’৭১-এ এন্টারপ্রাইজ, সিনেট-কংগ্রেসে আপত্তি

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২২, ১০:৪৭ পিএম

সপ্তম নৌবহরের যুদ্ধজাহাজ এন্টারপ্রাইজ মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করতেই নিক্সন সরকার স্বদেশেও সমালোচনার মুখোমুখি হলো। ১৪ ডিসেম্বর সিনেটর স্টিভেনসন (ইলিনয় থেকে নির্বাচিত তৃতীয় আদালি স্টিভেনসন) বললেন, ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি নিরপেক্ষ আচরণ করার দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যুদ্ধবিরতির এবং বিদেশি সীমান্তের অভ্যন্তর (ভারতের বেলায় পাকিস্তানে, পাকিস্তানের বেলায় ভারতে) থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের অদ্ভুত ধরনের নিরপেক্ষতা একটি পক্ষের প্রতি অধিকতর অনুরাগ পোষণ করার নামান্তর। পশ্চিম পাকিস্তান গণহত্যার যে নতুন জোয়ার উঠিয়েছে তাতে ভুক্তভোগী বাঙালিরা আমাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তুলবে। যদি একটি জাতির জন্ম গর্ভপাতের মতো বিনষ্ট করে দেওয়া হয় তাহলে যারা লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে, তারা আমাদের নীতিকে নিরপেক্ষতার নীতি বলে মেনে নেবে না। যে নীতি একটি জাতির স্বশাসনকে বাধাগ্রস্ত করে সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক শক্তিকে দূরে সরিয়ে দেয় তা কখনো নিরপেক্ষতার নীতি হতে পারে না, তা ভ্রান্তনীতি।

অন্যরা আমাদের পর্যবেক্ষণ করে বহু নমুনা তালিকাভুক্ত করে দেখিয়েছে যে আমাদের নিরপেক্ষতা পাকিস্তানের পক্ষে। যে সত্য আমাদের পেশাগত নিরপেক্ষতাকে সন্দেহগ্রস্ত করে তুলেছে তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ এখন পাকিস্তান নৌবাহিনীর হয়ে কাজ করছে। এ দুটোর একটি হচ্ছে অ্যাটাক সাবমেরিন শত্রুর সাবমেরিন ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত সাবমেরিন, কংগ্রেসের বিধিবিধান মেনে কোনো ধরনের ঋণচুক্তি না করেই তা পাকিস্তানকে প্রদান করেছে। এই দুটো যুদ্ধজাহাজ হচ্ছে : ডিয়াব্লো ৩১১ ফুট, ২৪০০ টন, ১০ টর্পেডো টিউবযুক্ত অ্যাটাক সাবমেরিন; অন্যটি মিশন শাস্তা ক্লারা, ৫৫০ ফুট, ১৬০-ক্রুর ১৬৫০ টন নৌবাহিনীর কার্গো। পাকিস্তান এ দুটো জাহাজকে নব নামায়ন করেছে : গাজী ও ঢাকা। জাহাজ ধার দেওয়া কর্মসূচির আওতায় ৩৭টি দেশকে ২৯৫টি জাহাজ দেওয়া হয়েছে পাকিস্তান সেসব দেশের অন্তর্ভুক্ত। এই জাহাজ ঋণ পাকিস্তানের বেলায় কেমন করে যৌক্তিকীকরণ করা যায় যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে এ জাহাজ দেওয়ার কথা। পাকিস্তান ও এ দুটি দেশের মধ্যে নৌ-চলাচলের উপযোগী কোনো জলসীমাই নেই। বরং ভারতের সঙ্গে রয়েছে। আর এর ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব কমানোর পরিবর্তে তা বাড়াচ্ছে। পাকিস্তানকে যে জাহাজ, ট্যাংক ও সামরিক সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে তার ব্যবহার ভারতের বিরুদ্ধে। 

তাতেই ভারতের ওপর তথা উপমহাদেশের ওপর সোভিয়েত প্রভাব সংহত করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, ভারতীয় উপমহাদেশ পরাশক্তির অস্ত্র-প্রতিযোগিতার রণক্ষেত্রে পরিণত হতে চলেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোকে আমরা ভারত ও পাকিস্তানের নিরীহ জনগণকে চরম মূল্য দিতে দেখেছি। যুদ্ধজাহাজ ঋণ কর্মসূচিটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ, যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ঋণের জাহাজ যখন একটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াইয়ে ব্যবহৃত হয় যোগসাজশের দায় যুক্তরাষ্ট্র এড়াতে পারে না। কিন্তু এ জাহাজ যদি বিক্রি করে দেওয়া হতো কিংবা অনুদান হিসেবে দেওয়া হতো তাহলে দুষ্কর্মের সহযোগী হওয়ার দায় থেকে মুক্তি পেত। জাহাজ ঋণের সুবিধাজনক দিক জাহাজটি ফেরত পাওয়া যায় বাস্তবে তা কখনো হয়ে উঠে না। গ্রহণকারী দেশ জাহাজে যথেষ্ট বিনিয়োগ করে তাদের উপযোগী করে তোলে, ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর আমরা চিলি, পেরু কিংবা পাকিস্তানকে জাহাজ ফিরিয়ে দিতে বলিনি।

জাহাজ ঋণ কর্মসূচিতে আমাদের জাহাজের মালিকানা নিজেদের হাতে রেখে আমরা বরং নিজেদের ক্ষতি করছি এবং সোভিয়েত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করছি। পাকিস্তান আমাদের জাহাজ ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দায় ফেলবে। কাজেই এই জাহাজ ঋণ কর্মসূচিটি ক্রমান্বয়ে গুটিয়ে ফেলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে। মিসৌরি থেকে নির্বাচিত সিনেটর টমাস ফ্রান্সিস এগলটন (১৯২৯-২০০৭) ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাক ভারত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমানবাহী রণতরী এন্টারপ্রাইজ কেন বঙ্গোপসাগরে সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। তার প্রশ্ন, আমেরিকান টাস্কফোর্স কেন এশিয়ার নতুন রণাঙ্গনের দিকে ছুটছে? প্রকৃত সত্য হচ্ছে এন্টারপ্রাইজ যে বঙ্গোপসাগরে এ নিয়ে ভিন্ন কিছু শোনানোর সুযোগ নেই। সিবিএস টেলিভিশনের মারভিন কাল্ব আজ সকালে (১৫ ডিসেম্বর) এ কথাই বলেছেন। তার প্রশ্নের জবাবে প্রশাসন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নিশ্চুপ থাকাকেই বঙ্গোপসাগরে এন্টারপ্রাইজের উপস্থিতির নিশ্চয়ন বলে মনে করা যেতে পারে।

প্রতিরক্ষার সেক্রেটারি অব স্টেট মেলভিন রবার্ট লেয়ার্ড (১৯২২-২০১৬) গত সোমবার (১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১) দেওয়া তার বিবৃতিতে রণতরীর চলাচল নিয়ে কোনো কথা বলেননি বরং মার্কিনিদের উদ্ধার করে আনার (পূর্ব পাকিস্তান থেকে) কোনো আকস্মিক জরুরি পরিকল্পনার কথা বলেছেন। প্রথম পাঠে যে কেউ আমেরিকানদের উদ্ধার করাই বুঝবেন, উদ্ধারকর্মে প্রেসিডেন্টের স্বীকৃত অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন করবে না। কিন্তু এখনো যারা ঢাকায় রয়ে গেছেন তারা স্বেচ্ছায়ই রয়ে গেছেন। আজ সকালের নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট :

অবরুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় যেসব বিদেশি আছেন, আকাশপথে যাদের উদ্ধার করা হয়েছে তাদের বাইরে ৪৭ জন আমেরিকান স্বেচ্ছায় এ দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন। হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের অন্য কোথাও কজন আমেরিকান থাকতে পারেন যারা চান তাদের উদ্ধার করা হোক। কিন্তু প্রতিরক্ষা সেক্রেটারির কাছে কি এমন সূত্র আছে যার বরাত দিয়ে তিনি বলতে পারেন যে আমেরিকানদের উদ্ধার করতে এন্টারপ্রাইজ পাঠানো হয়েছে। নাকি পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্ধার করতে এন্টারপ্রাইজ পূর্ব পাকিস্তানের দিকে ছুটেছে? প্রথম চোটে মনে হতে পারে এটা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ মানবিক দয়া প্রদর্শন। যে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে পাকিস্তানের এই সৈন্যরা যখন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের জবাই করছিল তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এই দয়া কোথায় ছিল? আসলে পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্ধার করার নামে এই হস্তক্ষেপ ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হবে যেখানে ভারত পরবর্তী সময়ের দর-কষাকষি ও সমঝোতার জন্য যত বেশি সম্ভব সৈন্য জিম্মি হিসেবে আটক রাখতে চাইবে।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্ধার করার প্রশ্নে পেন্টাগনের যে উদ্দেশ্যই থাকুক আমি যে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি তা হচ্ছে এন্টারপ্রাইজের উপস্থিতিতে পাকিস্তানের হাইকমান্ড নিঃসন্দেহে মনে করবে এবং আশা করবে যে কোনো না কোনোভাবে গ্যারিসনের সব সৈন্য নিরাপদে পাড়ি দেবে, এই আশা থেকে তারা গ্যারিসন ধরে রাখার আদেশ দেবে, যার মানে দাঁড়াবে অপ্রয়োজনীয় আরও বেশিসংখ্যক হত্যাকা- ও হানাহানি। এই পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ বাইরে থাকাটাই কি আমাদের জন্য অধিকতর মানবিক নয়? বরং আমাদের উচিত হবে রেড ক্রসকে গ্রহণ করার জন্য ভারতের ওপর চাপ দেওয়া, যাতে বন্দি প্রত্যেকটি সৈন্য ও সম্ভাব্য সব বন্দি যেন সুরক্ষা লাভ করে।

আমরা আর একটি প্রশ্ন করতে চাই : বঙ্গোপসাগরে এন্টারপ্রাইজ কি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির পতাকা প্রদর্শন করবে, যাতে ভারতের ওপর সোভিয়েত প্রভাব নাকচ হয়ে যায়? কমান্ডার ইন চিফের মনে কি তাই আছে তিনি এ নিয়ে কত দূর এগোবেন? ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবেন? বঙ্গোপসাগরে রুশ জাহাজ পেলে তাতে আক্রমণ চালাবেন? যদি তা না হয়ে থাকে তবে কি আমরা কাগুজে যুদ্ধের ‘পেপার টাইগারিজম’ চর্চা করছি? ভারতের ওপর ক্রমবর্ধমান রুশ প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানাতে চাই, পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা নিরসনের প্রস্তাব আমাদের প্রশাসনের ক্রমাগত প্রত্যাখ্যানের পর গত গ্রীষ্মে যে ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে থেকেই এই প্রভাব ক্রমাগত বেড়ে উঠেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়ে তাদের সীমিত সম্পদের ওপর অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে যে নির্যাাতন চালানো হয়েছে তা যে পাকিস্তানের কোনো কাজে আসবে না, এটা পশ্চিম পাকিস্তানি বন্ধুকে (জেনারেল ইয়াহিয়া খান) বলার মতো যথেষ্ট প্রভাব কি আমার প্রেসিডেন্টের (রিচার্ড নিক্সন) আছে?

ভারতের যখন বন্ধুর প্রয়োজন হলো তারা আমাদের পেল না, কিন্তু তখন রাশিয়া হাত বাড়িয়ে দিল। যখন ভারতীয় উপমহাদেশে যুদ্ধ ক্রমেই আসন্ন হয়ে উঠল আমরা তা প্রতিহত করার কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করলাম না। স্পিকারকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট এখন দেখা যাচ্ছে আমরা এমন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি যা পূর্ব পাকিস্তানের যাতনাকে আরও প্রলম্বিত করবে এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে আমেরিকাই এশিয়ার যুদ্ধ বাধানোর জন্য দায়ী থাকবে। আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য সাড়া দিতে বড্ড দেরি করে ফেলেছি, শান্তি রক্ষায় সাড়া দিতে পারিনি কিন্তু একটি স্থানীয় যুদ্ধকে এশিয়ার যুদ্ধে পরিণত করেছি এবং একে বৃহৎ শক্তির মোকাবিলা করার যুদ্ধে পরিণত করতে যথাসময়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আমরা কেমন করে এখন দূরে থেকেও যে এশীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লাম কল্পনা করা কঠিন আমি তা স্বীকার করি। এটা প্রেসিডেন্টের গুয়াম ডক্টরিনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ, যেখানে শান্তির প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ২৫ জুলাই ১৯৬৯ যুক্তরাষ্ট্রের দখলাধীন পশ্চিম প্রশান্তি মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়ামে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ঘোষণা ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসানের ইচ্ছে এবং বিপন্ন রাষ্ট্রসমূহের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রদান। আমি এখনো বিশ্বাস করতে চাই না আমাদের প্রশাসন এই যুদ্ধে জড়াতে চায়। আমি আশ^স্ত যে, পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তির কোনো উদ্যোগ এখনো নেই, হলে স্মরণ রাখতে হবে এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে।

পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে আমাদের যে নীতি আমি দেখতে পাচ্ছি তাতে আমরা এক ভ্রান্তি থেকে অন্য ভ্রান্তিতে পতিত হচ্ছি, আমি বিস্মিত হই দুর্ঘটনাক্রমে জড়িত হওয়া এড়ানোর দক্ষতা কি আমেরিকার নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত ভূমিকাকে প্রেসিডেন্ট নিশ্চয়ই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন একজন উচ্চপদস্থ হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার বহুল আকাক্সিক্ষত মস্কো সফর বাতিল করে দিতে পারেন। যে উদ্দেশ্যেই করে থাকুন না কেন এন্টারপ্রাইজকে পাঠানো ভয়ংকর একটি পদক্ষেপ। আজ আমি কংগ্রেস সদস্য এবং আমেরিকার জনগণের সামনে ওয়ার্নিং ফ্ল্যাগ উত্তোলন করছি, যাতে আমরা আবার না বেশি দেরি করে ফেলি।

লেখক : সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত