বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীর গতির কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় সেভাবে হচ্ছে না। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে পর্যাপ্ত ঋণ আসছে। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নেওয়া ঋণ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ঋণ শোধ করায় সরকারের নিট ব্যাংকঋণ লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া সরকারের নিট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩০১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা; যা এ খাতের ঋণের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা মহামারী দেখা দেওয়ার পর থেকে সরকারের ব্যাংকঋণ কমে এসেছে। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট কোনো ঋণ ছিল না। বরং আগের অর্থবছরের ঋণের ২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাস শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পুঞ্জীভূত স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। গত বছরের জুনে সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা।
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে মোট ২৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া পুরনো ঋণ শোধ করা হয় ১৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। ফলে নিট ঋণ কমে ৮ হাজার ৩০১ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ আসে ২ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। এ নিয়ে আলোচিত আট মাসে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকায়।
অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম ঋণ আসছে আলোচিত অর্থবছরে। এ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা নিট ঋণ করেছে সরকার। এ খাতে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ রয়েছে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।
এদিকে বাজেটের প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন ব্যয় না হওয়ায় সম্প্রতি এডিপি কাটছাঁট করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। উন্নয়ন ব্যয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৭ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা কমিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়েছে। মূলত সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে খরচ কাটছাঁটের কারণেই উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৮ শতাংশ কমছে, যার পুরোটাই বিদেশি উৎস থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়ার কথা ছিল।
সংশোধিত এডিপিতে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, যমুনার ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু, সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) সড়ক সংযোগ প্রকল্পের এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর চার লেন সড়ক ও পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণে বরাদ্দ কমিয়েছে সরকার।
সংশোধিত এডিপিতে ২ লাখ ৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ কোটি এবং বৈদেশিক খাত থেকে ৭০ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। মূল বাজেটে চলতি অর্থবছরে এডিপির বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা।
