দর হ্রাসের সীমা কমানোর পরও বড় পতন

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২২, ১১:৫০ পিএম

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে টানা দরপতনের ধারা তৈরি হলে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তালিকাভুক্ত কোম্পানির দর হ্রাসের সীমা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ২ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়। এতে করে সাময়িকভাবে বিনিয়োগকারীদের ভীতি কিছুটা কমলেও আবারও বড় পতনের মধ্যে পড়েছে দেশের বাজার পরিস্থিতি। নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সাত কার্যদিবস পরই দর হ্রাসের সীমা কমানোর মধ্যে গতকাল রবিবার প্রায় ৮৫ শতাংশ শেয়ারের দর কমেছে। এতে করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৬৭ পয়েন্ট। দর হ্রাসের সর্বোচ্চ সীমা পরিবর্তনের পর এটিই সবচেয়ে বড় পতন।

এদিকে বড় পতনের দিনে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। গতকাল ডিএসইতে শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে ৬১৬ কোটি টাকার, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল লেনদেন হয়েছিল ৬০২ কোটি টাকা। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীরা সাইড লাইনে থাকায় লেনদেনের পরিমাণ কমে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শেয়ারের ক্রয়াদেশ কম থাকায় বেশিরভাগ শেয়ার দর হারিয়েছে। গতকাল সর্বোচ্চ পরিমাণে দর হারিয়েছে প্রায় ১৫০টি সিকিউরিটিজ।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়া, জ¦ালানি তেলের মূল্যে অস্থিরতা ও উৎপাদনমুখী কোম্পানির ব্যয় বাড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া শেয়ারের দর হ্রাসের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশ পরিবর্তন করে আগের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে ফিরিয়ে আনা বিষয়ে গুজবের কারণেও কিছুটা ভীতি তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এসইসির কমিশনার ড. শেখ সামসুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, উপযুক্ত সময় হলে আগের নিয়মে ফিরে যাবে বাজার। তবে এখনো সেই সময় আসেনি। প্রসঙ্গত, গত ৮ মার্চ পুঁজিবাজারে মন্দা ঠেকাতে তালিকাভুক্ত যেকোনো সিকিউরিটিজের দর ২ শতাংশের বেশি কমতে পারবে না বলে এক নির্দেশনা জারি করে এসইসি, যখন টানা দরপতনে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৬৪৭৪ পয়েন্টে নেমে আসে। সেদিন দর হ্রাসের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ) থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিকে আরও ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশনা দেয় কমিশন। এরপর সূচকে কিছুটা উন্নতি দেখা দেয় এবং গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সূচকটি ৬৭৬৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়। তবে গতকালের দরপতনের পর সূচকটি ৬৬৯৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এদিকে বাজারে নজরদারি বাড়াতে গতকাল এসইসি ও ডিএসইর সার্ভেইল্যান্স বিভাগে পরিবর্তন এনেছে কমিশন। গতকাল এক নির্দেশনার মাধ্যমে ডিএসইর রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের (আরএডি) যেসব কর্মকর্তা তিন বছরের বেশি সময় কাজ করছেন, তাদের অন্যত্র বদলির আদেশ দিয়েছে কমিশন। অবশ্য এই বিভাগের সিজিএফআরসির কর্মকর্তারা এ নির্দেশনার বাইরে থাকবেন। একই সঙ্গে এসইসির সার্ভেইল্যান্স বিভাগের নির্বাহী পরিচালক পর্যায়েও পরিবর্তন এনেছে কমিশন।

গতকালের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেনদেন শুরুর সোয়া ১০টা পর্যন্ত সূচক খানিকটা বাড়লেও এরপর থেকে বিক্রিচাপে সূচকে নিম্নমুখী ধারা দেখা দেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর হারানো কোম্পানির সংখ্যা বাড়তে থাকলে সূচকও নিচে নামতে থাকে। বেলা সাড়ে ১১টায় বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৫১ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৭০৮ পয়েন্টে নামে। এরপর হারানো মূল্যসূচক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হলেও তা ব্যর্থ হয়। দিনশেষে ৮৫ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে সূচকটি ৬৬৯৮ পয়েন্টে নামে।

গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৮১টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর কমেছে ৩৪০টির, বেড়েছে ২৩টির ও অপরিবর্তিত ছিল ১৮টির দর। খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল একমাত্র পাট ছাড়া অন্যসব খাত দর হারিয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দর হারিয়েছে কাগজ ও প্রকাশনা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সিরামিক খাত। এছাড়া সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী সিমেন্ট, খাদ্য ও অনুষঙ্গ, প্রকৌশলী, এনবিএফআই, ব্যাংক, সেবা ও নির্মাণ, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বীমা খাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর হারিয়েছে। গতকাল এক দিনে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৬১৬ কোটি টাকা, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। ডিএসইতে লেনদেনের ভিত্তিতে (টাকায়) প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো বেক্সিমকো লিমিটেড, ড্রাগন সোয়েটার, অরিয়ন ফার্মা, আইএফআইসি ব্যাংক, বিএসসি, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, বিডি কম, নাহী অ্যালুমিনিয়াম, আমরা টেকনোলজিস ও সাইফ পাওয়ার।

দর বৃদ্ধির শীর্ষে প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো তাক্কাফুল ইন্স্যুরেন্স, হাওয়া ওয়েল টেক্সটাইল, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, এইচ আর টেক্সটাইল, অ্যাপেক্স স্পিনিং, ব্যাংক এশিয়া, এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ড, ড্রাগন সোয়েটার, প্রাইম ব্যাংক ও আইসিবি এম্পয়িজ প্রভিডেন্ট মিঃ ফাঃ১ স্কিম১।

ডিএসইতে দর কমার শীর্ষে প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো আইএফআইসি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, আমরা নেটওয়ার্কস, বিডি কম, বিডি থাই, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, এনআরবিসি ব্যাংক, এটলাস বাংলাদেশ, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ও জেনেক্স ইনফোসিস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত