কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায় নাফ নদী হয়ে মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে সহযোগিতা চেয়ে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও মাদক দপ্তরের প্রধানকে আবারও চিঠি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) চিঠি পাঠিয়েছে বলে একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়। এর আগে কয়েক দফা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশসহ (বিজিবি) অন্যান্য বাহিনী মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিলেও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মুন্সীগঞ্জ থেকে ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের একটি বড় চালানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর জানা গেছে, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানে সহযোগিতা করছে মিয়ানমারের পুলিশ। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ওই পাঁচ চোরাকারবারি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, মাদক ও অস্ত্রের চালান আনতে মিয়ানমারের পুলিশকে নিয়মিত টাকা দিতে হতো। টাকা নিয়ে তারা নদীতে ঢিলেঢালা টহল দেয়। সেই সুযোগটি নেয় চোরাকারবারিরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশ যারা মাদক উৎপাদন করে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এমনকি চিঠি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। মাদকের বেশিরভাগ চালান নাফ নদী দিয়ে আসছে তা সত্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভয়ংকর মাদক ইয়াবা ও আইস প্রবেশ রোধে সীমান্তে কড়াকাড়ি আরোপ করা হয়েছে। সীমান্তে সেন্সর লাগানো হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্রের চালান প্রতিরোধ করতেও আমরা বদ্ধপরিকর।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টেকনাফের নাফ নদী দিয়েই নিয়মিত মাদক ও অস্ত্রের চালান আসছে। মিয়ানমারের বিজিপি দুই দেশের চোরাকারবারিদের সহায়তা করছে। এসব তথ্য পেয়ে গত মাসে ওই দেশের বিজিপি প্রধানকে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে। তা ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও ওই দেশের মাদকবিষয়ক দপ্তরকে চিঠি দিয়েছে বলে তারা জানেন। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এক হয়ে নিয়মিত অভিযান চালালে মাদক বা অস্ত্র পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর না হয় এসব চোরাচালান আসা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, মিয়ানমার থেকে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে ভয়ংকর মাদক আইস-ইয়াবা ও অবৈধ অস্ত্র। নদীপথে নৌকা ও ট্রলার নিয়ে এসব রুট দিয়ে জেলের ছদ্মবেশে লবণ, মাছ ও শুঁটকির আড়ালে মাদক ও অস্ত্র আনা হচ্ছে রাজধানী ও দেশের কয়েকটি জেলায়। সমুদ্রপথে কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপ দিয়েও আসছে চালান। তবে নাফ নদীই মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের প্রধান পথ।
গত ২ মার্চ রাতে মুন্সীগঞ্জ থেকে ১২ কেজি আইস, এক লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট, অস্ত্রসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এই পাঁচজনের মধ্যে জসিম উদ্দিন ওরফে জসিম চোরকারবারি চক্রটির হোতা।
রিমান্ডে জসিমসহ পাঁচজন তাদের চোরাকারবারের নানা তথ্য দিয়েছে। সোনাদিয়াকেন্দ্রিক চোরাচালানিদের এই চক্রটি ঢাকা ছাড়াও বরিশাল ও পটুয়াখালীতে মাদক পাচার করত। জসিমের নেতৃত্বে এই চক্রে অন্তত ২৫ জন রয়েছে। তারা চোরাচালানের জন্য জেলের বেশে ২০-২৫ দিন সমুদ্রে কাটাত।
র্যাব সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই জসিম লবণ চাষ করতেন এলাকায়। এই ব্যবসার আড়ালে মাদক ও অস্ত্রের কারবার চালিয়ে আসছিলেন তিনি। এই চক্রের সদস্যরা মাছ ধরেন নাফ নদীতে। জসিম মাদক ও অস্ত্রের চালান পার করতে মিয়ানমারের বিজিপিকে প্রতি মাসে টাকা দেন। তারা ইয়াবা, আইস বা অস্ত্র পাচারের ব্যবস্থা করে দেয়।
জিজ্ঞাসাবাদে জসিমসহ ওই পাঁচজন জানিয়েছেন, নাফ নদীতে মাছ ধরা অধিকাংশ জেলেই চোরাকারবারে জড়িত।
জসিম জানিয়েছেন, তিনি সাত বছর ধরে লবণ ব্যবসার আড়ালে মাদক ও অস্ত্রে চোরকারবার করে আসছেন। মাদক বিক্রির টাকা ব্যবসায়ও লগ্নি করতেন তিনি। মাসে অন্তত ১০ বার মিয়ানমার আসা-যাওয়া করতেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ৮টি বিদেশি পিস্তল ও ১৬টি ম্যাগাজিনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তারাও নাফ নদী দিয়ে অস্ত্রের চালানটি নিয়ে আসে বলে স্বীকার করে। আর চালানটি আনার পেছনে ছিলেন যশোরের শার্শা উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আকুল হোসেন। সম্প্রতি পুলিশ আকুলকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, সহযোগীদের নিয়ে তিনি ছয় বছরে দুই শতাধিক অস্ত্র বিক্রি করেছেন। এর সবই আনা হয়েছে মিয়ানমান সীমান্ত দিয়ে। আর কিছু অস্ত্র আনা হয় ভারত সীমান্ত দিয়ে।
অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান নিয়ে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে মিয়ানমারের বিজিপি প্রধানের কাছে চিঠি দেয় পুলিশ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নাফ নদী হয়ে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তাদের নজরদারি আছে। বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডও কাজ করছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা চোরাকারবারিদের সহায়তা করছে বলে এসব পদক্ষেপ কাজে আসছে না। তাই কিছুদিন আগে মিয়ানমারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ দপ্তরকে আবারও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই দেশের নিরাপত্তা বাহিনী সহায়তা করছে না।
