সর্বজনীন পেনশন সময়ের দাবি

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২২, ১০:৫১ পিএম

বাংলাদেশে মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র পাঁচ ভাগ সরকারি চাকরি করে। তারা গ্র্যাচুইটি, জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড ও মাসিক পেনশনের সুবিধা পান। সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের মৃত্যুর পর তার স্ত্রীও পেনশনের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। ফলে সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত এসব মুষ্টিমেয় লোকজনের বৃদ্ধ বয়স মোটামুটি ভালোভাবেই কেটে যায়। তাদের কোনো অর্থকষ্টের সম্মুখীন হতে হয় না। তারা মাসিক চিকিৎসা-ভাতা, উৎসব-ভাতা ও বৈশাখী-ভাতাও পান।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পেনশনের টাকা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্তদের অ্যাকাউন্টে প্রদানের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় অবসরভোগী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরোত্তর ভোগান্তির লাঘব হয়েছে। এজন্য সত্যিই শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার প্রশংসার দাবিদার। অন্যদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর শতকরা ৮ ভাগ লোক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এদের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানে মাসিক পেনশনের ব্যবস্থ্া আছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আছে কন্ট্রিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির ব্যবস্থা। এ ছাড়া ৮৭ ভাগ লোক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে চাকরি করেন। তাদের ভাগ্যে না জোটে গ্র্যাচুইটি, না জোটে পেনশনের সুযোগ-সুবিধা। এরা এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত এবং তাদের অবসরজীবন খুবই কষ্টে কাটে।

বাংলাদেশের মানুষের বর্তমানে গড় আয়ু ৭৩ বছর। আর চাকরি থেকে অবসরের বয়স ৫৯ বছর। ফলে প্রবীণদের একটি বড় সময় কর্মহীন অবস্থায় কাটাতে হয়। তারা না পারেন চাকরি করতে, না পারেন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। বিদেশে সুস্থ, সবল প্রবীণদের জন্য বিশেষ বিশেষ চাকরির কোটা নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে সে ব্যবস্থা নেই। প্রবীণরা সভ্যতা নির্মাণের কারিগর। তারা তাদের জীবনের মহামূল্যবান সময় জাতির কল্যাণে ব্যয় করেন। যৌবনের সোনালি দিনগুলো উৎসর্গ করেন জাতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে।

মানুষের বয়স ৫০ পার হলে তার রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে যায়। নানা ধরনের রোগ এসে বাসা বাঁধে প্রবীণদের দেহে। বাংলাদেশে প্রবীণদের সচরাচর যেসব রোগ আক্রমণ করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, হাড়ক্ষয়, কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন দন্তরোগ। এসব রোগ যেমন জটিল, তেমনি ব্যয়বহুল। চিকিৎসা বাবদ প্রবীণদের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। অনেকে অর্থের অভাবে এসব জটিল রোগের চিকিৎসা করাতে পারেন না।

চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণরা একসঙ্গে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির টাকা পেলে, তাদের ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন সেই টাকা ছলেবলে হাতিয়ে নেন। ছেলেরা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের টাকাপয়সা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নেওয়ার পর তাদের কোনো খোঁজখবর বা সেবা-যত্ন করেন না। কোনো কোনো বাবা-মায়ের ঠাঁই হয় প্রবীণ নিবাসে। আরাফাতুন নেছার (৮৫) মতো মাকে তারই গর্ভজাত সন্তানরা কুমিল্লা থেকে গাড়িতে করে এনে গৌরনদীর রাস্তায় ফেলে দেয়। বাবা-মাকে তাদের নিজ বাড়ি থেকে নিষ্ঠুর সন্তানরা উচ্ছেদ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অনেক বাবা-মা সন্তানদের সব সম্পদ দিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান। কেউ কেউ সব হারিয়ে অন্যের বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নেন। এই অসহায় প্রবীণদের কেউ কেউ মানুষের কাছ থেকে সাহায্য তুলে কোনো মতে বেঁচে থাকেন। আর সন্তানরা বাবা-মায়ের সম্পদ কুক্ষিগত করে আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করে। যদিও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক করে আইনপ্রণয়ন করা হয়েছে। তার পরও কে মানে সেই আইন?

সরকার ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক দরিদ্র প্রবীণদের মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেয়। বর্তমানে ৫০০ টাকা দিয়ে একজন প্রবীণের চা খাওয়ার খরচই মেটানো যায় না। তার চিকিৎসা ও খাওয়া-দাওয়ার কথা তো ভাবাই যায় না। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দরিদ্র প্রবীণদের বয়স্ক-ভাতা চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়ানো প্রয়োজন। যাতে ওই টাকায় তার তিন বেলার খাবার ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের টাকার ব্যবস্থা হয়।

দেশে ষাটোর্ধ্ব সব নাগরিকের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি, গণভবনে ‘সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা প্রবর্তন’-বিষয়ক একটি উপস্থাপনা অবলোকন করে অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতো দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা এখন ৮০ লাখ। তাদের মধ্যে যারা বেসরকারি চাকুরে ছিলেন তাদের মাত্র ১০ শতাংশ গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ পাচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে সিংহভাগ মানুষ। তারা কোনো কিছুর আওতাতেই পড়েন না। বয়সকালে সবাই যেন আর্থিক এবং সামাজিক সুরক্ষা পান, সেজন্য একটি সর্বজনীন পেনশন স্কিম খুবই জরুরি। জাতীয় পরিচয়পত্রকে ভিত্তি ধরে দেশের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব নাগরিকের জন্য সর্বজনীন পেনশন চালু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রবাসীরাও এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। নিবন্ধিতরা ৬০ বছরের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পেনশন ভোগ করতে পারবেন। এজন্য আলাদা একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে, যার সব কাঠামোগত ও সুবিধা সরকার বহন করবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এ সুবিধা নিতে পারবে।

বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান গড় আয়ু ৭৩ বছর। আগামী ২০৫০ ও ২০৭৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে যথাক্রমে ৮০ ও ৮৫ বছরে। তখন একজন মানুষ অবসরে যাওয়ার পরও কমপক্ষে ২০ বছর বেঁচে থাকবেন। বর্তমানে প্রবীণদের নির্ভরতার হার ৭.৭ ভাগ। ২০৫০ ও ২০৭৫ সালে এই নির্ভরতার হার বেড়ে দাঁড়াবে যথাক্রমে ২৪ ও ৪৮ শতাংশে। প্রাথমিক পর্যায়ে পেনশন প্রকল্পে হিসাব খোলা ঐচ্ছিক হলেও পরে তা বাধ্যতামূলক করা হবে। যারা পেনশন হিসাব খুলে টাকা জমা রাখবেন, তারা জীবনের শেষ সময়ে পেনশন সুবিধা পাবেন। এরূপ জমা সম্পূর্ণভাবে আয়কর রেয়াতের সুবিধা পাবে। নির্ধারিত পদ্ধতিতে সুদ প্রদানের শর্তে জরুরি প্রয়োজনে পেনশন স্কিমে জমা টাকা থেকে ঋণ নেওয়া যাবে। পেনশনধারীর বয়স ৭৫ হওয়ার আগে মৃত্যুবরণ করলে তার নমিনি পেনশন পাবেন। পেনশন তহবিল পরিচালনার জন্য সরকার কর্তৃক একটি কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করা হবে। ওই কর্তৃপক্ষ জমা করা অর্থ অনুমোদিত বিভিন্ন লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে দীর্ঘদিন থেকে সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি চালু রয়েছে। ভারত সরকার কর্তৃক চালু করা ন্যাশনাল পেনশন স্কিম (এনপিএস) দেশের মানুষের জন্য কল্যাণমুখী বিনিয়োগ ও পেনশনপ্রাপ্তির সহজ উপায়। পেনশন ফান্ড রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি (পিএফআরডিএ) এই তহবিলের সর্বময় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী যেকোনো ভারতীয় নাগরিক এই পেনশন স্কিমে হিসাব খুলে টাকা জমা করতে পারেন। হিসাব খোলার ৩ বছর পর জরুরি তিনটি প্রয়োজনে জমা করা অর্থের শতকরা ২৫ ভাগ পর্যন্ত উত্তোলন করা যায়। উত্তোলনের কারণগুলো হলো বাড়ি নির্মাণ বা ক্রয়, সন্তানের পড়াশোনা বা চিকিৎসাব্যয় নির্বাহ করা। ভারতে এই তহবিলে বিনিয়োগ করে সাধারণত ৯ থেকে ১২ ভাগ পর্যন্ত মুনাফা অর্জিত হয়ে থাকে, যা বিনিয়োগকারীরা পেয়ে থাকেন। এ ধরনের বিনিয়োগ সম্পূর্ণ আয়কর রেয়াতের আওতাধীন। ১৯৯৭ সালে থাইল্যান্ডে থাইল্যান্ড গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড বা থাইল্যান্ড জিপিএফ নামে সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি চালু করা হয়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে জমা করা তহবিলের পরিমাণ ২ হাজার ৯৫৪ কোটি মার্কিন ডলার। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে এ ধরনের প্রকল্প চালু আছে।

২০১৬ সালের বাজেট বক্তৃতায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও পেনশনের আওতায় আনার চিন্তার কথা বলেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মোহিত। তিনি বলেছিলেন, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত। তারাই পেনশন সুবিধা পান। বাকি ৯৫ শতাংশের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ গ্র্যাচুইটির সুবিধা পেলেও অন্যদের জন্য সে সুবিধা নেই। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার কারণে প্রবীণদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্রবীণদের আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীন হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই প্রবীণদের শেষ জীবনে আর্থিক সুরক্ষায় সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত