আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ১০৩তম জন্মদিন এবং ১০২তম জন্মবার্ষিকী। বার্ষিকী আর জন্মদিন নিয়ে আমাদের মধ্যে খানিকটা অস্পষ্টতা আছে। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু জন্ম নিয়েছিলেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। সে হিসাব অনুযায়ী আজ বঙ্গবন্ধুর ১০২তম জন্মবার্ষিকী কিন্তু যাত্রা শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর জীবনের একটি নতুন বছরের। ফলে, আজ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ১০৩তম জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং সুরমা থেকে পাটুরিয়া বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা জরুরি। কেননা, নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, দর্শন ও রাজনৈতিক ইতিহাস উপস্থাপনের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাছাড়া, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শে নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে হলে বঙ্গবন্ধুর গৌরবান্বিত জীবন, অবিসংবাদিত নেতৃত্বের ইতিহাস, একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার উন্মেষ, বিকাশ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সফল পরিণতিতে বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সংগ্রামের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটা কার্যকর প্রক্রিয়া হতে পারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জন্মবার্ষিকী পালন করা।
এটা মনে রাখা জরুরি যে, স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে যদি বঙ্গবন্ধুকে এখনো বাঙালির স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনের পটভূমিতে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা না যায়, তাহলে সেটা এ জাতির জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর এদেশে ইতিহাস বিকৃতির যে মহোৎসব হয়েছিল, ইতিহাসের সত্য যেভাবে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল অসত্যের ডামাডোলে এবং সংবিধান থেকে পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত সর্বত্র যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে এবং বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ¦ল ইতিহাস ও অমর কীর্তিকে মুছে ফেলার রাষ্ট্রীয় প্রকল্প সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিল, তাতে করে সত্যিকার ইতিহাসের পুনরুদ্ধার খুবই জরুরি হয়ে পড়েছিল। ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর ইতিহাসের যে শুদ্ধিকরণের যাত্রা শুরু হয়, সেটা অদ্যাবধি চলমান। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করে একাত্তরের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রশ্নে নতুন প্রজন্মের যে তীব্র আবেগ আমরা লক্ষ করেছি, সেটা আমাদের তুমুলভাবে আশান্বিত করেছে। ২০১৩ সালে গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ সেøাগান আমাদের নতুন করে একাত্তরের দেশপ্রেমের আবেগের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিগত দশ বছরে গণজাগরণ মঞ্চের সে জাগরণ আর নেই। ইতিমধ্যে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ও তার পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। কিন্তু তাই বলে আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়নি। শত্রুরা বসে নেই। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি এখনো সমানতালে সক্রিয়। কেবল সময় ও সুযোগের অপেক্ষায়। তাই, একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখাটাই এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই, প্রতি বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন উপলক্ষে দেশব্যাপী বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নানান অনুষ্ঠানমালা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন, দর্শন, কর্ম, রাজনীতি ও রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করতে হবে নিয়মিতভাবে। কেননা, বঙ্গবন্ধুর জীবনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস; বঙ্গবন্ধুর আদর্শই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও একাত্তরের প্রেরণা; বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনই একটি গণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের তত্ত্ব।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন বাঙালি জাতির পিতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেননি আমাদের বঙ্গবন্ধু। মেট্রোপলিটন কেন্দ্র থেকে বহুদূরে টুঙ্গিপাড়ার এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নিয়ে ধীরে ধীরে ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের গুণে কীভাবে নানান ধাপ পেরিয়ে একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হয়ে উঠেছিলেন, সে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানাটা জরুরি। প্রতি বছর বিশেষ গুরুত্ব এবং তাৎপর্যের সঙ্গে দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালনের মধ্য দিয়েই সুচারুভাবে করা সম্ভর। তরুণ প্রজন্মের বঙ্গবন্ধুর জীবন-পাঠ কেন জরুরি, তা নিয়ে আমি লিখেছিলাম এভাবে “কীভাবে মাটি ও মানুষের প্রতি তীব্র ভালোবাসা, দায়িত্ব এবং কর্তব্যবোধ একজন সাধারণ (!) মানুষকে অসাধারণ মানুষের প্রতীক হিসাবে গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বিশ্বের দরবারে ‘মহান নেতা’র আসনে আসীন করে, সে ইতিহাসের সচেতন পাঠ জরুরি। কেননা, এর মধ্যে যেমন একজন সত্যিকার জনবান্ধব, জনদরদী এবং ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের মৌলিক গুণাবলির বৈশিষ্ট্য জানা যায়, তেমনি বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিবিড় পাঠের ভেতর দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি এবং একটি নিপীড়িত-লাঞ্ছিত-শোষিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির ব্যাকরণকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।...তাই, বঙ্গবন্ধুর জীবন-পাঠ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসে পাঠের সমান। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর জীবন-পাঠ, বাঙালির একশত বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস (পলিটিক্যাল হিস্টোরি) পাঠের সমতুল্য। বঙ্গবন্ধুর জীবন-পাঠ, একজন স্থানিক নেতৃত্বের ক্রমান্বয়ে জাতীয় নেতৃত্ব থেকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের আইকনিক ফিগার হয়ে উঠবার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পাঠের সমান্তরাল।” তাই, আজকের প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হলে, একটি জাতির বেড়ে ওঠার সঠিক ইতিহাস জানাতে হলে, তাকে বঙ্গবন্ধুর জীবন, দর্শন, রাজনীতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আর সেটা সম্ভব প্রতি বছর মার্চের ১৭ তারিখ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করার মধ্য দিয়ে।
আমি পত্রিকায় লিখেছিলাম, “[নতুন প্রজন্মকে] জানতে হবে এদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস এবং সে ইতিহাস নির্মাণের প্রধান চরিত্রকে। জানতে হবে একজন মানুষের সত্যিকার ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠবার ইতিহাস। পাশাপাশি চিনতে হবে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী এবং তাদের উত্তরাধিকারকে যাতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে পারে এবং লাল-সবুজের পতাকার সত্যিকার সুরক্ষা দিতে পারে। জানতে হবে জাতীয় শোক দিবসের মর্মার্থকে যাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে কীভাবে এদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তনের অশুভ পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কেননা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনের কাঠামোয় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে জাতির শত্রু ও মিত্র পরিষ্কারভাবে চেনাটা জরুরি। এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এটা জরুরি কারণ আজকের প্রজন্মই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। তখনো যেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।” এ কারণেই প্রতি বছর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জীবন, বঙ্গবন্ধুর জীবনাচার, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বাংলাদেশের সর্বত্র নানান আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে নতুন প্রজন্মেও মনে, মননে, চিন্তা, ভাবনা, আদর্শ ও দর্শনে সঞ্চারিত করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ আজ একটি মধ্যম আয়ের দেশ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনকারী একটি দেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং জিডিপি গ্রোথে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়াতে প্রথম এবং গোটা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে দ্বিতীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উন্নয়ক ইনডেক্সেও বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতির এ বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ঊর্ধ্বমুখী এ ধারাকে ধরে রাখতে হলে এবং ১৯৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে, এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে হবে, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে দীক্ষিত, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী এবং নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত দেশপ্রেমিক। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ দর্শন সঞ্চারিত করার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হচ্ছে প্রতি বছর মার্চের ১৭ তারিখ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন বিশেষ তাৎপর্যের সঙ্গে এবং সুপরিকল্পিত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা যার মধ্য দিয়ে একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সদা সজীব রাখা সম্ভব।
লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
