নির্ধারিত সময়ের পরও অফিস করতে রাজি না হওয়ায় খুলনার কয়রায় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সচিবকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। গত সোমবার রাতে কয়রার মহারাজপুর ইউপি কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। আহত ইউপি সচিব ইকবাল হোসেনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ইউপি সচিবকে পেটানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল।
এদিকে মারধরের পর কয়রার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কয়রা থানার ওসি ঘটনাস্থলে গিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেন বলে জানিয়েছেন ইউপি সচিব ইকবাল হোসেন। তার ভাষ্য, একপর্যায়ে উভয় পক্ষের বর্ণনা শুনে ইউএনও সাদা কাগজে লিখিত নিয়ে তাকে বাড়ি পাঠান।
ইউপি সচিব ইকবাল হোসেন জানান, ইউনিয়ন পরিষদের কাজ শেষে সোমবার বিকেলে তিনি বাড়ি চলে যান। পরে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে কিবরিয়া ও হাফিজুল নামে চেয়ারম্যানের দুজন লোক তাকে ফের পরিষদে নিয়ে যেতে তার বাড়িতে যায়। তাদের কথাবার্তায় ভয় পেয়ে তিনি ফোন দিয়ে বিষয়টি স্থানীয় সরকার খুলনার উপপরিচালকে অবহিত করে বাড়ি থেকে বের হন। পরে পরিষদে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই তার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে পেটানো শুরু হয়।
ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমি পা ধরেছি, তবুও পেটানো বন্ধ করেনি। একপর্যায়ে ইউএনও স্যার ও ওসি স্যার আসার পরে সব ঘটনা শোনেন। শোনার পরে ইউএনও স্যার আমাকে বলেন, “জানাজানি হলে চাকরি চলে যাবে। তা ছাড়া বিভিন্ন সমস্যা হবে।” আমি তখন যন্ত্রণায় কাতর ছিলাম। চিকিৎসা নেওয়ার জন্য বের হতে চাইলেও আসতে দেয়নি। পরে বাধ্য হয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে চলে আসি।’
ছেলের ওপর নির্যাতনের বিচার দাবি করে ইকবাল হোসেনের মা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি পরিষদে যাই। চেয়ারম্যানের লোকজন আমার কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নেয় এবং ছেলের সঙ্গে দেখা করতে না দিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে ভয়ভীতি দেখায়। মীমাংসার জন্য প্রেসার দেয়। পরে ইউএনও স্যারের উপস্থিতিতে পুনরায় মারার পরিকল্পনা করলে স্যারকে বলি, “আমাদের মাফ করেন, যা হয়েছে এ পর্যন্ত মীমাংসা করে আমাদের যেতে দেন।” পরে লিখিত দিয়ে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি আসি।’
তবে চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ সচিবকে পেটানোর অভিযোগ অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি পঙ্গু লোক এসেছিল ওয়ারেশ কায়েমের জন্য। আমি তখন সচিবের স্বাক্ষরের জন্য পাঠালাম। সে এসে বলল, সচিব নেই। তখন ৫টা ১৫ মিনিট। তখন সচিবকে ফোন দিলাম। সে ধরে না। কয়েকবার ফোন দেওয়ার পরে ধরে বলে “আমি বাজারে আছি, এখন আসতে পারব না।” তখন ইকবালকে বললাম পঙ্গু লোকটি আবার কাল আসবে। সে আমাকে বলল, “আমি ১০-৫টা অফিস করব। এরপরে আর কাজ করতে পারব না।” তখন আমি দুজনকে পাঠালাম তাকে ডেকে আনার জন্য। সে আসল, আমার রুমে গেল, তখন কথাবার্তা হলো। সে ভুল স্বীকার করল। এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল আমি ইকবালকে মেরেছি। তখন ইউএনও, ওসিসহ অনেকে এলেন। আজ (গতকাল) সকালে শুনছি তাকে আমি মেরেছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কয়রা থানার ওসি মো. রবিউল হোসেন বলেন, ‘সেখানে একটি ঘটনা ঘটেছে এমন খবর পেয়ে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে সে (সচিব) বলল, “আমার কিছু হয়নি, একটু ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে।” বলে ইউএনও সাহেবের কাছে লিখিত দিয়ে তারা চলে আসল। আমিও চলে আসলাম।’
আর কয়রার ইউএনও অনিমেষ বিশ^াস বলেন, ‘ঘটনা শুনেই আমি ও ওসি সাহেব সেখানে যাই। তখন সে (সচিব) বলেছে, “আমার কিছু হয়নি। চেয়ারম্যানের সাথে একটু ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে। আমরা সমাধান করে নিয়েছি।” তখন আমি বললাম, তাহলে একটি লিখিত দাও। সে লিখিত দিয়ে চলে গেল। ওসি সাহেব তাকে অনেকবার এ বিষয়ে জানতে চাইল, সে তখন কেন বলল না। তা ছাড়া কয়রায় হাসপাতাল থাকতে কেন খুলনায় গিয়ে ভর্তি হলো? এ বিষয়গুলোর উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।’
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার খুলনার উপপরিচালক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘গত রাতে (সোমবার) সে (সচিব) আমায় ফোন দিয়েছিল। সে বলেছিল চেয়ারম্যানের লোক তাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তখন ইউএনওকে বিষয়টি জানাই। পরে রাতে ইকবাল ফোন করে বলল, কোনো সমস্যা হয়নি। আজ (গতকাল মঙ্গলবার) সকালে হাসপাতালে ইকবাল ভর্তি হলে আমি গিয়ে দেখি তার বাম হাতে ব্যান্ডেজ। তার এক্স-রে রিপোর্ট দেখে ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম তার হাতের কয়েক জায়গায় চটে গেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ মারধর করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ইকবালের কাছে জানতে চাইলাম কাল রাতে কেন মিথ্যা কথা বললে? উত্তরে সে বলল, “আমাকে খুব ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল।” আমি ইউএনওকে পাঠালাম বিষয়টি দেখার জন্য, ইকবালকে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু তিনি কী করলেন বুঝতে পারলাম না। এখন আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে আইনি পদক্ষেপ নেব।’
