স্বাধীনতা একটি জাতিকে আত্মমর্যাদা দেয়, আত্মনির্ভরশীল করে। স্বাধীনতার সুফল মানে একটি জাতির সমৃদ্ধির পথে নিরন্তর এগিয়ে চলা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছিলেন বলেই আজকে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। আজকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে পেরেছি। এখন উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নিয়েছে আমাদের সরকার। স্বাধীনতার ৫১ বছর পর আমাদের তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা হলো, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে এ দেশের অনাহারী, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কয়েক দশকের ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জাতির পিতা তার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। ঘাতকের নির্মম বুলেট বঙ্গবন্ধুকে কেড়ে নেয়, জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই বাস্তবতায় ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বিদেশে নির্বাসন থেকে ফিরে এসে এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের রাজনীতির হাল ধরেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় এ দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের এক নবযাত্রা।
২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে রাজাকার, আলবদর ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে। জাতির প্রত্যাশা ভূলুণ্ঠিত হয়। তবে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণের এক স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়।
আমাদের প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ হবে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও আত্মনির্ভরশীল একটি দেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা এরই মধ্যে সে প্রত্যাশা পূরণে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরামর্শক হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে। সেই বাংলাদেশই এখন উন্নত বিশ্বের কাছেও উন্নয়নের রোল মডেল। সারা পৃথিবী এখন বাংলাদেশের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫৯১ ডলার। ১৯৭২ সালে মাথাপিছু এ আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার। যে পাকিস্তানিদের পরাজিত করে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি সেই পাকিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন বেশি। প্রায় সব উন্নয়ন সূচকেই আমরা পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছি। এ অর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা জাতি হিসেবে অনেক আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এ দেশের পাকিস্তানি দোসরদের প্রায়ই বলতে শোনা যেত, ‘স্বাধীন হয়ে কী লাভ হয়েছে?’ আমাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মাধ্যমে সেই গোষ্ঠীর মুখে সজোরে চপেটাঘাত করতে সক্ষম হয়েছি।
আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছিলাম বলেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। বর্তমানে পাকিস্তান যখন জঙ্গিবাদ, মৌলবাদীদের বোমা, গুলি মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছি। এ দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে বলেই আমাদের লাখ লাখ প্রবাসী প্রতি মাসে দেশে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছে, যা আমাদের উন্নয়নের জন্য অনেক বড় সহায়ক হচ্ছে।
স্বাধীন দেশের মানুষের আরেকটি প্রত্যাশা থাকে জাতির সক্ষমতা বৃদ্ধি। সেদিক থেকেও আমরা অনেক উন্নতি করেছি। খাদ্য উৎপাদনে আমাদের পরনির্ভরশীলতা এখন খুবই সামান্য। কৃষিতে বিপুল উন্নয়নের ফলে আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি। বিশ্বব্যাংকের চোখ-রাঙানিকে পরোয়া না করে আমরা নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ খাতে আমরা অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। মহাকাশে আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছি। কভিড মহামারীর মতো বড় ধাক্কার পরও আমাদের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে এখন আর কারও প্রশ্ন নেই।
শুধু উন্নয়নই একটি স্বাধীন দেশের মানুষের প্রত্যাশা নয়। মানুষ চায় সুশাসন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সুশাসনকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে দুর্নীতি সূচকে পরপর ৫ বার বাংলাদেশ প্রথম স্থান পেয়েছিল, যা বিশ্বের কাছে আমাদের লজ্জায় ফেলে দেয়। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপিদের কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে তাকেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ক্ষমতাসীন দলের একাধিক এমপি জেল খেটেছেন। এটা বাংলাদেশে নজিরবিহীন। একসময় সরকার প্রধানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে দুর্নীতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সে ধারা থেকে বের হতে পেরেছি। তবে এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এখনো এ দেশে সর্বক্ষেত্রে শতভাগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় এসে অপশাসন, দুর্নীতির যে বীজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে গেছে তা নির্মূল করা সময়সাপেক্ষ। এটি একটি শক্ত চ্যালেঞ্জও বটে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে দায়িত্বশীল ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।
পরিশেষে তরুণ প্রজন্মের একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আমি চাই, এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বন্ধ হোক। সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই যেন হয় মুক্তিযুদ্ধে পক্ষের শক্তি। তাহলেই আমাদের জাতিগত ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে, সমৃদ্ধির পথে আমাদের যাত্রাপথ আরও মসৃণ হবে।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, সিরাজগঞ্জ-১
