সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকের একটি গ্রুপে নির্বাচনকেন্দ্রিক অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্টন থানায় গত ১৮ জানুয়ারি একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এক ভুক্তভোগী। জিডিতে তাকে সামাজিক, পারিবারিক, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য বিভিন্ন অপপ্রচারের অভিযোগ আনেন তিনি।
ওই ভুক্তভোগীর মতো আরও অনেকেই এমন ঘটনার মুখোমুখি হন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাওয়ার আগেই বা বুঝে উঠার আগেই সামাজিক যোগাযোগের এই সাইটে মন্তব্য বা বার্তা পাঠানোকে কেন্দ্র করে নানা সময়ে দেশে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, হয়েছে প্রাণহানিও। কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও ভোলার বোরহানউদ্দীনের ফেইসবুকের ছড়ানো গুজককে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষও হয়েছে।
ফেইসবুকে ‘কটূক্তির জেরে’ সংঘাতে জড়িয়ে সর্বশেষ গাজীপুরের কাপাসিয়ায় প্রাণ গেছে তিন তরুণের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ফেইসবুকে এমন অপপ্রচার বা বিদ্বেষমূলক প্রচার যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ বাধাতে পারে, হতে পারে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি।
গত শনিবার রাত ১১টার দিকে উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণগাঁও চরপাড়া এলাকার মরিয়ম ফাউন্ডেশন আল্লাহু জামে মসজিদের পাশে রবিন, নাঈম এবং ফারুক নামের তিন তরুণকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। সে সময় দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, এক নারীর ফেইসবুক ম্যাসেঞ্জারে আপত্তিকর কিছু ছবি পাঠানোর জের ধরে এ ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেইসবুক নিয়ন্ত্রিত হয় দেশের বাইরে থেকে। ফলে এখানে কেউ অপরাধ করলে তাদের শনাক্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফেইসবুক কর্র্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর কোনো তথ্য দিয়ে সহায়তা করে না ফেইসবুক কর্র্তৃপক্ষ। আর যাদের তথ্যও দিচ্ছে সেখানেও অনেক সময় নিচ্ছে। ফলে অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করতে সময় লেগে যাচ্ছে। এতে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ফেইসবুকে মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িঘর আর বৌদ্ধ বিহার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ফেইসবুক পোস্টে মুসলমানদের কাবাঘরের সঙ্গে হিন্দু দেবতা শিবের ছবি জুড়ে দিয়ে ইসলামের অবমাননা করা হয়েছিল। এর জের ধরে হওয়া হামলায় ওই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর ভোলাতে মহানবী ও ইসলামকে কটাক্ষ করে ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সংঘর্ষে চারজনের প্রাণ যায়। এ ছাড়া জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেকেই।
ডিএমপির গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আশরাফউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে একজন অন্যজনকে হেয় করার অসংখ্য অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। ভুক্তভোগীদের অনেকে মামলাও করছে। এসব অভিযোগের তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি।
পুলিশের বিভিন্ন শাখায় সাইবার জগতের ভুক্তভোগীদের করা অভিযোগের পরিসংখ্যান বলছে. ফেইসবুক থেকেই বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারে ২০২০ সালে সাইবার সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ফেইসবুক পেজে ২৭ হাজার ৭৮৬ জন এবং ফোনে ৭ হাজার ৬৮৮ জন অভিযোগ করেছেন। এছাড়া ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফেইসবুক পেজে ৩৬ হাজার ১৮২ জন এবং ফোনে ১০ হাজার ৩২৬ জন অভিযোগ করেছেন। সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এদের একটি বড় অংশই ফেইসবুককেন্দ্রিক হয়রানির শিকার।
পুলিশ সদর দপ্তরের ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ শাখার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫৩৭৮ জন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন। যার মধ্যে ৪৩ শতাংশ ফেইসবুকের ফেক আইডি সংক্রান্ত ও ১১ শতাংশ আইডি হ্যাক সংক্রান্ত।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ডিজিটাল মেন্টাল হেলথের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এছাড়া তারা বলছেন, শুধু আইন দিয়ে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও আসামি জমিনে মুক্তি পেয়ে যায়। দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছে এমন ঘটনাও খুব কমই রয়েছে। যারা খুনি তারা ধরেই নিয়েছে তাদের বিচারটা হবে না।
তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখন সময় এসেছে ডিজিটাল মেন্টাল হেল্থ নিয়ে চিন্তা করা। ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের কোনো কিছু আমরা ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে সেটিকে সহিষ্ণুতার সঙ্গে যেন মোকাবেলা করতে পারি সে শিক্ষাটি স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, আইটি ক্লাব ও পরিবার থেকে শুরু হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সন্তানের ডিজিটাল মনিটরিংটা অত্যাবশ্যকীয়।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেইসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিধিমালা দিতে হবে। সরকারকে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। কোন বয়সে ফেইসবুক ব্যবহার করতে পারবে আর কোন বয়সে পারবে না তার সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি মা-বাবাদেরও তার সন্তানের প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর নজর রাখতে হবে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক মো. আব্দুল কাদের মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে ফেইসবুকের ব্যবহার অতিরিক্ত হয়ে গেছে। এটি মানুষকে একটি এডিকশন (আসক্তি) তৈরি করেছে। এতে করে আমাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের সামাজিক মনস্তাত্বিক বিকাশ হচ্ছে না।
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি (সাইবার ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার) কামরুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকের বিভিন্ন পোস্ট বা কমেন্ট নিয়ে উত্তেজিত হওয়ার কারণ ব্যবহারকারীদের যথাযথ শিক্ষার অভাব। ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকের প্রযুক্তি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই।
তিনি বলেন, ‘ফেইসবুক শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এখানে জনমত, মতামত, নিজের অবস্থান প্রকাশ পায়। ফলে দুই পক্ষেরই সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। কোনো উসকানিমূলক পোস্টের কারণে এত দ্রুত উত্তেজিত আচরণ করা উচিত নয়।’
উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের বিষয়ে তিনি বলেন, সন্তানদের ফেইসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা-মা থেকে গাইডলাইন (দিক নির্দেশনা) নিতে হবে। কোনটা লেখা যাবে কোনটা যাবে না এটা পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়া কখনো এ ধরনের সংঘাত দমানো সম্ভব নয়।
