জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিশে^র দেশগুলোয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সৃষ্টি করলেও উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য ভিন্ন সংকট তৈরি করেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধিতে দেশগুলোর মুদ্রার মান অস্থিতিশীল করে তুলছে।
গত মাসের বিশ্ব খাদ্যমূল্য সূচক সম্প্রতি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে বিশ^ খাদ্যমূল্য সূচক রেকর্ড বেড়েছে। এই মাসে সূচক ২০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৪০ দশমিক ৭ পয়েন্ট। শস্য, ভেজিটেবল অয়েল ও খামারপণ্যের দর বৃদ্ধিতেই বেড়েছে খাদ্যমূল্যের সূচক।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটে বিশ^ব্যাপী গম ও ভুট্টার সরবরাহে এরই মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, দামও ঊর্ধ্বমুখী। শস্যের এই সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির প্রভাব সূচকে শিগগিরিই প্রতিফলিত হবে। গত সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এদিন ট্রেডিংয়ের একপর্যায়ে পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়। আর তেলের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা খাদ্যমূল্যে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ সার সরবরাহের একটি মূল উপাদান হচ্ছে তেল।
বৈশি^ক মূল্যস্ফীতির হারে সাধারণত প্রধান ভূমিকা রাখে খাদ্যমূল্য। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষকরা বলেছেন, আগামী ৩ থেকে ৯ মাসের মধ্যে বৈশি^ক ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) শিথিল হওয়া উচিত। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে দেখা যেতে পারে ভিন্ন চিত্র। এদিকে উন্নত বাজারগুলোর তুলনায় মূল্যস্ফীতির দাপট দ্রুত বাড়ছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয়। এর মূল কারণ খাদ্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি। কারণ উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উদীয়মান বাজারগুলোর সিপিআইয়ে খাদ্যমূল্যের প্রভাব বেশি থাকে। ভারতের সিপিআইয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ আসে খাদ্যমূল্য থেকে। ফিলিপাইন, চীন ও রাশিয়ার সিপিআইয়ে খাদ্যমূল্যের গড় অবদান ৩০ শতাংশের বেশি। খাদ্যমূল্যের প্রভাব ইউরোপের দেশগুলোর সিপিআইয়ে ১০-১৫ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৮ শতাংশ।
মুদ্রাবাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি খাদ্য মূল্যস্ফীতি। খাদ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং চীনের মুদ্রার মানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। গত ৬ মাসে সিপিআইয়ে অতিরিক্ত ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট যোগ হওয়ায় এ তালিকায় নেই তুরস্ক। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ মুদ্রা রুবলের মান এরই মধ্যে পড়ে গেছে। মুদ্রার মান কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য আমদানি মূল্য বেড়ে যায়। ফলে উদীয়মান বাজারগুলোর মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের রুশ আগ্রাসনে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এফএওর খাদ্যমূল্য সূচকে চলতি মাসেও দেখা যাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। ভেজিটেবল অয়েল, শস্যদানা, খামারজাত পণ্য, চিনি ও মাংসএই ৫ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর পর্যবেক্ষণ করে বৈশি^ক খাদ্যমূল্য সূচক নির্ণয় করে এফএও। গত মাসে ভেজিটেবল অয়েলের মূল্যসূচক বেড়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সূচকের হার বৃদ্ধিতে প্রভাব রেখেছে পাম, সয় ও সূর্যমুখী তেলের উচ্চমূল্য। উল্লেখ্য, সূর্যমুখী তেলের বৈশি^ক রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশের জোগানদাতা ইউক্রেন ও রাশিয়া। শস্য মূল্যসূচক বেড়েছে ৩ শতাংশ। কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দর থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ফেব্রুয়ারিতে ভুট্টা ও গমের দাম বেড়েছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ১ ও ২ দশমিক ১ শতাংশ। সরবরাহ ঘাটতিতে খামার পণ্যের মূল্যসূচক বেড়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে টানা ৬ মাস বাড়ল এ সূচক। মাংসের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। নির্ধারিত ৫ পণ্যের মধ্যে গত মাসে তুলনামূলক দাম কমেছে চিনির। শীর্ষ রপ্তানিকারক ভারত ও থাইল্যান্ডে পণ্যটির পর্যাপ্ত উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকায় জানুয়ারির তুলনায় দাম কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
