূমি ও গৃহহীন মানুষ রয়ে গেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মুজিববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে দেশের গৃহহীন মানুষকে ঘর বানিয়ে দেওয়ার যে কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী সম্পন্ন করছেন, তা যথার্থই বাঙালির স্বাধীনতা-সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের এক অনন্য স্মারক হয়ে থাকবে।
দেশ রূপান্তরে মঙ্গলবার প্রকাশিত খবরে জানা যায়, নিম্নমানের উপকরণ ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর গাজীপুরে মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষে গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উপহার হিসেবে নির্মাণাধীন শতাধিক ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলা ঘরগুলোতে সিমেন্ট, বালি, রড, ইট ও খোয়া থেকে শুরু করে দরজা-জানালায়ও অতি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল। সঠিক তদারকির অভাবে নিম্নমানের সামগ্রী ও নির্দিষ্ট পরিমাণের তুলনায় কম সামগ্রী দিয়ে ঘরগুলো তৈরি করে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। ঘরগুলো ভাঙা হলেও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য মেলেনি।
জানা গেছে, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর শুরু হয় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য ঘর তৈরির আশ্রয়ণ প্রকল্প। দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার জন্য এ ঘরগুলো তৈরিতে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ কাজ সম্পন্নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দেখভালে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। খাসজমিতে তৈরি করা ঘরগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত এ বাড়িগুলো দৃষ্টিনন্দন রঙিন টিনের দুই কামরার সেমিপাকা হওয়ার কথা। ঘরের আয়তন হবে দৈর্ঘ্যে ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চি আর প্রস্থে ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি। রান্নাঘর ও শৌচাগার থাকবে। প্রতি ১০ ঘরের জন্য একটি নলকূপ থাকার কথা। সব মিলিয়ে বাড়িপ্রতি ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা করে। ইটের সংখ্যা, সিমেন্ট ও বালুর পরিমাণও বলে দেওয়া হয় নকশা মোতাবেক। নির্দেশিকা অনুসারে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে কোনো মিল দেখা যাচ্ছে না। ভেঙে ফেলা ঘরের মধ্যে যে বিম ঢালাই দেওয়া হয়েছিল তাতে একটি করে রড ব্যবহার করা হয়। আবার কোনোটিতে বিমের মধ্যে কোনো রডই দেওয়া হয়নি। ঢালাই দেওয়া বিমগুলোতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই বালির মতো ভেঙে পড়ছে। নির্মাণাধীন দেয়ালগুলো বাঁশ দিয়ে ধাক্কা দিতেই ভেঙে পড়ছে মাটিতে। ঘরগুলোর কলামের মধ্যে ব্যবহার করা হয় নামমাত্র দুটি করে সরু রড। এ ছাড়া তৈরি করার পরপরই ঘরগুলোর মেঝেতে ফাটল ধরে। সামান্য আঘাতেই গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে পাকা মেঝেতে। ঠুনকো পাতলা প্লেনশিট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ঘরগুলোর দরজা-জানালা।
একটি ঘর শুধু আশ্রয়স্থলই নয়, যার কিছুই ছিল না এমন একটি ঘর তার জন্য অবশ্যই আত্মমর্যাদার। সরকারের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের নথি থেকে জানা যায়, ভূমি ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে ‘আশ্রয়ণ’ নামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ২০ হাজার ৫২টি ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এদিকে, আশ্রয়ণ প্রকল্প ২০২০ সালে ভূমি ও গৃহহীন ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবারের তালিকা তৈরি করে। এতে দেখা যায়, সারা দেশে ঘরও নেই, জমিও নেই এমন পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬১টি। আর ভিটেমাটি আছে কিন্তু ঘর জরাজীর্ণ কিংবা ঘর নেইএমন পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ ৯২ হাজার ২৬১টি। সরকারের এই আশ্রয়ণ প্রকল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অতিদরিদ্র মানুষদের সুরক্ষায় ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য হারে বরাদ্দ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জরুরি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
সরকারের এসব জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি যাদের গাফিলতি ও অসাধু ইচ্ছায় প্রশ্নবিদ্ধ হতে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সুফল যাতে জনসাধারণ ভোগ করতে পারেতা নিশ্চিত করতে হবে। এই ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য হুঁশিয়ারি জানানো জরুরি।
