রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগে গুজব ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করা হতে পারেÑএমন শঙ্কা জানিয়ে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট প্রতিবেদন দিয়েছে। গত সপ্তাহে দেওয়া এই প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
ওই প্রতিবেদনের পর গতকাল রবিবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। ওই সভায় ভোজ্য তেল মজুদ প্রতিরোধে ট্রাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে ফায়দা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে উঠছে একাধিক চক্র। তারা গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টাও চালাচ্ছে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ এই সুযোগ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু বিশেষ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপি ও দলটির অঙ্গ সংগঠন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। আগামী ২৮ মার্চ হরতাল ডেকেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। এই হরতালে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে বলে জানা গেছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে অসন্তোষ ছাড়াও ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ ঘিরে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করার কথা বলা হয়েছে পুলিশের ওই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, দেশে একাধিক বিশেষ গোষ্ঠী গুজব ছড়াতে তৎপর রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় তৈরি পোশাক, পাট, হিমায়িত খাদ্য, চা, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক পণ্য, তামাক, মাছ, ওষুধ ও শাক-সবজি রপ্তানি করা হয়। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে গম, ভুট্টা, সূর্যমুখী তেল, খনিজসামগ্রী, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রাংশ ও প্লাস্টিকসহ নানা পণ্য আমদানি হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুদ্ধ ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে যাতে কেউ গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে।
ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বাহিনীর সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলোকেও সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে কেউ আছে কি না তা উদঘাটন করতে সরকারের হাইকমান্ড বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ শুরু করে। তারা একটি প্রাথমিক তালিকাও করেছে। ওই তালিকা ধরে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে কোনো যৌক্তিক আন্দোলন রাজনৈতিক সংগঠনের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে আন্দোলনকে পুঁজি করে কোনো সংগঠন কিংবা গোষ্ঠী যেন নাশকতা সৃষ্টি করতে না পারে এ বিষয়ে আমরা তৎপর আছি। ২৮ মার্চ ডাকা হরতালকে কেন্দ্র করে নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ইউনিট তৎপর। এসব কর্মসূচিতে কেউ যদি কোনো নাশকতা বা অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ নিয়ে দেশে একাধিক বিশেষ গোষ্ঠী গুজব ছড়াতে তৎপর রয়েছে বলে পুলিশের একটি ইউনিট প্রতিবেদন দিয়েছে। সেটা আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার হচ্ছে। তিনি বলেন, অগ্রাধিকার প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত করারও চেষ্টা করছে একটি মহল। প্রকল্পগুলোর কাজ ব্যাহত হলে দেশ বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। যুদ্ধের কারণে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা আছে তৈরি পোশাক শিল্পে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়বে। বিশ্ব পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও পড়তে শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধ নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী। তারা সরকারবিরোধী বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়েও তারা বেশ সক্রিয়। এরই মধ্যে সরকার বাজারে তেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তারপরও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মজুদ করে তেলের দাম বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন স্থান থেকে মজুদ করা তেলসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য জব্দ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চলমান অভিযান অব্যাহত রাখারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্র আরও জানায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আট শতাংশ বেড়ে গেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে দাম আরও বাড়তেও পারে। আর এই কারণে এই খাতে সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হবে এটাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যত গম আমদানি করে তার ৩০ শতাংশই আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। ভুট্টা আমদানির ২০ ভাগ আসে এই দুই দেশ থেকে। এ দুটি দেশ সারা বিশে^ই সূর্যমুখী তেলের ৮০ শতাংশ রপ্তানি করে। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেনে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ রপ্তানিতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলমান যুদ্ধের কারণে অর্থ লেনদেনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সুইফট থেকে রাশিয়ার কিছু ব্যাংককে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম বাধার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে ৩৬টি দেশের সঙ্গে রাশিয়ার বিমান যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষ্ণসাগর ব্যবহার করতে না পারায় অনেক জাহাজকে বহুদেশ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে। তাই আকাশ ও নৌপথে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আগেই বিভিন্ন দেশ থেকে বেশি পরিমাণে গম ও ভুট্টা এনে মজুদ করা যেতে পারে। রাশিয়া ও ইউক্রেন ছাড়া অন্যান্য দেশে পোশাক শিল্পের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। দেশে চলামান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম যেন স্থবির হয়ে না পড়ে সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। গম ও ভুট্টার চাহিদা পূরণে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষকদের ভর্তুকি দিলে ভালো হবে। খাদ্য ও জ¦ালানি পণ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
মজুদ প্রতিরোধে টাস্কফোর্স, গুজব বিষয়ে সতর্ক : গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ভোজ্য তেল নিয়ে অস্থিরতা, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় দ্ইু ঘণ্টার আলোচনায় সয়াবিন তেলের দাম সহনীয় রাখতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি গুজবের বিষয় নিয়ে সতর্ক থাকতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, অর্থ, বাণিজ্য, খাদ্য, কৃষি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ, র্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করে বৈঠকে উপস্থিত পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি করাকে কেন্দ্র করে একটি মহল সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা অপপ্রচার করছে। এই নিয়ে বৈঠকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, নিত্যপণ্য মজুদ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের সুবিধার্থে সব ধরনের নিত্যপণ্যের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের বিষয়ে সভায় একমত হয়েছেন তারা। খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রম আরও জোরদার করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘আগামীকালের (আজ) মধ্যেই ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে ঘোষণা দিতে পারব। আমরা একটি টাস্কফোর্সও করে দেব।’
