রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য পাঁচ পরিণতি

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২২, ১০:৩৭ পিএম

দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উভয় পক্ষ। রাশিয়ার দিক থেকে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে আগ্রাসন বন্ধ করার লক্ষণ দেখা যায়নি। রাশিয়া কি পারবে কিয়েভের পতন ঘটাতে? নাকি পিছু হটবে? আর কতদিন চলবে এই যুদ্ধ? লিখেছেন তানজিম তাবাস্সুম

প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের। অন্যভাবে বললে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন চলছে ১৮ দিন হলো। যুদ্ধ কবে নাগাদ শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। অথচ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির মুখে পুঁচকে ইউক্রেন দুদিনও টিকবে কি-না, যুদ্ধ শুরুর আগে তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন অনেকে। তবে সব জল্পনা-কল্পনা, বিশ্লেষণ ভুল প্রমাণ করে লড়াই এখনো টিকিয়ে রেখেছেন ইউক্রেনীয়রা অথবা তাদের সেই সুযোগ দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর আগে থেকেই পশ্চিমারা বলে আসছে, পুতিনের একমাত্র লক্ষ্য গোটা ইউক্রেন দখল করা। তার জন্য গত বছরের শেষ সময় থেকে চলতি বছরের শুরু থেকে কয়েক মাস ধরে পূর্ব ইউরোপে সেনা সমাবেশ বাড়ান পুতিন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণের আগেই সাবেক সোভিয়েত দেশটির সীমান্তে রাশিয়া দেড় লাখের বেশি সেনা জড়ো করে বলে দাবি করে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

ইউক্রেন যুদ্ধ প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ, রাশিয়া এখন পর্যন্ত তার মহাশক্তিশালী বিমানবাহিনী খুব একটা ব্যবহার করেনি। তাদের কাছে আকাশযান রয়েছে অন্তত ৪ হাজার ১৭৩টি, এর মধ্যে যুদ্ধবিমানই ৭৭২টি। ইউক্রেনের যুদ্ধবিমান মাত্র ৬৯টি। রাশিয়ার হেলিকপ্টার রয়েছে ১ হাজার ৫৪৩টি, এর মধ্যে অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৫৪৪টি। অন্যদিকে ইউক্রেনের হেলিকপ্টার ১১২টি, অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৩৪টি। সময় যত গড়াচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তত ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। ইতিমধ্যে গোটা বিশ্বে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে তেল, গ্যাস থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তির দিকে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে এই রক্তক্ষয়ী লড়াই কখন, কীভাবে শেষ হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের অধ্যাপক পল পোস্ট সম্প্রতি মার্কিনিদের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘দ্য আটলান্টিক’-এর বিখ্যাত সাংবাদিক ডেরেব থম্পসনকে এ সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইউক্রেন থেকে রাশিয়া সেনা প্রত্যাহার করলে বা ইউক্রেন নিজেদের অবস্থান পাল্টালে বা যুদ্ধে জয়ী হলে বা নতুন রুশ সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হলে এবং এর জেরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ গড়ালে একপক্ষের জয় হলে এর সমাপ্তি ঘটতে পারে।’ অধ্যাপক পল বলেন, ‘মূলত বর্তমান ইউক্রেন সরকারের পতন ঘটানোই রাশিয়ার লক্ষ্য। তাদের উদ্দেশ্য পূরণ হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে বেলারুশের মতো ইউক্রেনে রুশ সমর্থিত সরকার বসবে।’ চলমান যুদ্ধের এমন পরিস্থিতিতে আগামীর পথ দেখা বেশ কঠিন হতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রের নির্মমতা, কূটনৈতিক স্থিরাবস্থা, বাস্তুচ্যুতদের যন্ত্রণা এসব কতদিন চলবে, কেউ বলতে পারছেন না। রাজনীতিবিদ এবং সামরিক পরিকল্পনাবিদরা চলমান যুদ্ধ নিয়ে কী ভাবছেন? যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কিছু বলতে পারছেন এমন বিশ্লেষকদের সংখ্যা খুব বেশি নেই। কীভাবে শেষ হতে পারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ? আসুন জেনে নেওয়া যাক কয়েকজন বিশ্লেষকের ভাবনা ও বক্তব্য।

সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ

স্বল্প সময়ের মধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের ইতি টানতে হলে রাশিয়াকে কিছু কৌশলের দিকে নজর দিতে হবে। যেমন আরও দক্ষ রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনে মোতায়েন করা এবং ইউক্রেনের মনোবল ভেঙে দেওয়া। এতে করে পুতিন ইউক্রেনের সরকার বদলানোর মাধ্যমে তাদের পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট করে দিতে পারেন। কৌশলের অংশ হিসেবে দক্ষ বাহিনী মোতায়েনের মধ্য দিয়ে রাশিয়া তার সামরিক অভিযান বাড়াবে। ইউক্রেনজুড়ে নির্বিচারে রকেট হামলা এবং গোলাবর্ষণ চালাবে। রুশ বিমান বাহিনীর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলবে। সাইবার হামলার শিকার হয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন জাতীয় অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া হবে। এতে করে বিদ্যুৎ সংযোগ ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের চলমান দুঃসাহসী প্রতিরোধের পরও কিয়েভের পরাজয় ঠেকানো সম্ভব হবে না। একপর্যায়ে হয়তো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হত্যা করা হবে অথবা তিনি পশ্চিমে পালিয়ে যাবেন। ইউক্রেনের মসনদে বসবে রুশপন্থি সরকার। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার কাক্সিক্ষত বিজয় ঘোষণা করবেন। পরে তিনি ইউক্রেন থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার করবেন আর কিছু সেনা নিরাপত্তার খাতিরে ইউক্রেনেই রেখে দেবেন। হাজার হাজার ইউক্রেনীয় শরণার্থীকে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে পালিয়ে যেতে দেখা যাবে। এসব দৃশ্যের অবতারণা মোটেও অসম্ভব নয়। তবে এভাবে ইউক্রেনে অবৈধ রুশপন্থি সরকার বসানো হলে ভবিষ্যতে দেশটির অভ্যন্তরে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধেও পরিণত হতে পারে। হতে পারে রুশ সেনারা ইউক্রেনে আটকা পড়ে তাদের মনোবল হারিয়ে ফেলবে। আবার রসদের অভাব কিংবা দুর্বল নেতৃত্বের কারণে রাশিয়ার জয় পেতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ইউক্রেনের জনগণ প্রতিরোধ সংগ্রাম জারি রাখায় কিয়েভ দখল করতে রুশ বাহিনীর দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। আবার ইউক্রেনের আরও কিছু শহর রাশিয়া দখল করে ফেললেও সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে বেগ পেতে হতে পারে। ইউক্রেনের বিশাল স্থলসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে রাশিয়াকে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব। আবার রুশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে। স্থানীয়দের পূর্ণ সমর্থন তারা পাবে। পশ্চিমারা ইউক্রেনে যথেষ্ট অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। এমনও হতে পারে হয়তো একসময় রাশিয়ার নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে। ১৯৮৯ সালে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে পরাজিত হয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করার মতো তখন ইউক্রেনও ত্যাগ করতে হতে পারে রুশ বাহিনীকে।

ইউরোপীয় যুদ্ধ

এই যুদ্ধ কি ইউক্রেন সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে? ন্যাটোর অংশ নয়, এমন সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র, যেমন মলদোভা ও জর্জিয়াতে সেনা পাঠিয়ে রাশিয়ার সাবেক সাম্রাজ্যের আরও অংশ পুনরুদ্ধার করতে চাইতে পারেন পুতিন। অথবা যুদ্ধের ভুল হিসাবের ফলে শুধু সৈন্যবৃদ্ধি হতে পারে। পুতিন পশ্চিমাদের ইউক্রেনীয় বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করাকে আগ্রাসন বলে ঘোষণা করতে পারেন। তিনি কালিনিনগ্রাদের উপকূলীয় উপনিবেশের সঙ্গে একটি স্থল করিডর স্থাপনের জন্য লিথুয়ানিয়ার মতো ন্যাটো সদস্যভুক্ত বাল্টিক দেশগুলোতে সৈন্য পাঠানোর হুমকি দিতে পারেন। ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধ হলে তা হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সামরিক জোট সনদের ৫নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ন্যাটোভুক্ত কোনো সদস্যের ওপর হামলা করাটা সবার ওপর হামলার শামিল। তবে পুতিন ঝুঁকি নিতে পারেন, যদি তিনি মনে করেন যে এটিই তার নেতৃত্বকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়। যদি তিনি ইউক্রেনে পরাজয়ের মুখোমুখি হন, তবে তার ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে। বলা হচ্ছে, এই রুশ নেতা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গ করতে আগ্রহী। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই একই যুক্তির প্রয়োগ দেখা যেতে পারে। গত সপ্তাহে পুতিন তার পারমাণবিক বাহিনীকে উচ্চ স্তরের সতর্কতার মধ্যে রাখার ঘোষণা দেন। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এই সতর্কতার অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সময় ঘনিয়ে এসেছে।

কূটনৈতিক সমাধান

এত কিছুর পরও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ থামতে পারে কি? অনেকে মনে করছেন, কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এখন বন্দুক কথা বলছে কিন্তু সংলাপের পথ সবসময় খোলা থাকতে হবে। অবশ্যই সংলাপ চলবে।’ যুদ্ধ শুরুর পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফোনে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে কথা বলেন। আশ্চর্যজনক হলেও রাশিয়ান এবং ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বেলারুশ সীমান্তে আলোচনার জন্য মিলিত হন। এ ছাড়া ১০ মার্চ তুরস্কের আন্তালিয়া শহরে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলুর উপস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধে বৈঠকে বসেন ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। এসব বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। তবে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে আগ্রহ ছিল সবার। আপাতত মনে করা হচ্ছে, পরিস্থিতির চাপে রাজি হয়ে পুতিন অন্তত আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে মেনে নেবেন।

এ ছাড়া পরিস্থিতির চাপে পড়ে হতে পারে রাশিয়া বা ইউক্রেন কূটনৈতিক আলোচনার পথ বেছে নেবে। এই যুদ্ধ রাশিয়ার অনুকূলে যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মস্কোর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে পুতিন বুঝতে পেরেছেন যে তিনি তার ধারণক্ষমতার বাইরে হাত বাড়িয়েছেন। তিনি ভাবছেন যে, যুদ্ধ বন্ধ করার চেয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটাই তার নেতৃত্বের জন্য বেশি হুমকিস্বরূপ। আবার যুদ্ধ বন্ধ না হলে চীন রাশিয়া থেকে গ্যাস কিনবে না বলে হুমকি দিয়েছে। এমন সময় পুতিন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য কোনো একটি উপায় খুঁজতে শুরু করেছেন। অথবা ইউক্রেনও বুঝতে আরম্ভ করেছে যে প্রাণহানির চেয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা করাটাই শ্রেয়। এমতাবস্থায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের কূটনীতিকরা একত্রিত হয়ে একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন। চুক্তিতে বলা থাকবে ক্রিমিয়া ও দনবাসের কিছু অংশের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, পরিবর্তে পুতিন ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার পাশাপাশি তাকে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দেওয়া হবে। এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে এমন একটি দৃশ্যের অবতারণা হলেও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

পুতিনের ক্ষমতাচ্যুতি

ভ্লাদিমির পুতিন নিজেই কি রাশিয়ার ক্ষমতা ত্যাগ করবেন? রাশিয়া যখন আক্রমণ শুরু করে, তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা যে কোনো ফলাফলের জন্য প্রস্তুত।’ তবে সেই ফলাফল হিসেবে যদি তিনি ক্ষমতা হারান? এটা অকল্পনীয় মনে হতে পারে তবে অবাস্তব নয়। ইউক্রেনে হামলার পর পশ্চিমাদের নজিরবিহীন কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে রাশিয়া। যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের দর এক-তৃতীয়াংশ পড়ে যায়। বৈশ্বিক লেনদেনের মাধ্যম সুইফট থেকে রাশিয়াকে বের করে দেওয়ায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় রুশ অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম চড়া। বিশেষ করে রাশিয়ার নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। এভাবে চলতে থাকলে রাশিয়ার ক্ষমতায় প্রেসিডেন্ট পুতিন বেশিদিন থাকতে পারবেন না বলে মনে করা হচ্ছে।    লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজের ইমেরিটাস অধ্যাপক প্রফেসর স্যার লরেন্স ফ্রিডম্যানের মতে, এখন কিয়েভের মতো মস্কোতেও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার এমন কথা বলার কারণ কী হতে পারে? এটা ঠিক যে পুতিন একটি বিপজ্জনক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। হাজার হাজার রুশ সেনা এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হুমকি হয়ে উঠছে। এতে করে জনসমর্থন হারাতে পারেন পুতিন। বিপ্লবের সম্ভাবনাও দেখা দিতে পারে। জনগণের বিদ্রোহ দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুতিনের নির্দেশে কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্রোহের একপর্যায়ে রাশিয়ার সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাত শ্রেণির মানুষজন পুতিনের ওপর থেকে সমর্থন সরিয়ে নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের নেতাদের পক্ষ থেকে তখন হয়তো বলা হবে, যদি পুতিন ক্ষমতা ত্যাগ করেন এবং তার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত বেশি মধ্যপন্থি নেতৃত্ব রাশিয়ার ক্ষমতায় আসে, তাহলে রাশিয়ার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে ও রাশিয়ার সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। তবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি এখনই হবে, তা নয়। অবশ্য পুতিনের মদদপুষ্ট রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণি যদি মনে করে তিনি তাদের স্বার্থরক্ষা করতে পারবেন না, তবে এমন কিছু হওয়াটাও অমূলক হবে না।

উপরোক্ত সবগুলো ঘটনা যে একসঙ্গে ঘটবে, এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি মিলে ভিন্ন ফলাফল তৈরি হতে পারে। তবে যদি পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এভাবে চলতে থাকে, সেক্ষেত্রে বহির্বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কে যে পরিবর্তন আসবে, তা একেবারে নিশ্চিত করেই বলা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত