ইউক্রেনে ধ্বংসযজ্ঞ, যুদ্ধ বন্ধে নেই অগ্রগতি

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ০১:০০ এএম

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অভিযান এক মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। এদিন রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কোনোশেনকভ নতুন করে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ইজিয়াম শহর দখলের নেওয়ার দাবি করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাবাহিনী আজ (গতকাল) সকালে দেশটির খারকিভ অঞ্চলের শহর ইজিয়ামের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন।’ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও এ দাবি স্বীকার করে বলেছেন, দখল ফিরে পেতে ইজিয়ামে তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, যুদ্ধের এক মাসে দক্ষিণাঞ্চলের খেরসানের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শুধু দখলে নিতে পেরেছে রুশ বাহিনী। মারিওপোল অবরুদ্ধ করলেও দখলে নিতে পারেনি। উত্তরাঞ্চলীয় শহর খারকিভে দুদিক থেকে টানা বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সহজ জয়ের ভাবনা বেশ ধাক্কা খেয়েছে। তারা এখন নিজেদের শক্তিক্ষয়ের চক্রে পড়েছে, প্রলম্বিত হতে যাচ্ছে যুদ্ধ। যদিও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটছে ব্যাপক মাত্রায়। এতে ক্ষতি যা হওয়ার হচ্ছে বেসামরিক নাগরিকদের। এরই মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এক কোটি মানুষ। এর মধ্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন ৩৬ লাখ।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এর প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমারা পুতিন ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরসহ দেশটির ওপর তিন হাজারের বেশি অবরোধ দিয়েছে। এসব অবরোধ মূলত আর্থিক। এতে রাশিয়ার অর্থনীতি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। অন্যদিকে রণাঙ্গনেও তারা কাক্সিক্ষত লক্ষ্য থেকে অনেকটাই দূরে। শুরুতে যতটা সহজে কিয়েভের পতন ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছিল, তা হয়নি বলছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বোমাবর্ষণের ব্যাপকতা বেড়েছে। রুশ পদাতিক বাহিনী ও নৌবাহিনী ব্যাপক বোমা ফেলছে।

রাজধানী কিয়েভ থেকে উত্তর-পশ্চিমে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছেন রুশ সেনারা, পূর্বদিকে এ দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার।

ইউক্রেনে পা রাখার পর থেকেই রাজধানী কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ওপর সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে রুশ বাহিনী। তাদের আশা ছিল, কিয়েভের পতনের সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির জমানা শেষ হবে।

ফরাসি এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার মতে, সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। সঠিক নিশানায় হামলাও করতে পারছে না রুশ বাহিনী। এটা রাশিয়ার নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণনীতির সত্যিকারের ঘাটতি।

মারিওপোলে দুই লাখের বেশি মানুষ আটকা পড়ে আছে। শহরটির বড় অংশ পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। খাদ্যসংকটে পড়েছে মানুষ। পানি নেই। বন্ধ বিদ্যুতের সরবরাহ। বন্দরনগরীটি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়ার কাছে। এটি ক্রিমিয়া ও দনবাসের মধ্যে সংযোগের কাজ করবে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়ার দখল নেয় রাশিয়া আর রাশিয়াপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দখলে রয়েছে দনবাস। সামরিক অভিযান শুরুর আগে দনবাসের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় মস্কো।

এ যুদ্ধে কতসংখ্যক সেনা এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তবে পেন্টাগনের ধারণা, প্রথম মাসে সাত হাজারের মতো রুশ সেনার প্রাণ গেছে। গত বুধবার ন্যাটো দাবি করেছে, যুদ্ধে ৭ থেকে ১৫ হাজার রুশ সেনা মারা গেছে। অন্যদিকে প্রাণহানির প্রশ্নে কিয়েভের ভাষ্য, ১২ মার্চ পর্যন্ত তাদের ১ হাজার ৩০০ সেনা মারা গেছেন। তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সত্যিকারের সংখ্যার চেয়ে অনেক কম করে বলা হচ্ছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকায় ন্যাটো পূর্ব ইউরোপে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতির অনুমোদন দেবে বলে জানিয়েছেন জোটের মহাসচিব ইয়েন্স স্টলটেনবার্গ।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে গতকাল ব্রাসেলসে ন্যাটো, ইইউ ও জি-৭ নেতাদের জরুরি বৈঠকের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। হাঙ্গেরি, সেøাভাকিয়া, বুলগেরিয়া এবং রোমানিয়ায় আরও সেনা মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দেন স্টলটেনবার্গ।

পূর্ব ইউরোপের এই দেশগুলোতে চারটি নতুন ন্যাটো সামরিক ইউনিট মোতায়েনের বিষয়ে নেতারা মতৈক্যে পৌঁছাবেন বলে জানান তিনি।

বিবিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গতকাল জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে ব্রাসেলসে গেছেন। সেখানে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গেও অন্যান্য বৈঠক করবেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক সিএনএনের মাইকেল কফম্যান লিখেছেন, ‘যদি শক্তিক্ষয়ের চক্রে পড়ে রুশ বাহিনী, তবে যুদ্ধের পরের পর্ব হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি কুৎসিত। রুশ বাহিনী বেসামরিক এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করবে। তারা হয়তো তাদের পারদর্শিতার ঘাটতি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ঢাকার চেষ্টা চালাবে।’

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে পূর্বদিকের অবস্থান গত ২৪ ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের বেশি পিছু হটেছে রুশ বাহিনী। কয়েকটি ফ্রন্টে তারা আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত বুধবার এ দাবি করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, রুশদের কিয়েভের ৫৫ কিলোমিটার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে হটিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে ইউক্রেনীয়রা। গত বুধবার থেকে এ পরিবর্তন এসেছে।

ফসফরাস বোমা হামলার অভিযোগ জেলেনস্কির : পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিশেষ সম্মেলনে অনলাইনে যুক্ত হয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনে ফসফরাস বোমাবর্ষণের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে রাশিয়া ফসফরাস বোমা ব্যবহার করেছে। এতে শিশুরা মরছে, লোকজন মরছে।’

তবে এ বোমা হামলা ইউক্রেনের কোথায় চালানো হয়েছে অথবা এ বোমা ব্যবহারের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

বিশাল রুশ জাহাজ ধ্বংসের দাবি : রাশিয়ার বৃহৎ একটি জাহাজ ধ্বংসের দাবি করেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বারদিয়ানস্কের কাছে জাহাজটিতে হামলা ও সেটি ধ্বংস করা হয় বলে জানিয়েছে তারা। অবশ্য ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরটি রাশিয়ার দখলে রয়েছে এবং জাহাজে হামলা ও ধ্বংসের বিষয়ে রুশ সামরিক বাহিনী এখনো কিছু জানায়নি।

এদিকে ইউক্রেন নিয়ে মতবিরোধের জেরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের উপদেষ্টা ও দেশটির জলবায়ুবিষয়ক দূত আনাতোলি চুবাইস পদত্যাগ করেছেন। তিনি এরই মধ্যে রাশিয়াও ত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে ইউক্রেনের কৃষিমন্ত্রী রোমান লেশচেঙ্কো পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার এক সহযোগী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সহযোগী গতকাল রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত