হত্যা ও অশান্তি নয়

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২২, ১০:২৬ পিএম

ইসলাম সর্বদা শান্তির কথা বলে। শান্তি ও সাম্য ইসলামের সৌন্দর্য। যে সৌন্দর্যের শিক্ষা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামসহ গোটা উম্মতকে দিয়েছেন। কোরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করার পাশাপাশি উৎসাহ ও প্রাসঙ্গিক বিধিবিধান বলা হয়েছে।

একথা সত্য যে, আবির্ভাবের ১ হাজার ৪০০ বছর পর ইসলাম ধর্ম বর্তমান বিশ্বে একটি অদ্ভুত বিরূপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে পশ্চিমা দুনিয়ার একাংশ ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদকে সমার্থক করে তোলার নিরন্তর প্রয়াস চালাচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বেরই আরেকাংশ ইসলামকে সহনীয় গণতান্ত্রিক পরিসরে রেখে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। উভয় পক্ষই ইসলামের মূল বাণী ও শিক্ষার মধ্যপন্থি চিন্তাধারা ধারণ করতে নারাজ। ফলে ইসলামের বিষয়টি সারা দুনিয়ায় একটি জটিল রূপ নিয়েছে। কথিত সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা হিসেবে ইসলামকে দাঁড় করানোর প্রয়াসও হচ্ছে নানাভাবে। তাই পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে ইসলামের মেলবন্ধনের বিষয়টি দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে।

একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, দুনিয়াজুড়ে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর আসছে, যেখানে ইসলামকে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। আত্মঘাতী বোমা হামলা, দাঙ্গা, ফতোয়াবাজি, গেরিলা আক্রমণ ও ভিডিও বার্তায় হুমকির মতো বিভিন্ন ঘটনা দুনিয়ার যেখানেই ঘটছে, সেখানেই চালিকা হিসেবে দেখানো হচ্ছে ইসলামকে। পাশ্চাত্যের নয়া রক্ষণশীলরা বিশ্ববাসীর মনে এমন ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ হবে ইসলামের সঙ্গে বাকি সভ্যতার। এমন সব উদ্ভট কথা ও চিন্তার কারণে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অশান্তির মূল কারণ মনে করা হচ্ছে, কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে ইসলামকেওযা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বর্তমান পৃথিবীতে স্বার্থসিদ্ধি, স্বার্থচিন্তা, অবিচার ও বাড়াবাড়ি ব্যাপকতা লাভ করেছে। ফলে শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার নামে মানুষকে প্রতারিত, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অবিচার করা হয় এবং পৃথিবীর চিরন্তন নিয়ম, বিধি ও ব্যাখ্যা পরিহার করে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়। এসবই মূলত অন্যায়-অবিচারের মাধ্যম ও মহান স্রষ্টা আল্লাহর অবাধ্যতার পথ। মানবসভ্যতাকে রক্ষার জন্য এই রীতি ও প্রবণতা পরিবর্তন করে তাদের সামনে সঠিক ও কল্যাণের পথগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন, এটাই ইসলামের শিক্ষা। যে শিক্ষায় নেই কোনো জবরদস্তি, হুমকি কিংবা রক্তপাতের কথা।

ইসলামের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো, মানবজাতিকে কল্যাণের পথে পরিচালনা করা; সর্বোপরি মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা। ইসলাম মানবজীবনের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করে। ইসলাম শব্দের আভিধানিক অর্থ নিজেকে আল্লাহর সামনে সমর্পণ করা। কোনো ব্যক্তি তখনই মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন সে তার ভেতর ও বাহির, স্বভাব ও কর্মকাণ্ড সব কিছু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদন করে। স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহ মানুষের স্বভাব, চরিত্র, প্রকৃতি, যোগ্যতা ও প্রয়োজন সব কিছুই জানেন। ফলে তিনি মানুষের জন্য যে জীবনবিধান ও জীবনপ্রণালী নির্ধারণ করেছেন তা মানুষের প্রয়োজন, সামর্থ্য ও যোগ্যতার অনুকূল। শুধু তা-ই নয়, তিনি এ আনুগত্যের বিপরীতে তাদের জন্য রেখেছেন নিশ্চিত কল্যাণ ও সাফল্য। এই সাফল্য তখনই আলোর মুখ দেখে না, যখন তারা নিজেরা মনমতো কোনো আচরণ করে, ইসলামকে নিজের ইচ্ছামতো প্রকাশ ও প্রচার করে।

দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান বিশ্বে যেসব স্থানে শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে, রক্তপাতের ঘটনা ঘটছেতার বেশিরভাগই হচ্ছে নিজের কিংবা নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ে। মানবকল্যাণ, মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব সেখানে নেই বললেই চলে। নিজের সামান্য স্বার্থরক্ষা, নিছক সন্দেহ অথবা ভিত্তিহীন ভয়ের কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবন হুমকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, তাদের ঘরছাড়া করা হচ্ছে, বসতভূমি থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে। কেউ আবাসভূমি ত্যাগ করতে না চাইলে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে সারা বিশ্বে বিশৃঙ্খলা ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ছে, মানুষ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, আস্থা ও ভালোবাসার পরিবর্তে সন্দেহ ও বিদ্বেষ জায়গা করে নিচ্ছে। এককথায় পুরো মানবসভ্যতা হুমকির মুখে পড়ছে।

ইসলামের স্পষ্ট কথা, মানবজীবন আল্লাহপ্রদত্ত আমানত। তাতে অনর্থক হস্তক্ষেপ করা যাবে না। অপ্রয়োজনে রক্তপাত কিংবা অঙ্গহানি করা যাবে না। সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে হবে। নিজেকে যেমন সুরক্ষিত কামনা করেন, অন্যকেও তেমন সুরক্ষা দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমের একাধিক আয়াত ও রাসুলের হাদিস রয়েছে। মানবজাতির ক্রান্তিলগ্নে কোরআন-হাদিসের শিক্ষার আলোকে জীবন গঠন করতে হবে। মহান আল্লাহ শান্তি, কল্যাণ, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে যে অমীয় সুধা দান করেছেন, তা যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে হবে।

স্বার্থ হাসিল কিংবা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে ইসলামের দোহাই দিয়ে কোনো অবস্থায় মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাস করা যাবে না। প্রকৃত মুসলমান কখনো সন্ত্রাসী হতে পারে না। কারণ সন্ত্রাসী হওয়ার জন্য কোরআন মাজিদ সবচেয়ে বড় বাধা। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে।’ সুরা নিসা : ৯৩

বর্ণিত আয়াতে হত্যাজনিত অপরাধের কারণে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি অন্যায় হত্যাকে ইসলাম বিশ্বমানবতাকে হত্যার সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে। কোরআন বলছে, ‘নরহত্যা কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করা ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল।’ সুরা মায়েদা : ৩২

এভাবে আরও বহু আয়াতে হত্যার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ইসলাম অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিমকেও হত্যায় উৎসাহিত করে না। এভাবেই ইসলাম হত্যা, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইসলামের এই শিক্ষা মুসলমানরা হৃদয়ে লালন করলে অন্তত মুসলমানের হাত কোনো মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হতো না।  লিখতে হতো না আজকের দিনে বাংলাদেশে পরিচালিত গণহত্যার কথা।

আজ সেই ভয়াল ২৫ মার্চ, বাঙালির ইতিহাসের কালরাত। নিরীহ বাঙালির ওপর ১৯৭১ সালে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো বর্বর গণহত্যার ভয়াবহ স্মৃতিজড়িত ইতিহাসের এক অধ্যায়। ওই দিন থেকে শুরু করে পুরো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। অথচ পাকিস্তানি বাহিনীও ছিল মুসলিম সংখ্যাধিক্যের সেনাবাহিনী।

অন্যদিকে, হানাদারদের পৈশাচিক হামলায় মৃত্যুবরণকারীরা ছিলেন নিরস্ত্র। এই গণহত্যা স্পষ্ট জুলুম-অবিচার ও হারাম। হত্যা তো দূরের কথা ন্যূনতম রক্তপাতও যেখানে ইসলাম সমর্থন করে না, সেখানে গণহত্যাকে কোনোভাবেই ইসলামরক্ষার নামে বৈধ করার কোনো সুযোগ নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলো একাত্তরে সেই অপচেষ্টাই করা হয়েছিল, যা কোনোভাবেই ইসলামের শিক্ষা ও চেতনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত