সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়ি ক্ষমতাহীন ডিটিসিএ

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ০৩:০০ এএম

রাজধানীতে তীব্র যানজটের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। নগরের যানবাহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সে সংস্থার কথাও শুনছে না সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থা।

সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, বিআরটিসি, সড়ক ও জনপথসহ সড়কে সেবা সংস্থার কাজ করে এমন সংস্থাগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করছে। পরিবহন ব্যবস্থাপনায় মূল পরিকল্পনা থাকলেও এটিকে পাশ কাটিয়ে অন্য সংস্থাগুলো নিচ্ছে একের পর এক প্রকল্প। সেই সঙ্গে যত্রতত্র সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি, গাড়ি পার্কিং, রিকশার দৌরাত্ম্য, ফুটপাত দখল, বড় বড় স্থাপনার পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা, ব্যস্ত সড়কে রেলক্রসিং, সড়কের পাশে ফিলিং স্টেশন, ট্রাফিক সিস্টেম অব্যবস্থাপনা, অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিআইপি) সড়কে বাড়তি সুবিধা দেওয়া, গলির রাস্তা কাজে না আসা ও দিন দিন ব্যক্তিগত গাড়ির চাপও শহরের যানজটের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জানতে চাইলে নগরপরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয় একেবারেই নেই। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, ঢাকা শহরের যানজট নিরসনের মূল পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যেই আরও পরিকল্পনা হচ্ছে। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। প্রতিটি কাজেই কারও সঙ্গে কারও কোনো সমন্বয় নেই।’ তিনি বলেন, ‘ডিটিসিএ কোনো সংস্থার কাজের ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন করতে পারে না। এলজিইডি (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) যখন ফ্লাইওভার করেছে ডিটিসিএ তাদের প্ল্যানের সঙ্গে না মিললেও কিছু বলতে পারছে না। পরিকল্পনা সংস্থা তাদের মতো করে কোনো প্রকল্প নিতে পারছে না। শহরের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিটি শহরে একটিই পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে ভিন্ন। এ ছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থানারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নগর ব্যবস্থাপনায় কোনো সমন্বয় নেই। এক অথরিটি (কর্তৃপক্ষ) অন্য অথরিটি মানছে না।’

এ নগরপরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘আমাদের যা আছে তা নিয়েই ভাবতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের কিছু জরুরি বিষয়ে ভাবতে হবে। অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ নিয়ে ভাবতে হবে। এভাবে করোনার মতো করে শিফট করে শপিংমল নিয়ে ভাবা যেতে পারে। তা না হলে আসন্ন রমজানে যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের রাস্তায় জোড়-বিজোড় সংখ্যার ব্যক্তিগত পরিবহনের ভাবনা বিষয়ে ড. আদিল বলেন, ‘এটি একটি ম্যানেজারিয়াল সিস্টেম। বিশে^র অনেক দেশে তা কার্যকর হয়েছে। আবার অনেক দেশ সফল হয়নি। এখন সরকারকে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে যিনি নিজস্ব পরিবহনে যাতায়াত করেন তিনি কীভাবে যাতায়াত করবেন। তাকে ন্যূনতম মানসম্মত গণপরিবহন দিতে হবে। যদি তা না দিতে পারেন, তাহলে জোড়-বিজোড় সংখ্যা যানবাহন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাবে না।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, নানা উদ্যোগের পরও রাজধানীতে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছেই। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তেমন সমন্বয় নেই। ফলে সিটি করপোরেশন রাস্তা মেরামত করে যাওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যেই অন্য সংস্থা সেখানে কেটে কাজ করছে। এক রাস্তায় অল্প সময়ের মধ্যে দুইবার খোঁড়াখুঁড়ির ঘটনা ঘটছে। এ কারণে সড়কে যানবাহনের জটলা লেগে থাকে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা কখনো এক ঘণ্টাও লেগে যায়।

রাজধানীর আজিমপুর, মগবাজার ও মিরপুরে প্রধান সড়কে এখন সিটি করপোরেশনের পানি নিষ্কাশনের জন্য পাইপ বসানোর কাজ চলছে। এসব সড়কে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে। এ ছাড়া যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশা, অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, মালবাহী ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ঠেলাগাড়ি ও ট্রাক একই সময়ে একই রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। এসব পরিবহনের জন্য আলাদা লেন নেই। যেটুকু রাস্তা আছে তাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ এলাকায় ফুটপাত দোকানিদের দখলে। মানুষ ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। গুলিস্তান থেকে সদরঘাট রুটে বেশি যানবাহনের চাপ এবং সড়কের দু’পাশের ফুটপাত হকারদের দখলে। এ ছাড়া শত শত দোকানের মালামাল রাস্তায় রাখা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা সড়কের দু’পাশে ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক দাঁড় করিয়ে মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করছে।

সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মানুষের চলাচলের রাস্তা নির্বিঘœ করতে প্রতিনিয়তই তারা অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও পুলিশকে ম্যানেজ করে হকার ও সড়কের পাশের দোকানের ব্যবসায়ীরা আবার ফুটপাত দখল করে।

ট্রাফিক পুলিশ বলছে, সড়কে যানজটের মূল কারণ সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাসসহ অন্যান্য সংস্থারও সমন্বয়হীনতা। সিটি করপোরেশন এখন সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গার অনুমোদন দেয়। ইজারাদার আবার অন্যত্র ইজারা বিক্রি করে। তারা নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে আশপাশের সড়কেও পার্কিং করে। পুলিশ কিছু বলতে চাইলে ইজারাদার বৈধ কাগজপত্র দেখায়। সিটি করপোরেশনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা শহরের মধ্য দিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। শহরের ভেতর দিয়ে রেললাইন যাওয়ায় ১৭টি পয়েন্টে রাস্তা বন্ধ করতে হচ্ছে। এসব স্থানে কমপক্ষে ৮-১০ বার যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তা ছাড়া রয়েছে ভিআইপিদের গাড়ির চাপ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদেরও ট্রাফিক সংকেত ভেঙে চলাচলের সুবিধা দিতে হচ্ছে। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট।

নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব মনে করেন, শহরের যানজট কমাতে হলে নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যমান ট্রাফিক ব্যবস্থানায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘একটা বিষয় সবখানে স্পষ্ট হয়েছে যে, আমাদের সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। আমরা গণপরিবহনভিত্তিক সমাধানে হাঁটছি না। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ছয়টি রুটে ছয়টি কোম্পানির মাধ্যমে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি রুটে একটি লেন বাস লেন হিসেবে চিহ্নিত করে দিতে হবে।’

ইকবাল হাবিব আরও বলেন, ‘শহরে এখন মেগা প্রকল্পে কাজ চলছে। করোনায় এক থেকে দেড় লাখ মোটরসাইকেল ও বিপুলসংখ্যক রিকশাও নেমেছে। এ যানবাহনগুলোর বাড়তি চাপের কারণে ট্রাফিক সিস্টেম ভেঙে পড়েছে।’ সমন্বয়হীনতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার ডিটিসিএকে শহরের এ বিষয়ে কাজ করতে দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু এ সংস্থা সভা ডাকলে অন্য কোনো সংস্থা সেখানে যায় না। তাদের কোনো কথাও কেউ শোনে না। বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ ও সিটি করপোরেশন, বিআরটিসি, ডিটিসিএসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। তা না হলে সমাধান মিলবে না।’

এ নগরবিদ বলেন, ‘সড়কে এক কাজ শেষ হলে পেছন দিয়ে আরেকটা কাজ শুরু করেছে। তারা মুখে বলছে একটা, বাস্তবে করছে আরেকটা। আর এর ফলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত