সাধারণ শেয়ারধারীর ৯০ শতাংশ শেয়ার কিনবেন পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা বেক্সিমকো সিনথেটিকস লিমিটেডের শীর্ষ দুই উদ্যোক্তা এ এস এফ রহমান ও সালমান এফ রহমান। এতে এ দুই উদ্যোক্তা ৫০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করবেন। সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে ‘এক্সিট প্ল্যান’ বাস্তবায়নে করা এক চুক্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর দেশের পুঁজিবাজার থেকে এক্সিট বা বেরিয়ে যাওয়ার জন্য করা বেক্সিমকো সিনথেটিকস লিমিটেডের আবেদনে অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। পরে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে ‘এক্সিট প্ল্যান’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তালিকাচ্যুত হতে চুক্তি করে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য কোম্পানিটি সাধারণ শেয়ারধারীদের হাতে থাকা সব শেয়ার কিনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটির সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বর্তমানে ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৭৮ হাজার ৬২৩টি শেয়ার রয়েছে, যা কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এসব শেয়ার অভিহিত ১০ টাকা করে কিনে নেওয়ার মাধ্যমে বাজার থেকে কোম্পানিটি বেরিয়ে যাবে। এতে এসব শেয়ার কিনতে কোম্পানিটিকে ৫৫ কোটি ৭৮ লাখ ৮৬ হাজার ২৩০ টাকা ব্যয় করতে হবে।
এক্সিট প্ল্যান অনুযায়ী, সাধারণ শেয়ারধারীদের হাতে থাকা মোট শেয়ারের মধ্যে ২ কোটি ৬১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯০টি শেয়ার কিনে নেবেন এ এস এফ রহমান। এতে ব্যয় হবে ২৬ কোটি ১৭ লাখ ৯১ হাজার ৯০০ টাকা। আর সালমান এফ রহমান কিনবেন ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮০টি শেয়ার, যাতে ব্যয় হবে ২৪ কোটি ২৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮০০ টাকা। এ এস এফ রহমান কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এ কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন। এর বাইরে বেক্সিমকো সিনথেটিকসের অবশিষ্ট শেয়ার কিনে নেবে বেক্সিমকো হোল্ডিংস, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্টিজ ও শাইনপুকুর সিরামিকস।
এর আগে পুঁজিবাজার থেকে স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুত হতে ২০২০ সালেও এসইসির কাছে আবেদন করেছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানিটি। কিন্তু তালিকাচ্যুতির সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় এতদিন প্রক্রিয়াটি আটকে ছিল। এরপর এসইসির পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ‘এক্সিট পরিকল্পনা’ করা হয়। তবে তালিকাচ্যুতির আবেদন গ্রহণ করে ওই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন স্থগিত রাখার জন্য দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পর থেকেই দফায় দফায় কোম্পানিটির লেনদেন বন্ধের সময়সীমা বাড়ানো হয়। লেনদেন বন্ধ হওয়ার আগে কোম্পানিটির শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ৮ টাকা ৪০ পয়সা। তবে এক্সিট পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোম্পানিটিকে এখন অভিহিত মূল্য বা ১০ টাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কিনে নিতে হবে।
ড্রন টেক্সচারড ইয়ার্ন (ডিটিওয়াই) নামে এক ধরনের পলিয়েস্টার সুতা উৎপাদন ও বিক্রির জন্য ১৯৯০ সালের ১৮ জুলাই ‘যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর’-এ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় বেক্সিমকো সিনথেটিকস। ১৯৯৩ সালের ৪ ও ৬ নভেম্বর যথাক্রমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কোম্পানির কার্যক্রম ছিল একক পণ্য অর্থাৎ ডিটিওয়াই ঘিরে। তখন যেহেতু ডিটিওয়াইয়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল ফলে কোম্পানিটিও ভালো মুনাফা অর্জন করে এবং ১৯৯৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান করেছে। তবে ২০১৩ সালের পর থেকে কোম্পানি কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি।
২০১৩ সাল থেকে কোম্পানিটি খুবই কঠিন সময় পার করতে থাকে। সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও কোম্পানি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন বা মুনাফা অর্জন করতে পারেনি। এতে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয় তাদের।
বেক্সিমকো সিনথেটিকস তালিকাচ্যুতির আবেদনে জানিয়েছে যে, সিনথেটিকস পণ্য আমদানিতে করহার কমানোর প্রভাবে চীনের সস্তা পণ্যে দেশীয় শিল্প ক্ষতির মুখে পড়ে। এ কারণে বেক্সিমকো সিনথেটিকস ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০১৩ সালের পর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়। টানা সাত বছর বিপুল পরিমাণের লোকসানের কারণে ২০২০ সালে কোম্পানিটি উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
বেক্সিমকো জানিয়েছে, কোম্পানিটির সব মেশিন প্রায় ২৬ বছরের পুরনো, যা এখন স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রিযোগ্য। কর বাবদ সরকার টাকা পাবে। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের কাছে ঋণ রয়েছে, যার জামানত হিসেবে কারখানার জমি বন্ধক রাখা আছে।
এর আগে ইগল বক্স কার্টন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুত হয়েছিল। ২০০৬ সালে এই কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন মূল্যে কিনে নিয়েছিল। এরপর ১৪ বছর পর বেক্সিমকো সিনথেটিকস স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতির আবেদন জানাল।
