ইন্দ্রাণী ও ফেরদৌসের স্মৃতিতে অভিষেক

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ১২:১০ এএম

জনপ্রিয় এই তারকার শেষ বিদায়ে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্রপ্রাপ্ত দুই চিত্রতারকা ইন্দ্রাণী হালদার ও ফেরদৌস আহমেদ। কথা বলেছেন মাসিদ রণ

অকালেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন কলকাতার চলচ্চিত্র অঙ্গনে সবার প্রিয় ‘মিঠুদা’। কিন্তু কলকাতা ও বাংলাদেশের দর্শক তাকে নব্বই দশকের পর্দা কাঁপানো চিত্রনায়ক হিসেবেই জানেন। সে সময় পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্রশিল্পের হাল ধরেছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, তাপস পাল, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী এবং এই অভিষেক চট্টোপাধ্যায়। গত বুধবার কলকাতার চ্যানেল স্টার জলসার রিয়েলিটি শো ‘ইসমার্ট জোড়ি’র সেটে ছিলেন তিনি। সকাল থেকে টানা শ্যুটিং করছিলেন। তখনই হৃদরোগে আক্রান্ত হন এই অভিনেতা। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কিছু ওষুধ খাওয়ানো হয় তাকে। কিন্তু শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। রক্তচাপ নেমে আসে ৮০-তে। একসময় বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গতকাল ভোরে তিনি বাড়িতে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। সপরিবারে বেড়াতে যাবেন বলে ছুটি নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বেড়ানো আর হলো না। অভিনয় ছিল তার প্রাণ। লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তিনি। ১৯৮৬ সালে ‘পথভোলা’ সিনেমা দিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল অভিষেকের। ২০২১ সালেও তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। অভিষেক অভিনীত সিনেমার মধ্যে রয়েছেগীত সংগীত, লাঠি, সুজন সখী, জয়বাবা ভোলানাথ, বাদশা, তুমি কত সুন্দর, মায়ের আশীর্বাদ, অমর প্রেম, তুফান, সুরের আকাশে, মায়ের আঁচল, বাড়িওয়ালা, আলো, দহন, মধুর মিলন

প্রভৃতি। সম্প্রতি ধারাবাহিক টাপুর টুপুর, মোহর, কুরুক্ষেত্র, চোখের তারা তুই, অন্দরমহলসহ বেশকিছু টেলিফিল্মে অভিনয় শুরু করেছিলেন এবং সেখানেও দর্শকের মন জিতে নেন অভিষেক।

পরম বন্ধু হারালাম

ইন্দ্রাণী হালদার

বহু পুরনো বন্ধু আমরা। কত বছর গোনা গাঁথা নেই। অসংখ্য হিট সুপারহিট ছবিতে কাজ করেছি। প্রথমেই বলব, মিঠু ছিল একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা। সপ্তমী, জামাইবাবু, সত্যম শিবম সুন্দরমের মতো বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতে যেমন একসঙ্গে কাজ করেছি, তেমনি দহনের মতো সমালোচকপ্রিয় ছবিতেও তাকে সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছি। অভিনেতার বাইরে দারুণ মনের মানুষ ছিল সে। সারাক্ষণ মজা করতে ভালোবাসত, মজার কথা বলে হাসাত। তার মন ছিল খুব পরিষ্কার। মনের ভেতর যা লালন করত সেটাই বেবাক বলে দিত। এতে কে খুশি হলো, কে রাগ হলো এগুলোর ধার ধারত না। আমিও কিছুটা একই স্বভাবের। এজন্যই আমাদের বন্ধুত্বটা বেশি গাঢ় ছিল কিনা কে জানে! এখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে শেষ দিনগুলোর কথা। অনেক কষ্ট নিয়ে লোকটা অজনায় পাড়ি দিল। সে কথা আজ নাইবা বলি! শেষদিকে নিজের ওপর যতœটা একটু কমে গেছিল বোধ হয়। আমি তাকে দেখা হলেই বলতাম, তোর চেহারাটা এত সুন্দর। কিন্তু দিন দিন অনেক মোটা হয়ে যাচ্ছিস। তোর বাড়িতেই জিম, ভুঁড়িটা কমা। একটুও রাগ করত না। এক গাল হেসে বলত, দেখিস এবার সত্যি ফিট হয়ে যাব। কিন্তু তা আর সে পারত না। আবার দেখা হলে একই কথা বলতাম। আমার ‘শ্রীময়ী’ আর ওর ‘মোহর’ সিরিয়ালের শ্যুটিং সেট ছিল পাশাপাশি। তখন প্রায়ই দেখা হতো। কত আড্ডা হতো। সর্বশেষ দেখা হয়েছিল গত ডিসেম্বরে। এ বছর আর দেখা হয়নি (কান্না)! সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তার মৃত্যুর খবরটা পেয়ে আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। বয়স কতইবা হয়েছিল! তাকে শেষ দেখা দেখতে গিয়েছিলাম। নিজ হাতে একটু সাজিয়ে দিলাম। দুপুরে বাড়ি ফিরে বুকটা কেমন খালি খালি লাগছে। পরম বন্ধু হারালাম। তবে সে আজীবন থেকে যাবে তার কর্মে।

বাংলাদেশের রিমেক ছবিতে প্রচুর কাজ করেছেন

ফেরদৌস আহমেদ

আমার প্রথম সিনেমা ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র সময় থেকেই যে অল্প কজন তারকার সঙ্গে পরিচয় তার মধ্যে মিঠুদা অন্যতম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা খুব ভালো বন্ধু। কোথাও দেখা হলে দারুণ স্নেহ করতেন। সর্বশেষ দেখা হয় করোনার আগে কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে। আমার সন্তানদের খোঁজখবর নিলেন। অভিনয়তো খুব সাবলীল ছিলই, দেখতে সুদর্শন এই অভিনেতা মানুষ হিসেবেও ছিলেন মজার। তারকাসুলভ আচরণ তার মধ্যে কোনোদিন দেখিনি। খুবই সাদামাটা জীবন ছিল তার। মজা করে আমাকে বললেন, দেখেছ ফেরদৌস, সময় কতো বদলে যায়। এখন আমরা নিজেদের চেয়ে সন্তানের খবরাখবর নিচ্ছি বেশি। তার সঙ্গে আমি অভিনয়ও করেছি তিন-চারটি ছবিতে। সবেচেয়ে বেশি মনে পড়ছে বাংলাদেশের পরিচালক দীলিপ বিশ্বাসের ছবি ‘আমাদের সংসার’-এর কথা। সেখানে তিনি মামা আর ভাগ্নে চরিত্রে দারুণ মজার কিছু দৃশ্যে অভিনয় করেছিলাম। এ ছাড়া একসঙ্গে করেছি ‘রঙ-বেরঙ’, ‘এই অরণ্যে’ ছবিগুলো। মজার বিষয় হলো, তিনি স্বপন সাহার পরিচালনায় বাংলাদেশের প্রচুর রিমেক ছবিতে কাজ করেছেন। তার মৃত্যুতে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। তাকে আজীবন মিস করব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত