গেল মাসের শেষে মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেশে আরও দুটি নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে খসড়া আইন নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। দুটিই উত্তরবঙ্গে- একটি ঠাকুরগাঁ, অন্যটি নওগাঁয়। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অর্ধশত পেরিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আজকাল অনেকটা ঘরের কাছের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত আছে, শিক্ষার মান নিয়েও আছে নানামুখী আলোচনা। তারপরেও নতুন দুটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সংবাদ অন্তত সংশ্লিষ্ট দুই জেলার মানুষের মধ্যে উৎসাহ জুগিয়েছে। ভবিষ্যতে আসন ক’খানা বাড়বে- এই ভাবনা থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কিছুটা আশা জাগাতে পারে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের খবর বাইরে আসার পর নওগাঁর অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে মতামত দিয়েছেন- ক্যাম্পাসটি কোথায় হওয়া উচিত। অর্থাৎ, জেলার ঠিক কোন জায়গায় হওয়া উচিত। তাদের কারও সঙ্গে দ্বিমত করার উদ্দেশ্যে আজকের এই লেখা নয়। বরং একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা বিষয়টিকে দেখতে পারি কি না, তার একটা আলোচনাসূত্র বলা যেতে পারে এটিকে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে নওগাঁর সমৃদ্ধি আছে। এই জেলায় সব থেকে পুরনো ঐতিহাসিক নিদর্শন সোমপুর বিহার, যা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসেই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টম শতকের কাছাকাছি সময়ে পালদের আমলে নির্মিত এই বৌদ্ধবিহারটি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে তোলা হয়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এখানে শিক্ষাগ্রহণের জন্য আসতেন শিক্ষার্থীরা। ইতিহাস বলছে, তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে জ্ঞানচর্চা চলেছে। বাংলাসাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ রচনার স্থান হিসেবেও এই বিহার প্রসিদ্ধ।
গুপ্ত ও পালযুগে প্রাচীন বাংলা (বরেন্দ্রী-মগধ) ও মগধে জ্ঞানচর্চার জন্য বেশ কয়েকটি বিহার ও মহাবিহার নির্মিত হয়। সোমপুর মহাবিহার এর অন্যতম। সুপ্রাচীন এই বিদ্যাপীঠের আচার্য হিসেবে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানও দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেক আগেই ইউনেস্কো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের মর্যাদা দিয়েছে। অষ্টাদশ শতকে বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হওয়ার পর এ যাবৎকালের সব গবেষণাই বলছে, হিমালয়ের দক্ষিণাংশে সোমপুর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাবিহার। পালদের পাঁচটি মহাবিহারের মধ্যে সব থেকে বড়টি নালন্দা। সোমপুর তার থেকে আয়তনে খানিক ছোট হলেও গুরুত্বের দিক দিয়ে মোটেও কম ছিল না। কারণ, কিছুটা আগেপিছে নির্মিত হলেও পাল রাজবংশের হাতে নির্মিত ৫টি মহাবিহার নালন্দা, উদান্তপুরি, বিক্রমশীলা, সোমপুর ও জগদ্দল একই রকমের পাঠপ্রক্রিয়ায় পরিচালিত হতো। প্রথম দিকে এতে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা প্রাধান্য পেলেও ক্রমে এসব স্থানে জীবনমুখী শিক্ষাও শুরু হয়। তাই বৌদ্ধ ভিক্ষু, পন্ডিত, ধর্মগবেষণা ও ধর্মপ্রচারের সম্পৃক্তদের পাশাপাশি এখানে আবাসিক ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান করতেন। প্রাচীন ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বজনীন শিক্ষার ধারণা এসব মহাবিহার থেকেই গড়ে উঠেছে।
বিশ্ব ইতিহাসে প্রাচীন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো অবধি টিকে আছে, সেগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র মিসরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল খ্রিস্টীয় নবম শতকে। যদিও ১৯৬১ সালের আগ অবধি প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা হতো না। তারপরেও এর গড়ে ওঠার ইতিহাস প্রাচীনই বটে। এছাড়া প্রাচীন অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রতিষ্ঠাকাল খ্রিস্টীয় দশম শতকের পর। সেই হিসেবে আমাদের এই প্রাচীন মহাবিহারগুলো বিশ্বসভ্যতার প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু শুধুমাত্র চালু না থাকায় ধ্বংসাবশেষগুলো যথাসম্ভব সংস্কারের পর এখন টিকে আছে পুরাকীর্তি হিসেবে।
ব্যতিক্রম ঘটেছে কেবল ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। ১৯৫১ সালে বিহার সরকার নালন্দার ধ্বংসাবশেষের পাশে একই আদলে নব নালন্দা মহাবিহার নামের একটি বৌদ্ধধর্ম ও পালি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এর বহু বছর পর ২০১৪ সালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সত্যি সত্যিই আধুনিক চেহারায় যাত্রা শুরু করে। নালন্দার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এর নতুন ক্যাম্পাস। চীন-সিঙ্গাপুরসহ বেশ কয়েকটি দেশ এর গুরুত্ব বিবেচনায় ক্যাম্পাসটি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। নালন্দার যে ধ্বংসাবশেষ মিলেছে, তাতে প্রায় ৩০ একর জমির ওপর প্রাচীন ক্যাম্পাসটি নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। আর আধুনিক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে ৪৫৫ একর জমি নিয়ে। নালন্দার আদলে আমরা বিলুপ্ত সোমপুরকেও আধুনিক ক্যাম্পাসে রূপ দিতে পারি। এখন অবধি স্থাপনাটির যতটুকু আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে অন্তত ৭০ একর জমিতে এর বিস্তৃতি পাওয়া যায়। নওগাঁর বিশ্ববিদ্যালয়টি এখানে হলে শুধু পঠন-পাঠনই নয়, নালন্দার মতোই এ অঞ্চলের পর্যটনও এক নতুন দিশা পেতে পারে।
এমনিতেই আমাদের দেশে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম। নব্বইয়ের দশকে জাহাঙ্গীরনগরে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন ধরে ওই একটিই ছিল সবেধন নীলমণি। পরে কুমিল্লা ও রংপুরে দুই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ-সংক্রান্ত দুটি বিভাগ চালু হয়। সোমপুর মহাবিহারের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় রেখে নওগাঁয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু করলে অবস্থানগত কারণেই প্রতœতত্ত্ব নিয়ে এখানে পঠন-পাঠনের একটি আলাদা পরিবেশ তৈরি হবে। এমনকি এটি দেশের বাইরে থেকেও বিদ্যার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করবে।
পাহাড়পুর নওগাঁ জেলার সীমানার মধ্যে পড়লেও ভৌগোলিকভাবে এর অবস্থান একাধিক জেলার জন্য সুবিধাজনক। নওগাঁ থেকে এর দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার, আবার জয়পুরহাট থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার। দুপচাঁচিয়া-আক্কেলপুর নতুন সড়ক ধরে বগুড়া থেকেও এর দূরত্ব কমবেশি ৫০ কিলোমিটার। জয়পুরহাট ছাড়া অন্তত আরও দুটি রেলওয়ে স্টেশন পাহাড়পুর থেকে খুব কাছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনায়ও এটি হতে পারে একটি সুবিধাজনক স্থান।
আমার যুক্তি খুবই সাধারণ। যদি প্রাচীন নালন্দাকে ফের জাগানো যায়, তাহলে আমাদের এখানে নওগাঁর পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহারের পুনর্যাত্রা সম্ভব নয় কেন? আমাদের সভ্যতা ও শিক্ষার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে বিশ্বের সামনে জোরেশোরে মেলে ধরার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটি হতে পারে একটি মোক্ষম উপায়। সেক্ষেত্রে মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদন মেলা নওগাঁয় নির্মিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়টি সোমপুর মহাবিহারের ধারাবাহিকতায় সেখানে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।
লেখক : সংবাদকর্মী, লেখক ও চলচ্চিত্রকর্মী
হড়সধহ.ংযরনষবব@মসধরষ.পড়স
