বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ।
নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন। পরে দেশের পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভোট করে বিচারাঙ্গনে ফিরে অবসর নেওয়ার পর তিনি ১৯৯৬ সালে পুনরায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ৯২ বছর বয়সে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ শনিবার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনযাপনে তিনি ছিলেন খুবই সাদামাটা। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের পরিবারের প্রতিদিনকার বাজারের খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিতেন না সাহাবুদ্দীন আহমদ। অথচ রাষ্ট্রপ্রধানের যাবতীয় খরচ বহন করে রাষ্ট্র। আইনের মাধ্যমে সেই ব্যয় নির্ধারণও করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে একজন রাষ্ট্রপতির চিকিৎসা থেকে শুরু সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। বঙ্গভবনের ‘মার্কেট ম্যান’ বা পরিবারের কারও মাধ্যমে নিজের ‘পকেট থেকে’ বাজারের টাকা দিতেন তিনি।
শনিবার সাহাবুদ্দীন আহমদের মৃত্যুর পর বঙ্গভবনে তার অবস্থানের সময় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে কর্মরত একাধিকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
সাহাবুদ্দীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অনেক দিন বঙ্গভবনের পেন্ট্রির (চা-নাশতা আয়োজনের দায়িত্ব) দায়িত্বে ছিলেন আবু শহীদ। দুই বছর আগে ‘স্টুয়ার্ট’ পদে অবসরে যান।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্যার যখন প্রধান বিচারপতির বাড়িতে থাকতেন, তখনো আমি ডিউটি করেছি। পরে যখন তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে আসেন তখন বঙ্গভবনে ডিউটি করেছি। স্যারের বাসার জন্য যে বাজার করা হতো, তার টাকা তিনি নিজে দিতেন। তহবিল থেকে নিতেন না। ওই সময় যে মার্কেটম্যান ছিল সে এবং স্যারের পরিবারের এক সদস্য বাজারে যেতেন।’
শহীদ আরও বলেন, ‘অনেকে রাষ্ট্রপতিকে উপহার পাঠাতেন। সেসব জিনিস তিনি নিজে রাখতেন না। স্টাফদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দিতেন।’
ওই সময় বঙ্গভবনে চাকরি করেছেন এমন আরেক জন বলেন, ‘আমি নিজে দেখেছি, স্যার (সাহাবুদ্দীন আহমদ) নিজে টাকা দিয়ে বলেছেন, লাল শাক কিনে আনতে। তিনি নিজে কখনো দুর্নীতি প্রশ্রয় দিতেন না। এ জন্য অনেকে তাকে পছন্দ করতেন না।”
বঙ্গভবনের এখন কাজ করছেন এমন দুই-এক জনের কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দীন আহমদ দায়িত্ব নেওয়ার অনেক পদ বিলুপ্ত করেন। ‘কাজ নেই অথচ পদ আছে’ এমন অনেককে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তাদেরই একজন আবু শহীদ। তাকে প্রথমে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে পরে আবার ফেরতও আনা হয়।
২০১৬ সালে ‘সিলভার স্টোরম্যান’ হিসেবে অবসরে যাওয়া শাজাহান খানও বঙ্গভবনের রেসিডেন্স ব্লকে দীর্ঘদিনে কাজ করেছেন।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘সাহাবুদ্দীন আহমদ স্যার প্রশাসনিক দিক নিজ হাতে দেখতেন। কখনো কোনো সমস্যা হলে তিনি কোনো অফিসারকে দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকতেন না। নিজে তদারকি করতেন। আমি এরশাদ সাহেবের আমলের আগে চাকরিতে ঢুকি। রেসিডেন্স ব্লকে কাজ করার কারণে সাহাবুদ্দীন সাহেবকে কাছ থেকে দেখেছি। কোথাও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় তিনি করতে দিতেন না। সে জন্যই অনেককে মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। কর্মচারীরা কোনো সমস্যা নিয়ে তার কাছে গেলে সব সময় নিজে সেটার সমাধানে তদারকি করতেন।’
১৯৩০ সালে নেত্রকোনায় জন্ম নেওয়া সাহাবুদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার পরপরই হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৮০ সালে আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে কাজ শুরুর এক দশক পর ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে দেশের ষষ্ঠ প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।
গণ-অভ্যুত্থানে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে জেনারেল এইচ এম এরশাদ সরকারের পতনের পর পঞ্চম সংসদের নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন মাসের অন্তর্বর্তীকালীন বা অস্থায়ী একটি সরকার গঠন করা হয়েছিল।
সে সময় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ আন্দোলনকারী সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেই অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়েছিল।
সে জন্য বিচারপতি আহমদকে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং এরপর তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালনের পর নির্বাচন শেষে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে গিয়েছিলেন। এই দুটি বিষয়ে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১১ মাস দায়িত্ব পালন করলেও বঙ্গভবনে ছিলেন না সাহাবুদ্দীন আহমদ।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। তখন দেশের সপ্তদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর পাঁচ বছর বঙ্গভবনে ছিলেন তিনি।
২০০১ সালে বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেওয়ার পর ঢাকার গুলশানের বাড়িতে অনেকটা নিভৃত জীবন যাপন করছিলেন সাহাবুদ্দীন আহমদ।
