মাল্টিপারপাস কোম্পানির প্রতারণা

ধর্মের কথা বলে গ্রাহকের ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২২, ০৭:০৬ এএম

শরিয়াভিত্তিক সুদমুক্ত লেনদেনের কথা বলে গ্রাহকের প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি চক্র। নরসিংদীতে ‘শাহ সুলতান মাল্টিপারপাস কোম্পানি’ খুলে অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহ এবং উচ্চসুদে ঋণ কার্যক্রম চালিয়েছে তারা। চক্রের ফাঁদে অন্তত ৬ হাজার গ্রাহক নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত শনিবার রাতে নরসিংদী সদর থানার ভেলানগর এলাকা থেকে চক্রের হোতা মো. শাহ আলম (৫০) ও তার চার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১১। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন মো. দেলোয়ার হোসেন শিকদার (৫২), কাজী মানে উল্লাহ (৪৪), মো. সুমন মোল্লাহ (৩৩) ও আবদুল হান্নান মোল্লাহ (৩০)।

গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নরসিংদীর প্রায় সব থানার ৫-৬ হাজার সাধারণ পেশাজীবী প্রতারক চক্রটির খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত লাভের আশায় শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তারা এখন দিশেহারা।’

র‌্যাব বলছে, মাঠপর্যায়ে গ্রাহক ও অর্থ সংগ্রহের জন্য তিন শতাধিক কর্মী নিয়োগ করে শাহ সুলতান মাল্টিপারপাস কোম্পানি। সুদবিহীন ১২ থেকে ১৬ শতাংশ মুনাফার কথা বলে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হয়। নরসিংদীভিত্তিক চক্রটি এভাবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। চক্রের সদস্যরা ২০১০ সালের আগে নরসিংদীতে ৮-১০ বছর বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি করে মানুষের আস্থা অর্জন করেন। গ্রাহকের টাকায় স্বল্পমূল্যে জমি কিনে তা নিজেদের অন্য প্রতিষ্ঠানে বেশি দামে বিক্রি করে সবার মধ্যে বিশাল মুনাফা হিসেবে তুলে ধরত। প্রতিষ্ঠানের নামে এখন ৫০ কোটি টাকার মতো সম্পদ রয়েছে। তবে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এক, দুই থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে রেখেছে তারা।

গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে খন্দকার আল মঈন জানান, ২০১০ সালে নরসিংদী সদর থানার চিনিশপুর ইউনিয়নের ঘোড়াদিয়া এলাকায় শাহ সুলতান মাল্টিপারপাস কোম্পানি তাদের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করে। এরপর থেকে ধর্মকে ঢাল করে সুদমুক্ত ব্যবসার নামে বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে। সুদমুক্ত ব্যবসা ছিল তাদের লোক দেখানো। শাহ আলম কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে চারটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এগুলো হলো শাহ সুলতান এমসিএস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, স্বদেশ টেক্সটাইল লিমিটেড, শাহ সুলতান টেক্সটাইল লিমিটেড ও শাহ সুলতান প্রপার্টিজ লিমিটেড। ২৪ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ২০ পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। মূলত স্বজন ও পরিচিতদের পরিচালক এবং পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ দিত এবং জেলার বিভিন্ন থানার জনবহুল ও ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শাখা অফিস দিত।

মাঠ পর্যায়ে গ্রাহক ও অর্থ সংগ্রহে প্রতিষ্ঠানের তিন শতাধিক কর্মী থাকলেও তারা কোনো বেতন পেতেন না। বিনিয়োগকারী এনে দিলে তা থেকে এককালীন ১০ ও বছর শেষে ৬ শতাংশ অর্থের প্রলোভন দেওয়া হতো। এসব বিনিয়োগকারী বার্ষিক ১২-১৬ শতাংশ মুনাফার লোভে আসতেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে উচ্চ মুনাফায় মাসিক ডিপিএসের অর্থ ছাড়াও কিছু গ্রাহককে ঋণ দিত। ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মতো আমানত সংগ্রহ করে সে অর্থে ল্যান্ড প্রজেক্ট, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করত।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘করোনাকালে সংকটে পড়ে অনেক গ্রাহক তার আমানতের টাকা তুলতে আবেদন করলে দিতে গড়িমসি শুরু করে। গ্রাহকের ক্রমাগত চাপের মধ্যে প্রতিষ্ঠানে তালা দিয়ে লাপাত্তা হয় সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে গ্রাহকরা অভিযোগ করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানা নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় নিজের নামে ৫-৬ একর জমি কিনেছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের নামে ৭-৮ একর জমি কেনা রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত