রডের বাজার অস্থির, মিলছে না স্ক্র্যাপ

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ০২:৫৯ এএম

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের ইস্পাত শিল্পেও। তাতে গত এক মাসের মধ্যে রড, অ্যাঙ্গেল, বিলেট ও অন্যান্য লৌহজাত নির্মাণসামগ্রীর মূল্য অন্তত চারগুণ বেড়ে গেছে। যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে রডের দাম আকাশচুম্বী হবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, আগামী মে মাস নাগাদ দেশের নির্মাণশিল্পে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যে আমদানিকৃত স্ক্র্যাপ পণ্য (পুরাতন লোহা বা লোহার টুকরা) এবং স্ক্র্যাপ জাহাজের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। ৩০০ ডলারের স্ক্র্যাপ এখন ৭৫০ থেকে ৮০০ ডলারে আমদানি করতে হচ্ছে। সেখানেও সরবরাহ লাইনে বিঘœ-বিপত্তি দেখা দিয়েছে। চাইলে আর পাওয়া যাচ্ছে না।

এ কারণে প্রতি টন রডের দাম বেড়ে ক্ষেত্রভেদে সর্বোচ্চ ৯২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। স্ক্র্যাপ লোহার অভাবে অনেকগুলো রি-রোলিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝারিগুলো ধুঁকছে। আর বৃহৎ কারখানাগুলো উৎপাদন কমিয়ে চালু রেখেছে। এরকম পরিস্থিতিতে, স্ক্র্যাপ লোহার সরবরাহ লাইন সচল রাখা এবং ইস্পাতসামগ্রী উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশে বিশে^র সর্বাধিক কোয়ান্টাম আর্ক প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা বিশ্বসেরা ইস্পাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে রডের মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। এটা সরাসরি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব। ওই দুই দেশ থেকে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পুরাতন জাহাজ বা স্ক্র্যাপ সামগ্রী বাংলাদেশ প্রতি বছর আমদানি করে। এখন সব বন্ধ। কবে যুদ্ধ শেষ হবে তা অজানা। রাশিয়া-ইউক্রেনের স্ক্র্যাপ জাহাজ বা সামগ্রী পৃথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো আমদানি করে। এখন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তার প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশে এ প্রভাব মারাত্মক।’ তিনি জানান, স্ক্র্যাপের সরবরাহ চেইনকে স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে তৎপর হতে হবে।

ইস্পাতের বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, যুদ্ধ না থামলে আগামী মে মাসের পরই দেশে ইস্পাতের কাঁচামালের তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে। ব্যাপারটি দেশের ইস্পাত খাতের জন্য অনেক বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইস্পাত তৈরির প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম দেড় বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে উল্লেখ করে জিপিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্ক্র্যাপের দাম টন প্রতি ১০০ ডলার বেড়ে গেছে। টাকা দিয়েও স্ক্র্যাপ পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। লৌহ ও লৌহজাত শিল্পের কাঁচামালের সাপ্লাই চেইন নিরবচ্ছিন্ন রাখার ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করে তিনি বলেন, স্ক্র্যাপ আমদানিতে শুল্কহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পাশাপাশি আমদানি যাতে বিঘিœত না হয় সেজন্য সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে।

গত বুধবার বিকেলে সীতাকু-ে জিপিএইচ কারখানার সম্মেলন কক্ষে দেশ রূপান্তরসহ সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জিপিএইচ গ্রুপের কর্ণধার এসব কথা বলেন। এ সময় জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলমাস শিমুল কারখানার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। মতবিনিময় সভায় জিপিএইচ ইস্পাতের পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জিপিএইচ ইস্পাত গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, রাশিয়া এবং ইউক্রেনসহ সন্নিহিত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের স্ক্র্যাপের অন্তত ১০ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি করা হতো। ওই অঞ্চল থেকে স্ক্র্যাপ রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব বিশ্বের স্টিল সেক্টরকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। পুরো বিশ্বে দেখা দিয়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব। হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে স্ক্র্যাপের দাম। তিনি বলেন, বিশ্বসেরা ইস্পাত পণ্য তৈরির প্রতিজ্ঞা নিয়ে জিপিএইচ ইস্পাত নিয়ে এসেছে ক্লিন স্টিল তৈরির সর্বশেষ প্রযুক্তি। জিপিএইচ ইস্পাতের কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তি শুধু দেশেই নয়, এশিয়াতে প্রথম। বিশ্বের স্টিল উৎপাদনের সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী বিশ্বের দ্বিতীয় কারখানা হচ্ছে জিপিএইচ। এর সঙ্গে জিপিএইচ ইস্পাত যুক্ত করেছে সেকেন্ডারি রিফাইনিং প্রসেস, হাই স্পিড কাস্টিং মেশিন এবং সেরা প্রযুক্তির উইনলিংক রোলিং যা জিপিএইচ কোয়ান্টাম রডকে পরিণত করেছে বিশ্বের সেরা পণ্যে। বিশ্বসেরা মান ধরে রেখে পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়ায় জিপিএইচ ইস্পাত ১ লাখ ২০ হাজার টন স্টিল চীনে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। বহুমুখী পরীক্ষা এবং যাচাই-বাছাই শেষে গত বছর করোনাকালে চীন পাঁচটি চালানের মাধ্যমে ওই স্টিল আমদানি করেছিল।

জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটিডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমাস শিমুল বলেন, ‘আমাদের কাছে দেশ অনেক বড়। দেশে যাতে বিশ্বসেরা কিছু একটা করা যায় সেজন্য আমরা বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম। পরবর্তীকালে বিশ্বসেরা স্টিল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েই আমরা ভাইয়েরা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তি আনার। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় দুঃসাহস ছিল। কারণ এ প্রযুক্তিতে রড তৈরিতে উৎপাদন খরচ প্রচলিত ইন্ডাকশান ফার্নেসের চেয়ে অন্তত ১০ শতাংশ বেশি। আমরা এ বাড়তি খরচ জুগিয়েও দেশের জন্য ভালো স্টিল তৈরি করছি।’

তিনি বলেন, মধ্যম আয় কিংবা উন্নত বিশ্বে পরিণত হওয়ার পূর্ব শর্ত হচ্ছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আর অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রধান উপকরণই হচ্ছে নির্মাণসামগ্রী। নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে রডের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। যত উন্নতমানের রড ব্যবহৃত হবে ততই কম রড ব্যবহার করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হবে। ভালো স্টিল তৈরি হলে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। তিনি বিশ্বের সর্বাধুনিক গ্রেডের রড উৎপাদনের সক্ষমতা জিপিএইচ ইস্পাত অর্জন করেছে বলেও উল্লেখ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত