ড্রাইভিং সিটেই সাকিব

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২২, ১০:৪১ পিএম

২০১৯ থেকে ২০২২; ওভাল থেকে সেঞ্চুরিয়ন। মাঝে কত ঘটনা, কত উত্থান-পতন আর কালিমা। নিষেধাজ্ঞা থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেছেন ২০২১-এ। সেই থেকে মাঠ নয় তার বাইরের আলোচনায় বারবার শিরোনামে তিনি। অবশ্য যতবার এইসব আলোচনা ডালপালা মেলেছে ততবারই পারফরম্যান্সকে তলোয়ার বানিয়ে সব কেটেছেন সাকিব। যেমন এবারও, ২০১৯ বিশ্বকাপের পর পরশু দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হওয়া ফিরতি ম্যাচে আবারও নায়ক সাকিব। ব্যাট হাতে ম্যাচ জেতালেন বিশ্বকাপের ওই দিনটির মতো। তাতে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ইতিহাস হলো। সাকিব নিজেও গড়লেন মাইলফলক। অথচ এই ম্যাচটিতে তার থাকারই কথা ছিল না। কত নাটকীয়তার পর গেলেন আর পারফরম করলেন। আসলে সাকিব সাকিব-ই, সমালোচনা হোক বা আলোচনা, সবসময় ড্রাইভিং সিটেই থাকেন।

আফগানিস্তান সিরিজ শেষে হঠাৎ বেঁকে বসেন সাকিব। যাবেন না দক্ষিণ আফ্রিকায়। বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপনের ঘোষণার পরও মানসিক ও শারীরিকভাবে অবসাদের কথা বলেন। তার মনে হচ্ছিল– তিনি প্যাসেঞ্জার, ড্রাইভার নন (দলের চালক নন)। এমনটা বলেই চলে যান দুবাই। সেখান থেকে ছুটি চেয়ে তা পেয়েও যান। ফিরে এসে বিসিবি প্রধানের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে আবার মন বদলান সাকিব। দারুণ নাটকীয়তা শেষে দল যাওয়ার পর একা একা যান দক্ষিণ আফ্রিকা। যাওয়ার দিন রাতে অবশ্য বলেছিলেনÑ দলের চালকের আসনে বসতে কে না চায়? সাকিবের মনে সবসময়ই এই ইচ্ছে থাকে। সেই ইচ্ছে থেকেই সবসময় বাংলাদেশের নায়ক তিনি। যেমন ছিলেন ২০১৯ বিশ্বকাপে। ওয়ানডেতে বাংলাদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ তিনি আগেই ছিলেন। শুক্রবার তা আরেক ধাপ বাড়িয়ে ছুঁয়েছেন ইনজামাম উল হক ও অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে। তিনজনেরই ২৪ বার।

মত বদলে রাজি হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা গেলেও সংশয় ছিল একটু। মন খুলে খেলতে পারবেন তো। সাকিব অবশ্য জানিয়েছিলেন দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে চনমনে করে তুলতে সাহায্য করবে। ঠিক তাই হয়েছে কি না জানা যায়নি, হতে পারে এটাই সাকিবের ইচ্ছাশক্তি। মাঠে নামলেই তিনি এমন। গত বিপিএলে ফাইনালের আগের দিন বিজ্ঞাপন শ্যুটিং করতে চলে যান অনুশীলন বাদ দিয়ে। সংবাদ সম্মেলনে কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন বলেছিলেন, সাকিবকে কিছু শিখিয়ে দিতে হয় না। প্রতিপক্ষকে পড়ে ফেলা বা ম্যাচ পড়ার শক্তিটা সাকিবের অনেক। কথাটা সবাই বলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই টানা ভালো করা বা ফর্ম একটু পড়ে গেলেও ত্বরিত ফিরে আসা কোনো বিষয় না সাকিবের জন্য। সেঞ্চুরিয়নে প্রথম ম্যাচে যেমন উইকেটে গিয়েই বুঝে গেছেন এখানে কী করতে হবে, ‘আমি ৭-৮ বল খেলার পর বুঝতে পারি যে উইকেটটা ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো। আমাদের ৩০০’র কাছাকাছি রান করতে হতো। আমাদের শুরুটাও ভালো হয়েছে। লিটন-তামিম ভালো শুরু এনে দিয়েছে। আমাদের জন্য ছন্দটা ধরে রাখা উচিত ছিল। কারণ নতুন বলের উজ্জ্বলতা চলে যাওয়ার পর রান করা সহজ মনে হচ্ছিল। সেই সুবিধাটাই নিতে চেষ্টা করেছি। ভাগ্য ভালো আজ সেটা কাজে লেগেছে। ইয়াসির খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। ওর সঙ্গে আমার জুটিটা ভালো ছিল। ইয়াসিরকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। কারণ সে তার ক্যারিয়ারের চতুর্থ ম্যাচ খেলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে। এটা তার জন্য সহজ ছিল না।’

সাকিবের অসাধারণ ব্যাটিংয়ে আরেকবার মুগ্ধ খ্যাতিমান ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে। জয়ের পর বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে বলছিলেনÑ ‘সাকিব তিনে খেললেই বাংলাদেশকে শক্তিশালী মনে হয়’। হার্শা ভোগলে ভুল বলেননি। ব্যাটিং অর্ডারে তিনে খেলে বিশ্বকাপে সবচেয়ে সেরাটা দিয়েছেন সাকিব। সেই থেকে তিনেই থিতু তিনি। সাকিবের মতো একজন ক্রিকেট মস্তিষ্ক ওপরের দিকে নামলে যে কোনো ইনিংসে বুদ্ধিটা খাটানোর জায়গা তিনি সময় সবই বেশি পান, ‘আমি ভাবছিলাম ওই সময়ই দ্রুত রান করা উচিত ছিল (৩০ ওভারের পর)। তা না হলে আমরা ২৬০-২৭০ রানের বেশি করতে পারতাম না। আমরা যে ছন্দটা পাই ৩০ ওভারের সময়, ওটাই ম্যাচের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। আমরা জানতাম যে ডেথ ওভারে রাবাদা তিন-চার ওভার বোলিং করবে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম যেন তারা রাবাদাকে আগে বোলিং করাতে বাধ্য হয়। সে জন্যই আমাদের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। এটাই আমরা করতে সক্ষম হয়েছি।’

ব্যক্তি সাকিব সফল হয়েছেন কিন্তু বাংলাদেশ হেরেছে এমন খুব কম-ই হয়। এই ধারাটা চলুক আরও অনেকদিন। সাকিব মাঠের বাইরে যেমনই থাকুন, মাঠের ভেতর পারফরমটা করেন ঠিক। হয় ব্যাটে নয়তো বলে, সাকিব সবসময় বাংলাদেশ দলের ড্রাইভিং সিটেই থাকেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত