পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার এক সিদ্ধান্তেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, জ¦ালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি ও ঋণাত্মক ইক্যুইটির প্রভাব একদিনেই মিলিয়ে গেছে। শেয়ার দর কমার সর্বোচ্চ সীমায় লাগাম টেনে ধরায় প্রথম দিনেই সব নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ৯৬ শতাংশ শেয়ারের দর বেড়েছে। একদিনের ব্যবধানে পুঁজিবাজারের চিত্র বদলে গিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১৫৫ পয়েন্টের বেশি। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক বেড়েছে ৩৮২ পয়েন্ট। লেনদেনেও খানিকটা অগ্রগতি দেখা গেছে।
জ্বালানি তেলের অব্যাহত দরবৃদ্ধি ও এর প্রভাবে জাহাজ ভাড়াসহ সব ধরনের কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে বড় পতন দেখা দেয় পুঁজিবাজারে। এর সঙ্গে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের দীর্ঘদিন ধরে চলা ঋণাত্মক ইক্যুইটির সমন্বয় নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা নিয়মিত দরপতনের ধারাবাহিকতায় গত সোমবার ডিএসইর প্রধান সূচকটি ১৮২ পয়েন্ট হারায়। পরদিন মঙ্গলবারও লেনদেনের শুরুতে বড় পতন দেখা দিলে এসইসি থেকে শেয়ারের দর কমার সর্বোচ্চ সীমায় লাগাম টানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেয়ারের দর ২ শতাংশের বেশি কমতে পারবে না, এমন সিদ্ধান্ত লেনদেন চলাকালীন জানিয়ে দেওয়া হয়। ফলে মঙ্গলবার বড় পতন রোধ করে কিছু পয়েন্ট যোগ করে লেনদেন শেষ হয়।
তবে দর কমার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়ার প্রভাবে গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই উল্লম্ফন দেখা দেয়। গত দুই সপ্তাহে পুঁজিবাজারে যুদ্ধসহ বিভিন্ন নেতিবাচক যেসব প্রভাব ছিল, গতকালের লেনদেনে তার কোনো রেশ পাওয়া যায়নি। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিসহ কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ করায় সূচকে উল্লম্ফন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক পতনে অনেক শেয়ার বিনিয়োগসীমার নিচে নেমে আসায় ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার কিনতে শুরু করেন। এছাড়া বিক্রিচাপ কম থাকায় লোকসানে শেয়ার বিক্রি করতে চাননি বিনিয়োগকারীরা। ফলে লেনদেন শুরুর প্রথম আধ ঘণ্টায় ডিএসই প্রধান সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ১১৪ পয়েন্ট বেড়ে যায়। ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকায় দিনশেষে সূচকটি ১৫৫ পয়েন্ট যোগ করে দিনের লেনদেন শেষ করে।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৮১টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ৩৬৫টির, কমেছে ৫টির ও অপরিবর্তিত ছিল ১০টির। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ১৪৭টি কোম্পানির শেয়ার দর ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। লেনদেন হওয়া ৯৬ শতাংশ সিকিউরিটিজের দর বাড়ায় ডিএসইর প্রধান সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ১৫৫ দশমিক ৭ পয়েন্ট বেড়ে ৬৬৩০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, প্রকৌশল, ট্যানারি, সিমেন্ট ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের। এসব খাতের বাজার মূলধন ৪ থেকে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেলিকম, বিবিধ ও জ¦ালানি খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে ১ দশমিক ৬ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত। গতকাল একদিনে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে এসইসি। আইনিসীমায় এখনো অধিকাংশ ব্যাংকের বিনিয়োগের সুযোগ থাকার পরও বাজারের মন্দাবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠান এগিয়ে না আসায় সংকট আরও বাড়ছে। ব্যাংকগুলো তার মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত এককভাবে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ ব্যাংক বিনিয়োগ করছে না। এমনকি পুঁজিবাজারকে সহায়তার উদ্দেশ্যে গঠিত বিশেষ তহবিলের বিনিয়োগও কাক্সিক্ষত মাত্রায় আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও হেড অব অপারেশনদের সঙ্গে বৈঠক করেন এসইসির শীর্ষ কর্মকর্তারা। ওই সভায় পুঁজিবাজারে আইনিসীমায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩৬টি ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠন করলেও তাদের হাতে এখনো প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রয়েছে বিনিয়োগের জন্য।
গতকালের বৈঠকের বিষয়ে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানিয়েছেন, যেসব ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশের কম বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে রয়েছে, তারা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া যেসব ব্যাংক এখনো ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেনি, কিংবা তহবিল গঠন করলেও বিনিয়োগ করেনি, তারা খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ তহবিল গঠন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছে।
