ইউক্রেন যুদ্ধে চীনের অগ্নিপরীক্ষা

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ১০:৩৬ পিএম

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি মস্কোর পক্ষ না নিলেও পরোক্ষ সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। অবশ্য যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমাদের একজোট হয়ে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দুশ্চিন্তায় ফেলেছে দেশটিকে। রাশিয়া একঘরে হলে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

রাশিয়ার পরিস্থিতি

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া সর্বাত্মক হামলা শুরু করে ২৪ ফেব্রুয়ারি। পশ্চিমাদের হুমকি ও নিষেধ উপেক্ষা করে যুদ্ধে নামার ফল কী হতে পারে, সে ধারণা ছিল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের। তবে যুদ্ধ শুরুর পর ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়েন পুতিন। ইউক্রেন দখল করতে বেশি দিন লাগবে না ভেবেছিলেন তিনি। তবে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ও জনগণের প্রতিরোধ কিয়েভের দ্রুত পতন ঘটানো কঠিন করে তোলে। রাশিয়ার শত শত ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও সামরিক সরঞ্জাম ইউক্রেনের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়, বেশ কিছু দখলেও নেয় ইউক্রেনীয় বাহিনী। রাশিয়ার ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেনাবহর দিনের পর দিন ইউক্রেনের রাস্তায় আটকে ছিল। দেশটির শহরগুলো চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে বোমা মেরে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কৌশল নেয় রুশরা। অনেকটা এভাবেই সিরিয়ার শহরগুলো ইসলামি জঙ্গি সংগঠন আইএস দখল থেকে উদ্ধার করেছিল রাশিয়া। তবে আইএসের তুলনায় ইউক্রেনীয়রা অনেক বেশি অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত, সংখ্যায় বেশি ও দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। পুতিন হয়তো দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত কিয়েভ দখলে সক্ষম হবেন কিন্তু সেজন্য তাকে চড়া মূল্য দিতে হবে। যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমাদের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বড় ধরনের ধাক্কা দেয় রুশ অর্থনীতিকে। তার ওপর ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর পেছনে প্রতিদিন পুতিনের ব্যয় হচ্ছে ৩০ কোটি ডলার। বিদেশে থাকা রাশিয়ার ৬৪০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ ও সম্পদের বড় অংশই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে স্থগিত বা জব্দ করা হয়। বৈশ্বিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যম সুইফট থেকে রাশিয়াকে বের করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। শেয়ারবাজার বন্ধ, কবে খুলবে তা বলতে পারছেন না রুশ কর্মকর্তারা। রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের দর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পড়ে গেছে। এমনকি যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়ার জিডিপি নেদারল্যান্ডসের চেয়েও ছোট হয়ে পড়ে।    

অনেকে ভেবেছিলেন, রুশ সেনাদের সীমান্তে দেখলেই দেশ ছেড়ে দৌড়ে পালাবেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রুশরা হামলা চালালে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন বলেও অনেকের ধারণা ছিল। তবে বাস্তবে তা ঘটেনি। রাশিয়ার কর্মকাণ্ড জেলেনস্কিকে অভিনেতা থেকে বিশ্বনেতায় পরিণত করে। যুদ্ধ শুরুর পর তাকে রণাঙ্গনের নায়ক হিসেবে দেখছেন অনেকে। যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, রাশিয়া তত সংকটে ডুববে। অবশ্য পুতিনের ক্ষেত্রে হবে ঠিক উল্টোটা। যুদ্ধকালে পুতিন ডুববেন না বরং জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী চেতনা ফেরি করে ক্ষমতায় বহাল তবিয়তে থাকবেন তিনি। তবে যুদ্ধ শেষ হলে এর লাভ-ক্ষতি নিয়ে রুশ জনগণের প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন পুতিন। আর তখনই রাশিয়া ও পুতিনের ভাগ্য আলাদা হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চীনের ওপর চাপ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরুর পর এটি নিয়ে তেমন কোনো কথা বলেনি চীন। অনেকটাই নীরব ছিল দেশটি। গত সপ্তাহে অবশ্য নীরবতা ভেঙে চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মস্কো ও পেইচিংয়ের সম্পর্ক ইস্পাতের মতো কঠিন। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করতে রাজি পেইচিং। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ নিতে গিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে চীন। যুদ্ধের বিরুদ্ধে পশ্চিমাসহ বিভিন্ন দেশ যেখানে সোচ্চার অবস্থান নেয়, সেখানে যুদ্ধবাজ পুতিনের পক্ষাবলম্বন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোণঠাসা হয়ে পড়ে চীন। এ অবস্থান থেকে বের হতে হলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার চীনের। এরই অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে রাশিয়ার পাশে থাকার অঙ্গীকার করার পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয় পেইচিংয়ের পক্ষ থেকে। যুদ্ধে পুতিনের জয় হলে সীমান্তে আত্মবিশ্বাসী রুশ সেনার দেখা পাবে চীন। নিজ সীমান্তে রুশ সেনাদের অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে চীনকে বরাবরই অস্বস্তিতে ফেলে। আর পুতিন হেরে গেলে আন্তর্জাতিক মহলে চীন আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, যা তাকে আরও বেশি বেকায়দায় ফেলবে। 

চীনের পরিস্থিতি বর্ণনা করা যায় এভাবে একটি রেস্তোরাঁয় খেতে বসেছে চীন। সঙ্গে রয়েছে আরও দেশ। খাবারের অর্ডার চীন দেয়নি এমনকি কোনো খাবার মুখেও তোলেনি সে কিন্তু খাবার শেষে অতিথিদের মধ্যে তার হাতেই বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের নির্দেশ দেয়নি চীন, পরিচালনাও করেনি সে কিন্তু যুদ্ধ থেকে নিজেকে কোনোভাবেই দূরে রাখতে পারছে না পেইচিং। যুদ্ধে হার-জিতের ফল ভোগ করতে হবে তাকেও। চীনের জনগণ এই পরিস্থিত সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল বলে মনে হচ্ছে না। অন্তত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাই বলছে। সেখানে চীনের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যুদ্ধে পুতিনকে সমর্থন জানিয়ে উল্লাস করে কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হারতে দেখলে তারা খুশি। তবে পুতিন বা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অবস্থা যে ভালো নয়, পুতিন হারলে যে চীনও ঝামেলায় পড়বে, তা যেন দেখেও দেখছে না চীনারা। ইউক্রেন-রাশিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে চাপের মধ্যে রয়েছে চীন। যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমারা এটিকে গণতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের মধ্যকার যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করলে এই চাপ আরও বেড়ে যায়। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াইয়ের ডাকও দেয় অনেকে। যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ফের রাশিয়া ও চীনকে স্বৈরশাসনের অধীনে পরিচালিত দেশ হিসেবে বলতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো।

রোমানিয়াভিত্তিক গবেষণা সংস্থা রোমানিয়ান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব দ্য এশিয়া-প্যাসিফিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট আন্দ্রিয়া ব্রিনজা বলেন, ‘রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব তার মিত্র চীনের ওপরও পড়বে। রাশিয়ার আগ্রাসনের সরাসরি নিন্দা না জানিয়ে, নিজেদের সংবাদমাধ্যমে রুশ প্রোপাগা-া দেখিয়ে ও যুদ্ধে সরাসরি সমর্থন না দিয়ে চীন নিজেকে যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি জায়গায় ফেলেছে। পরোক্ষভাবে রাশিয়ার আগ্রাসনের সমর্থন দিয়ে নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে চীন। ইউরোপে রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। এ বছর চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই বছরেই অনুষ্ঠিত হবে দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেস। চীনা জাতি নতুন করে গড়ে তুলতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখেন শি। চীনের মহান নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি দেশ ও দেশের বাইরে তুলে ধরতে কংগ্রেসের মতো অনুষ্ঠান যথার্থ। তবে অনুষ্ঠানের আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অস্বস্তিতে ফেলেছে শিকে।’ 

অন্ধকারে ছিল চীন

ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া ও চীনের জানা-বোঝা যে শুরু থেকে হুবহু এক ছিল না, তার ইঙ্গিত বেশ কয়েকবার পাওয়া যায়। চলতি বছরের শুরুতে রাশিয়া যখন ইউক্রেন সীমান্তে লাখখানেক সেনা মোতায়েন করে শক্তি প্রদর্শন করা শুরু করে, তখন ইউক্রেনে অবস্থান করা নিজ দেশের নাগরিকদের সে দেশেই থাকতে বলে চীন। চীনা নাগরিকদের সে সময় বলা হয়েছিল, তাদের কিছু হবে না, দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। চীনের ধারণা ছিল, রাশিয়া শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনে হামলা করবে না। চীনের ধারণা ভুল প্রমাণ করে ইউক্রেনে হামলা করে বসল রাশিয়া। হামলার মাত্র কয়েক দিন আগে ইউক্রেনে চীনা দূতাবাস নাগরিকদের গাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টে চীনের পতাকা লাগানোর নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশ থেকে ধারণা করা যায়, যুদ্ধ শুরুর আগে রাশিয়ার পক্ষ থেকে হয়তো চীনকে বলা হয়েছিল, আগ্রাসন হবে কিন্তু রুশ সেনারা রাজধানী কিয়েভসহ প্রধান শহরগুলো দ্রুত ও বিনা বাধায় দখল করে নেবে। হামলার কয়েক দিন পর ইউক্রেন থেকে নিজের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া শুরু করে চীন। দেশটি বুঝতে পেরেছিল, আগ্রাসন হয়েছে তবে তা পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে না। এ ছাড়া আরও চিন্তার বিষয় হলো আগ্রাসনের ফল পুরোপুরি অনিশ্চিত। মোদ্দা কথা, ইউক্রেন ইস্যুতে সব তথ্য জানত না চীন। হয় রাশিয়া তাকে ভুল তথ্য দিয়েছিল অথবা কোনো ধরনের মূল্যায়ন না করে রাশিয়ার বক্তব্য বিশ্বাস করে ফেলে পেইচিং। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়াকে যে ইউরোপ ও ন্যাটো কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেবে, তা কি আশা করেছিল চীন? বা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্র যে ফের নেতৃত্বের জায়গায় চলে যাবে, তাও কি ভেবেছিলেন প্রেসিডেন্ট শি? নিষেধাজ্ঞার কারণে তার অতিপ্রিয় বৈশ্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন কৌশল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্প যে প্রকৃতপক্ষে মুখ থুবড়ে পড়বে, সেটা কি চীনের হিসাবে ছিল? ওই প্রকল্পে চীন থেকে ইউরোপে যেতে হলে রাশিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। রাশিয়া যদি ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে চীনের বিআরআই প্রকল্প অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিয়ান ইয়ংজু বলেন, ‘ইউক্রেন ইস্যুতে চীনকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে উভয়সংকটে পড়বে চীন।’ চীন যদি ইউক্রেন যুদ্ধে এখন সরাসরি রাশিয়ার পক্ষ নেয়, তাহলে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে ইউরোপে প্রধান বাণিজ্য অংশীদার জার্মানির সঙ্গে চীনের সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে বাধ্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন জিওস্ট্র্যাটেজির গবেষক চার্লস পারটন বলেন, ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে রাশিয়ার অর্থনীতি বিচ্ছিন্ন করবে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সুইফট থেকে দেশটিকে বের করে দেওয়ার ঘটনা বিকল্প বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হতে চীনকে উৎসাহিত করবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি দীর্ঘদিন ধরে উদার গণতন্ত্র থেকে স্বৈরশাসনের পথে হাঁটছেন। তার এই নীতি ঠিক না বেঠিক, চলমান সংকট তাকে তা পুনরায় ভাবাতে পারে। পুতিনের ইউক্রেন আগ্রাসনের এটা ইতিবাচক দিক বলা যায়।’

নতুন মেরুকরণ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। স্নায়ুযুদ্ধের পর বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘিরে রাজনীতি আবর্তিত হয়। সব ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ রাজনীতি অর্থনীতির সেবায় নিয়োজিত ছিল। অর্থনীতি আগে তারপর রাজনীতি এটিই ছিল দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক স্থাপন ও হিসাবনিকাশের মূল মন্ত্র। ইউক্রেন যুদ্ধ এই ব্যবস্থা পুরোই পাল্টে দিয়েছে। এই যুদ্ধ বিশ্বনেতাদের শেখাচ্ছে, আগে রাজনীতি তারপর অর্থনীতি। অর্থনীতিকেই রাজনীতির সেবায় নিয়োজিত থাকতে হবে। রাজনৈতিক কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতি।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শক্তিশালী দেশগুলোকে ছোট দেশ বা অঞ্চল দখলে নিতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে। চীনের দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধু উত্তর কোরিয়া ৫ মার্চ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে। এটি ছিল দেশটির এক বছরে নবম ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা দেখে বিশ্লেষকরা মজা করে বলেন, উত্তর কোরিয়া হয়তো ঈর্ষান্বিত কারণ সবাই রাশিয়ার হুমকি নিয়ে কথা বলছে, সে নিজেও যে বিশ্বের জন্য হুমকি এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কোনো আলোচনা নেই। তাই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে নিজের শক্তি ফের জানান দিল উত্তরে কোরিয়া। রাশিয়া যেমন প্রতিবেশী দুর্বল ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়েছে, ঠিক তেমনি তাইওয়ানেও চীন যেকোনো সময়ে আগ্রাসন চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে অনেকে। অবশ্য যুদ্ধ শুরুর পর চীনের দিক থেকে এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো বক্তব্য বা উসকানিমূলক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তারপরও তাইওয়ানের জনগণ আশঙ্কামুক্ত হতে পারছে না। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের এক দিন আগেও বিশ্ব ভেবেছিল, রাশিয়া শেষ পর্যন্ত দেশটিতে হামলা চালাবে না কিন্তু তার পরদিনই আগ্রাসন শুরু হয়। তাইওয়ানে চীন হয়তো আজ হামলা করবে না কিন্তু কাল যে করবে না তার গ্যারান্টি কী? চীনের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ভারত ও ভিয়েতনামের। ওইসব সীমান্ত অঞ্চলের মানুষও তাইওয়ানিজদের মতো যুদ্ধ শুরুর পর উদ্বেগে রয়েছে।

বিশ্বব্যবস্থা যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে পেরেছে চীন। এ কারণে যুদ্ধ শুরুর পর সামরিক খাতে বাজেট ৭.১ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয় দেশটি। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অবস্থা দেখে চীন উপলব্ধি করে, পশ্চিমাদের সঙ্গে শত্রুতা যত বাড়বে, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। কেস স্টাডি হিসেবে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর ইউরোপীয়দের নির্ভরতার কথা বলা যায়। এই নির্ভরশীলতার বড় কারণ এই গ্যাস দামে সস্তা ও সরবরাহ সুবিধাজনক। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার গ্যাস ইউরোপ নেবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ করা সহজ নয়, আবার কঠিনও নয়। সারা বিশ্বে প্রচুর গ্যাস রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে ইউরোপে সেসব গ্যাস পাঠানো নিয়ে। এটি ফয়সালা হলে রাশিয়ার গ্যাসের দিকে ইউরোপীয়দের আর চেয়ে থাকতে হবে না। এ মুহূর্তে রাশিয়ার পণ্যের বড় বাজার ইউরোপ। তবে এই নির্ভরশীলতাও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিকল্প থাকলে নির্ভরশীলতা কমে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, রাশিয়াকে একঘরে করার পশ্চিমাদের তৎপরতা কি অনুমান করেছিল চীন? যুদ্ধের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে কি ভেবেছে দেশটি? অর্থনীতি নয়, রাজনীতিই চালিকাশক্তি নতুন এই বাস্তবতা অর্থনৈতিক শক্তিধর চীন যত তাড়াতাড়ি বুঝবে ততই তার জন্য মঙ্গল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত