১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নাটক ও কথিকা বিভাগের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছি। জল্লাদের দরবার, চরমপত্র এসব অনুষ্ঠান পরিচালনা করছি। ‘সালেহ আহমেদ’ ছদ্মনামে খবর পাঠ করতাম। আর অপেক্ষা করতাম কবে দেশ স্বাধীন হবে। ১৬ ডিসেম্বর এলো মাহেন্দ্রক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঢাকার বাইরে সাভারে এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যাই। সেখান থেকে আমি চলে যাই যুদ্ধে। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠিয়ে লায়লা হাসান ও সন্তানকে নিয়ে যাই।
যুদ্ধ শুরুর আগে আমি বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের আহ্বায়ক ছিলাম। তাই ক্র্যাক ডাউনের পর থেকেই আর্মিরা খোঁজাখুঁজি করছিল। এজন্য সাভার যাওয়ার আগে আমরা এক ধরনের বলতে গেলে এক কাপড়ে বের হই। ২৫ মার্চের কালরাতে আমরা বাইরে ছিলাম। রমনা থানার কাছেই আমাদের বাড়ি। ফেরার সময় দেখি পুলিশরা দৌড়াচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, পুলিশ সদস্যরা রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়িতে যাচ্ছেন অস্ত্র আনতে। এরপর রাতভর বৃষ্টির মতো গুলির শব্দ। অবস্থা বেগতিক দেখে ঘরে ফিরে কাঁথা-কম্বল দিয়ে দরজা-জানালা ঢেকে নিজেরাও গায়ে পেঁচিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ি। এভাবে দুদিন যাওয়ার পর কারফিউ রদ হয় আর সবাই ঢাকা ছাড়ি। সে রাতে অনেক মানুষ মারা যায়, অনেক ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা।
মানুষ নানাভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়। এর মধ্যে একটি হলো প্রচারযুদ্ধ। এ দেশে যে যুদ্ধ হচ্ছে, গণহত্যা ও অত্যাচার হচ্ছে তা বিশ্বের মানুষকে জানানো ও সাহায্য প্রার্থনা। আবার মানুষকে অস্ত্রহাতে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা জাগানোর কাজও শিল্পীসমাজ করেছে। যারা যুদ্ধের ময়দানে যায় তারা প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার জন্যই যায়। সেটি অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু তাদের অনুপ্রেরণা আর উৎসাহ দেওয়াও কোনো অংশে কম নয়। আর সেই কাজটিই নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে সে সময়ের বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ। আমরা ৮ থেকে ২৫ মার্চ অসাধারণ সব জাগরণের অনুষ্ঠান করি। এরপর চট্টগ্রামে একদল ছেলে বিপ্লবী স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র করে কাজ চালানোর চেষ্টা করি। দুটোই বন্ধ করে দেওয়ার পর কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র দিয়ে সারা দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতাম যে যুদ্ধ চলছে, মানুষ যেন হতাশ না হয়।
বাংলাদেশ একসময় পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত ছিল যার শাসন ও শোষণ করত পশ্চিম পাকিস্তানিরা। সেই অবিচার ও শোষণ মেনে না নেওয়ার জন্য বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। তবে শুধু অস্ত্র হাতে নিলেই তো আর যুদ্ধ হয় না। যা যার জায়গা থেকে কাজ করেছেন সবাই আর সেটিও মুক্তিযুদ্ধের অংশ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংবাদ প্রচার করি। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ২০ ডিসেম্বর কার্গো প্লেনে করে ঢাকায় ফিরি। ঢাকায় এসে আবার বেতার চালু হয়। ২২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনরা দেশে ফিরলে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করি।
লেখক : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, অভিনেতা, আবৃত্তিকার এবং পরিচালক
